Skip to main content
Internet Archive's 25th Anniversary Logo

Full text of "Chapati O Padma Ed.1st"

See other formats


চাগাটি ৪ গন্ন 


্ীগ্রথনাথ বিশী 


0138০71 
|] 0] || ||| || | 












ূ 
ূ 








সুলয--৩৭ 
প্রথম সংস্করণ--১৩৬২ 


গ্রচ্ছদপট £ গ্রুব সেন 


প্রকাশক :_ প্রীগোপালদাস মহুমদার, ডি, এম, লাইব্রেরী ৪২নং কর্ণয়ালিম স্ট্রীট, কলিকাতা 


মুদ্রাকর ? হার. চা ঘোষ, গ্ঠামনুদদর প্রি টং ওয়ার্কস্‌ ২৬নং কর্ণওয়ালিস ট্রাট. কলিক্াা । 


চাশ্পাা্টি ও *্পচ্ত্য 
সিপাহি-যুদ্ধের কাহিনী 


চাপাটি ও গল্প 
সিপাহিগখ কর্তৃক সঙ্কেতরূপে চাপাটি ও পদ্মফুল ব্যবহৃত হইত--. 
তাই বইথানার নাম চাপাটি ও পদ্ম। 


পুর্বকথা 


এই গ্রন্থের গল্পগুলি সিপাহিবিদ্রোহ ঘটিত। প্রথম গল্পটি কাল্পনিক। 
রবীন্দ্রনাথের গোরা উপন্যাসের গোৌরার জন্মবৃতস্ত আছে-_তাহাই 
উপজীব্য । পরিবেশ কাল্পনিক নয়। বাকি এগারটি গল্প এই অর্থে 
এতিহাসিক যে সিপাহিবিদ্রোহের কোন না কোন গ্রন্থে গল্লাস্কুরগুলি 
পাইয়াছি। কেবল নানাঁসাহেব গল্পটিতে কিছু স্বাধীনতা লইয়াছি। 
কিন্ত এ ক্ষেত্রেও পরিবেশ কাল্পনিক নয়। এক বিন্দু ইতিশাসের সহিত 
এক কলসী কল্পন! মিশ্রিত করিলে আর যাই হোঁক গ্রতিহাসিক গল্প স্থষ্ট 
হয় না। ইতিহাস ও গল্প দুয়ের মর্যাদা রক্ষা করিয়া কলম চালনা 
কঠিন, সবর পারি নাই, সবর পারা যায় না। রতিহাসিক গল্পে 
এঁতিহাসিক চরিত্র অঙ্কন গৌণ, মুখ্য এ্তিহাসিক পরিবেশ রচন1। 
এ গ্রন্থে তাহা! কতদূর সার্থক হইয়াছে সে বিচারের ভার এ্তিহাসিকগণের 
উপরে। 

সিপাহিবিদ্রোহ প্রসঙ্গে মুদ্রিত গ্রন্থসমূহ বিদেশীগণ কতৃক লিখিত। 
কাজেই অনুমান অনুচিত নয় যে সমন্ত বিবরণ সিপাহিপক্ষের গ্রতিকৃলে 
ঝু কিয় আছে। ভারতের বিভিন্ন সামস্ত রাজ্যের দপ্তরথানায় ভারতীয়গণ 
কর্তৃক লিখিত সমসাময়িক বিবরণ থাকা অসম্ভব নয়। পামস্ত রাজ্য 
লোপ পাইবার পরে দপ্তরথানাগুলি ভারত রাষ্ট্রের আয়ত্ত হইয়াছে । এখন 
খুজিয়া পাতিয়া বিদ্রোহ-বিবরণ আবিষার করিলে, প্রকাশ করিলে 
ইংরাঁজের অনুকূলে কাঁত নৌকাখান! ভারসাম্য লাভ করিলেও করিতে 
পারে। তথন ইতিহাস ও গল্প দুয়েরই চেহারায় বদল হওয়া অসস্ভব 


হইবে না। 


সিপাহিবিদ্রোহের কাহিনী সামান্য যেটুকু পড়িয়াছি তাহাতে কিছু 
শিক্ষা লাভ করিয়াছি বলিয়! মনে হয় কিন্তু তাহা প্রকাশের ক্ষেত্র এ গ্রশ্থ 
নয়। বারাস্তরে স্থুযোগ পাইলে সে কথ! বলিবার ইচ্ছা রহিল। 

অধ্যাপক শ্রীগ্রতুলচন্ত্র গুপ্তের উৎসাহ ও অযাচিত গ্রন্থথণ এগুলি 
রচনার একটি প্রধান কারণ। তিনি ভাল করিপাছেন কিনা তিনিই 
জানেন, আমি তো! খণ হ্বীকাঁর করিয়া রাখি। 


সেই শিশুটি ্ রর 


জেমি গ্রীনের আত্মকথা 

কোকিল 

ছিন্ন দলিল 

গুলাব সিংএর পিস্তল ১, 
ছায়া-বাহিনী 

মড ৪ রঃ 


কথ চি? 8৫৪ 


নানাসাহেব 
প্রায়শ্চিত্ত 
রক্তের জের 
অভিশাপ 


১৮ 
৩7৭ 
6৫ 
৬১ 


৬৯ 


উপ্রভ্ভজ্নত্দ্র গুঞ্ 


বল কক্মজ্লে-_ 
তব গ্রন্থাগার থেকে বহু গ্রন্থ চেখে চেখে 
গল্পগুলি করেছি বাহির | 
সেই গল্লাস্কুরগুলি আকাশে মস্তক তুলি 
বিদ্যা মোর করিছে জাহির ॥ 
সিপাহি যে ক্ষেপেছিল অসি তার মেপেছিল 
ইংরাঁজের অসির সহিত। 
পুরাতন সে কাহিনী ইতিরস প্রবাহিনী 
মন মোর করেছে মোহিত ॥ 
ভারতের মাঠে বাঁটে কত নাট্য কত নাটে 
যুগে যুগে ঘটেছে এমন । 
সব তার নাহি বুঝি তবু সেই স্ব খুঁজি 
পুঁথির পাতায় ঘোরে মন ॥ 
ঘটন।-উপলগুলি খু'টে খু'টে নেয় তুলি 
কত জন কত প্রয়োজনে । 
মনের মতন ক'রে সাজাইয়৷ থরে থরে 
নবরূপে সে কাহিনী ভনে ॥ 
অর্থনীতিকের দল রহস্যের খোঁজে তল 
নিয়মের শিকল নামায়ে। 
টাকার শন্থুক গতি মাপিতে অভ্যন্ত অতি 
মনোরথ হেঁসেলে থামায়ে ॥ 
সবজাস্ত! রাজনীতি সর্বগ্রাসী আত্মগ্রীতি 
ছুই হাতে কোলে টানে ঝোল। 
দলনারায়ণে তুষি আছে নিজ মনে খুশী 
যত্রতত্র গোলে হরিবোল ॥ 
না শিখে পণ্ডিত তার! ব্রিগুণে মগ্ডিত তার! 
কিবা সর্ব গুণের পশরা । 
বিধাতার ধরে তল বুদ্ধিতে বিচ্ছেদে চুল 
বিশ্বে ভাবে দলের থসড়া ॥ 


০ 


ইতিহাস হেট মাথে ব'সে রয় "ূন্ধ পাতে 
কেব! তার পাতে দেয় দই । 

অপরের বাড়। ভাত তার। যে বাড়ায় হাত 
সোলাসে গরজ্ে হৈ হৈ ॥ 

অর্থনীতি রাজনাতি “অশ্বখামা ততো! ইতি, 
বলে, “গজ? রেখে দেয় হাতে । 

দেই গজকাঠি দ্বার! বিশ্বের প্রবাহ তারা 
মেপে চলে দিবসে ও বরাতে ॥ 

আকাশে দেখিলে মেঘ ছুটে আসে বাধুবেগ 
প্রত্যাশিয়! বৃষ্টির পশলা । 

সিপাহি বিদ্রোহ মাঝে (নিক্ষমায় খই ভাজে) 
সপিয়াছে গরম মশলা ॥ 

পুরাণে কাস্ন্দি মথি, তোলে নব তত্ব অতি 
যত্র তত্র নূতন অছিলা । 

ভারতীয় কি ইংরাজ নগণ্য হয়েছে অজ 
আমি দেখি মানষের লীলা ॥ 

যে মানুষ দেশে কালে বিশ্ববিধাতার ভালে 
রচিয়াছে নূতন নয়ন । 

তারি হাসি অশ্রু নিয়ে «মনের মাধুরী” দিয়ে 
বুনি আমি বাতজ্ময় বসন ॥ 

দ্বুরে থেকে তবু কাছে কাঁব চিরদিন আছে 
কল্পনায় রচি ছায়াপথ । 

কাছে থেকে তবু দূরে কবি রহে স্থরপুরে 
ব্বপ্রে-রচ1 বাত্তব জগণ্ ॥ 

যখন সে হাটে ঘোরে মন-ঘুড়ি উধ্বে” ওড়ে 
সত] ছাড়ে ভাবের লাটাই। 

কু ভুবুর্বীর মতো তুলে আনে মুক্তা যত 


সে-সিন্ধুর তীর তল নাই ॥ 


।৬/০ 

ছু'নৌকায় পা যে তার মাঝে বহে খরধার 
কবি-ব্রত বিষম কঠিন । 

লোঁকে তাই নাহি বোঝে৷ বুথ তার অর্থ খোজে 
অবশেষে বলে অর্থহীন ॥ 

সারদাঁর টকশালে তাঁর অর্থ নেয় ভালে 
সযঘতনে নব চিহ্ন লিখি । 

পাই নি মোহর টাকা তবু ঝুলি নহে ফাকা 
জুটিয়াছে আধুলি ও সিকি ॥ 

কবি নহে জলচর নহে সে যে স্থলচর 
খোঁজে সে যে আকাশের ডাঙ1 । 

জালের খোটাঁর পরে বসে থাঁকে মৌন ভরে 
ধ্যানপ্রজ্ঞ যেন মাছরাও? ॥ 

মাছটি লাঁফালে পরে ছুটে গিয়ে টু'টি ধরে 
পাখনায় নাহি লাগে জল। 

[7:5০819350 বগলে কেউ পেষ়ালায় তোলে ঢেউ 
কেহ শুধু করে কোলাহল ॥ 

কেহ বলে এতো সোজা চালাকি গিয়েছে বোঝা 
পক্ষীবেশে ওট] যে বুভোয়।। 

দেখ জিভে ঝরে জল তবু লক্ষ্য অচপল 
আমাদের হাতের এ মোয়া ॥ 

এই মতো কত জনে কত চিন্তা করে মনে 
ইতিমধ্যে বই কাঁটে উই । 

বাজারে করিয়া দেন৷ হ'ল গৃহসজ্জা কেন! 
ঝড়ে গেল ঘরের যে টুই ॥ 

বইয়ের কপালখানি মনে মনে খুব জানি 
বুবিয়াছি খাঁন ষাট লিখে । 

প্রথম মুদ্রণে বটে প্রায়শঃ নির্বাণ ঘটে 
অভ্যাস হলনা তৰু শিখে । 


॥০ 

যাই হোক যাহ। পাই আধখানা তব ভাই 
ইথে নাহি হবে অগ্রতুল। 

জোটে যদি পুর্ণচন্দ্ আধখান! তব, সনদ 
করিও না হবে মোর ভুল ॥ 


২২২৩-১১-৫৫ 


সেই শিশুটি 


কৃষ্ণদয়লবাবু তাহার বাংলো বাড়ীর বারান্দায় অধীরভাবে 
পায়চারি করিতেছিলেন। একবার ট্াঁড়ান, একবার চলেন, কখনে। 
বা একখান! বেতের চৌকির উপরে বসেন, কখনো বা বারান্দার প্রান্তে 
রাস্তার ধারে গিয়া াড়াইয়া শিষ দিতে থাকেন, আবার ফিরিয়া 
ড্রয়িং রুমের দরজার পর্দা তুলিয়া দেখেন, কিন্তু কিছুতেই ভরসা পান 
ন, মুখে বিরক্তির চিহ্ন ক্রমে স্ফুটতর হইয়া! ওঠে । অবশেষে যখন 
তিনি ভিতরে যাইতে উদ্ভত হইয়াছেন, এমন সময়ে ভিতরের দিক 
হইতে একজন দামী আসিয়া বলিল--মেম সাহেব বললেন তিনি আজ 
বেড়াতে যাবেন না ! 

কৃষ্ণদয়ালবাবু ইংরাজি কায়দায় বলিয়া উঠিলেন--হুম্ঃ এবং 
হাতের ছড়িখানা চৌকির উপরে রাখিয়া দিয়া হন হন করিয়া! ভিতরে 
চলিয়া গেলেন । 

কৌতুহলী দাসী একবার ভিতরে যাইতে পা! বাড়াইয়াছিল, বোধ 
করি সাহমে কুলাইল না, ফিরিয়া আসিয়া! বারান্দার সম্মুখে যে বড় 
নিম গাছটা ছিল তাহারই ছায়াতে দাড়াইল। 

দাীটির বয়স খুব বেশি হইবে তো পঁচিশ বছর, শ্যামবর্ণ, মুখে 
গোটা কয়েক বসন্তের দাগ, হিন্দন্থানী ধরণে রভীন শাড়ী পরিহিত, 
উপরির মধ্যে গায়ে একটি শেমিজ। সে বাংলা বলে বটে কিন্তু হিনদু- 
স্থানীর মুখের বাংলা, কিছু বাঁকা । 

এমন সময়ে ডুয়িং রুমের ছুটি ভিন্ন কণ্ঠে সংলাপ শ্রুত হইল, দাসী 
উৎকর্ণ হইয়া উঠিল। 

-_বেড়াতে যাবে না কেন শুনি । 

--শেমিজ পরে, জুতো পায়ে দিয়ে মেম সাহেব সেজে জামার 
বেড়াতে যেতে ভালো লাগে না। 


চাপাটি ও পদ্ন এ 


_-জুতো পায়ে দিলে, শেমিজ পরলেই মেম সাহেব হ'য়ে যায়? 
আর তা৷ ছাড়া মেম সাহেবর! খাটো কিসে? 

--খাটো। বলছি নে, মেম সাহেবের মতে। মেম সাহেব থাকুক, 
হিছুর মতে। হিছু থাকুক । 

--দেখো, তোমার অত হিছুয়ানি এখানে চলবে না । 

অপর ক ইহার কোন উত্তর করিল না। উত্তর না পাইয়া 
কৃষ্ণদয়ালবাবুর কণ্ঠ উত্তেজিত হইয়। উঠিল, বলিল--নাঃ তোমাকে কাশী 
থেকে এখানে এনে অবধি আমার শাস্তি নেই। সাহেব সুবোকে যে 
একদিন নিমন্ত্রণ করে খাওয়াবো, তোমার হিছুয়ানির জন্য তার উপায় 
নেই। এখন দেখছি চাকরির উন্নতির আশা তো৷ নেই-ই, এবারে 
চাকরিট। ন! যায়। 

--চাঁকরি রাখতে গেলে মেম সাহেব সাজতে হবে নাকি? 

একশ বার হবে। নবাবী আমলে মেয়েরা বিবি সেজেছে, 
এখন কোম্পানীর আমলে মেম সাহেব সাজবে। যে-সময়ের যে-রীতি । 

তার পর একটু থামিয়! কৃষ্ণদয়ালবাবু বলিতে আরম্ভ করিলেন,_- 
মনে নেই সেদিন বগি করে ফিরবার সময়ে ডানিয়েল সাহেবের সঙ্গে 
দেখা। তিনি কত খুশীহলেন! বললেন-_মুখার্জি, তুমি জেনান। 
মানো না দেখছি, বড় সন্তুষ্ট হলাম । এই বলে সাহেব, মেম সাহেব 
তোমার সঙ্গে হ্যাণ্ড শেক করলেন। 

-মনে আবার নেই। ফিরে এসে সান ক'রেও সারারাত গ! 
ঘিন-ঘিন ক'রে মরি । 

--আহা, ফিরে এসে না হয় প্লান করো, গঙ্গাজল স্পর্শ কারো, 
নিষেধ করছে কে? 

--ভাষায় কর নি, ভাবে করেছ। আমাকে জব্দ করবার জন্যই 
তুমি এ খুষ্টান মেয়েটাকে বাড়ীতে এনে রেখেছ । কেন হিছু দাসী 
কি মিলতো। না? 

--লছমিয়া তো তোমার পুজোর ঘরে যায় না, রান্না ঘরে যায় না। 

-_বাঁড়ীতে থাকে তো, উঠোনে চলাফেরা করে তো । 


৩ চাপাটি ও পদ্ম 


-হিছু দাসী কি ওদের মতো কাজ জ্ঞানে? তা ছাড়া সাহেব মেম 
বাড়ীতে এলে ওর! আদব কায়দ! সব জানে । গুণের আদর করতে 


হবে তো। 
--এখন সাহেবরা তোমার এ গুণের আদর করলে হয়। 


কথাটা! যে ভাবেই কথিত হোক কৃষ্ণদয়ালবাবু অন্যভাবেই গ্রহণ 
করিলেন, বলিলেন--সাহেবদের মতে। গুণের আদর করতে জানে কে? 
আমি ওদের সঙ্গে বসে খান! খাই, বগি হাকিয়ে স্ত্রীকে নিয়ে বেড়াই, 
বাড়ীতে খুষ্টান দাসী রাখি এসব জানবার পর থেকে অল্প ক'মাসের 
মধ্যে আমার ছুটে! পলিফট' মানে দ্বার উন্নতি হয়েছে । পরেশ 
এখনে। সেই জুনিয়ার গ্রেডে ঘষড়াচ্ছে। 

কৃষ্চদয়ালবাবু স্ত্রীকে জানিতেন বলিয়াই বুঝিলেন যে তর্কে পরাস্ত 
করিয়া কাজ আদায় কর! সম্ভব হইবে না, তাই কথস্বরে এবারে একটু 
অনুরোধমিশ্রিত আবদারের রস সঞ্চারিত করিয়া বলিলেন-_-সপ্তাহে 
এই রবিবারটাতেই যা বেড়াবার শ্ুযোগ। যাও লক্ষীটি চট করে 
কাপড় বদলে এসো; দেরী হলে সাহেবরা গির্জায় চলে যাবে, তখন 
কারুর সঙ্গে আর দেখা হবে না। 

অন্পক্ষ নিরুত্তর, বোধ করি সে কাপড় বদলাইতেই গেল। 

কৃষ্ণদয়ালবাবু বাহিরে আমিতেছিলেন, ফিরিয়া গিয়া হাকিয়া 
বলিলেন-_নন্দি, তোমার নৃতন জুতোজোডাটা পরতে ভূলে! না যেন, 
ম্যাজিস্ট্রেটের মেমের পায়ের নমুনা দেখে কিনেছি । 

উদ্যোগপর্ব একপ্রকার সমাধা করিয়া কৃষ্দদয়ালবাবু বারান্দায় 
চৌকিটার উপরে বসিলেন, অপশজ্িয়মান দাসীর উদ্দেশে বলিলেন, 
লছমিয়াঃ কোচম্যানকে শীগগীর গাড়ী জুতে আনতে বলে! । 

এই বলিয়া! তিনি একটি সিগারেট ধরাইলেন, বড়ই পরিশ্রান্ত 
হইয়। পড়িয়াছিলেন। তিনি কি ভাবিতেছিলেন জানি না, হয়তো 
ভাবিতেছিলেন, আজকার মতো! কোনক্রমে তো! জোড়াতালি দিয়া 
চলিয়া গেল, এমন করিয়া আর কতদিন চলিবে । 

কৃষ্ণদয়ালবাবু সংসারের রহস্য জানিলে বুঝিতে পারিতেন, এমনি 


চাপাটি ও পদ্ম ৪ 


করিয়াই চালাইতে হইবে কারণ মানুষের জীবন একটি অন্তহীন জোড়া- 
তালির মালিকা। 

কৃষ্ণদয়াল মুখুজ্জে এটোয়া শহরে কমিশারিয়েট দপ্তরে কাজ 
করেন। প্রথম প্রবেশের সময়ে তিনি কনিষ্ঠ কেরাণীর দলে ছিলেন । 
কিন্তু অল্প দিনের মধ্যেই নান। উপায়ে, যাহার কিছু কিছু নিজ মুখেই 
তিনি ব্যক্ত করিয়াছেন, কৃষ্ণদয়ালবাবু কমিশারিয়েট দপ্তরের দেশীয় 
চাকুরেদের মধ্যে শীর্ষস্থান অধিকার করিয়া বসিলেন। 


“ইহার প্রথম স্ত্রী একটি পুত্র প্রদব করিয়া যখন মারা যান তখন 
ইহার বয়স তেইশ বছর। মাতার মৃত্যুর কারণ বলিয়া রাগ করিয়া 
ছেলেটিকে তাহার শ্বশুরবাড়ী রাখিয়া! কৃষ্*দয়াল প্রবল বৈরাগ্যের 
ঝেঁণকে একেবারে পশ্চিমে চলিয়া যান এবং ছয় মাসের মধ্যেই কাশী- 
বাসী সার্বভৌম মহাশয়ের পিতৃহীনা৷ পৌত্রী আনন্দময়ীকে বিবাহ 
করেন। পশ্চিমে কৃষ্খদয়াল চাকরির জোগাড় করিলেন এবং মনিবদের 
কাছে নাঁন! উপায়ে প্রতিপত্তি করিয়া লইলেন । ইতিমধ্যে সার্বভৌমের 
মৃত্যু হইল, অন্য কোন অভিভাবক না৷ থাকাতে স্ত্রীকে নিজের কাছে 
আনিয়াই রাখিতে হইল। ইতিমধ্যে যখন পিপাহীদের মিউটনি 
বাঁধিল--» 


২ 

এবারে লছমিয়ার বদলে রামদীন আদিল, বলিল, হুজুর, কোচম্যান 
লোক নেহি আয়! হ্যায় । 

--কেও ? 

--মালুম নেহি হুজুর । শুনতা শহরমে হল্লা। হো। রহ! হায়। 

--হল্লা ! কিস্ক! হল্লা ? 

--কেয়। জান্তা হুজুর । সিপাহী লোক হল্প। কিয়! থা। 

রামদীন সরলভাবে বলিলে সব কথাই স্বীকার করিতে পাঁরিত। 


৫ চাপাটি ও পদ্ম 


সিপাহীদের অসন্তোষের ভাব তাহার অজ্ঞাত থাকিবার বিষয় নয়। 
বস্তুতঃ যাহাদের উপর সিপাহীদের ভার এবং দেশের শাসনভার ন্যস্ত ছিল 
তাহার! ছাড়। আর সবাই আসন্ন ঝটিকার খবর রাখিত । কৃষ্দদয়ালবাবুর 
এসব খবর জানিবার কথা নয়, বিশেষ তাহার বাংলে। শহরের বাহিরে 
নদীর ধারে। তীহার বাড়ীর উত্তরে “সিভিল লাইন? বা সাহেবপাড়া, 
তার পরে শহর । 

সিপাহীদের হল্লার কথ! যতটুকু তিনি বিশ্বাম করিলেন তাহাতেই 
তাহার মুখ শুকাইয়া গেল। তিনি কাঠ হইয়া বসিয়। রহিলেন। 
মনেকক্ষণ পরে সন্বিং ফিরিয়। পাইলেন, বলিলেন--রামর্দীন, একবার 
খব্র নিয়ে আসতে পারো? 


কিন্তু কোথায় রামদরীন। সে অনৃষ্য হইয়াছে। কিন্তু কষ্ট করিয়। 
খবর সংগ্রহের প্রয়োজন আর ছিল না, খবর সশবে আপিয়া পৌছিল। 


হঠাৎ শহরের দিক হইতে একযোগে অনেকগুলি বন্দুকের আওয়াজ 
উঠিল, তার পরেই জনতার কোলাহল । তারপর হইতে কোলাহল ও 
বন্দরকের আওয়াজের আর বিরাম রহিল নাঁ। কৃষ্ণদয়ালবাবুর এমন 
সাহস হইল না যে একটু নড়িয়৷ চড়িয়! খবর সংগ্রহ করেন, কিন্ত তার 
প্রয়োজনও ছিল না, বারান্দায় বঙসিয়! যাহা! দেখিতে পাইলেন কমি- 
শারিয়েটের হেড ক্লার্কের প্রাণ শুকাইয়। দিবার পক্ষে তাহাই যথেষ্ট । 


কৃষ্ণদয়া লবাবু দেখিতে পাইলেন যে, সিভিল লাইনের অন্তর্গত 
সাহেবদের বাংলোগুলি জলিতেছে, আর ইতস্ততঃ সিপাহীরা কেউ বা 
দেশী পোষাকে, কেউ বা সরকারী পোষাকে ঘোরাফিরা করিতেছে । 
এটোয়াতে সিপাহী বিদ্রোহ শুরু হুইয়া গিয়াছে। 


“এটোয়াতে স্থিত নয় সংখ্যক নেটিভ ইনফ্যাটটি, বিদ্রোহ করিল । 
(ইংরাজ) মহিলা ও বালক-বালিকাদের লইয়া সাহেব অফিসারগণ 
গোয়ালিয়রের অভিমুখে যাত্রা করিয়া বরপুরা! নামে একটি থানাতে 
নিরাপদে পৌছিল, তাহাদের সঙ্গে রহিল সেই সব দেশীয় সৈন্য যাহার! 
বিদ্রোহে যোগ দিতে অস্বীকার করিয়াছিল। এটোয়া বিধ্বস্ত হইল, - 


চাপাটি ও পদ্ম ৬ 


ট্রেজারি লুষ্টিত হইল, জেলখানা হইতে কয়েদীর! মুক্ত হইল, অরাজ- 
কতার বিভীষিকা আরম্ভ হইয়া গেল।” 

কিংকর্তব্যবিমূঢ় হইয়। কৃষ্ণদয়ালবাবু ব্িয়। আছেন এমন সময়ে 
পিছনে পদশব্ধ শুনিয়া লাফাইয়া উঠিলেন, ফিরিয়। দেখিলেন--ওঃ 
তুমি । 

গোলমাল শুনিয়া আনন্দময়ী বাহিরে আসিয়াছেন, তাহার গায়ে 
বেড়াইতে যাইবার কাপড়। 

--কি হয়েছে ? 

--কেমন করে জানব কি হয়েছে । রামদীন বলছিল সিপাহীর! 
নাকি ক্ষেপে উঠেছে। 


--সিপাহীরা ক্ষেপতে যাবে কেন? 

--সে কথা সিপাহীর! জানে । রামদীনও জানতে পারে। 

কোথায় সে? 

--ছিল তো এখানেই। 

_-একবার দেখি কোথায়, এই বলিয়া আনন্দময়ী যেমনি বারান্দা 
হইতে -নামিতে গিয়াছেন, কৃষ্ণদয়াল লাফাইয়া গিয়। তাহার হাত 
ধরিলেন, না, না, ওদিকে যেও না। 

--কেন এত ভয় কিসের ? 

--সিপাহীরা যে ক্ষেপেছে। 

--দেশী লোককে কিছু বলবে না। 

--আরে বাঙালীদের ওর! ছোট সাহেব মনে করে, খুব বলবে । 

ভীত স্বামীর ভয়কে আর বাড়ানে। নিশ্রয়োজন মনে করিয়। 
আনন্দময়ী রামদীনের অনুসন্ধানে ক্ষান্ত হইলেন, তার বদলে ডাকিলেন, 
লছমিয়! । 

লছমিয়া নিকটেই কোথাঁও ছিল, আসিল, তাহার মুখ শুষ্ক, সে 
আনন্দময়ীর পায়ের কাছে বারান্দার উপর বসিয়া! পড়িল। আনন্দময়ী 
শুধাইলেন--কিছু জানিস ? 

সে বাঁক! বাংলায় যাহা বলিল, তাহার মর্ম এই যে, এখান হইতে 


৭ চাপাটি ও পদ্ল 


যাহ! দেখিয়াছে ও শুনিয়াছে তাহার বেশি জানে না। পরে বলিয়!। 
উঠিল, আমাকে আস্ত রাখবে না। 

কেন? 

আমি যে খুষ্টান। 

_তুই খৃষ্টান হলেও দেশী লোক, তাছাড়া খৃষ্টান কি তোর গায়ে 
লেখা আছে ? 

_আছে মা, আছে। খৃষ্টান ছাড়া আর শেমিজ পরে কে? 

--তবে ছেড়ে ফেল গে। 

--তোমারও তে। পরনে শেমিজ । 

_-আমার জন্য ভাবিস নে। 

তাহাদের কথাবার্তা শুনিয়া কৃষ্ণদয়াল ভাবিলেন লছমিয়ার যুক্তি 
একেবারে ভিত্তিহীন নয়। তিনি ভাবিতেছিলেন চামড়ার খাতিরেই 
বাঘট! বাঘ, চামড়। খুলিয়া! লইলে শিয়াল কুকুরের সঙ্গে তাহার প্রভেদ 
কোথায়? গাঁওয়ার সিপাহীর। পোষাক দেখিয়াই যদি জাতি নির্ণয় 
করে তবে শেমিজ ও কোটপ্যাণ্ট কাহারও বাঁচিবার উপায় নাই, 
অতএব-_ 


--লছমিয়ার কথাট। নিতান্ত মন্দ নয়। 

-কেন? 

_গীওয়ার নিপাহী শেমিজ দেখলে ক্ষেপে উঠতে পারে। 

_-তবে তো। তোমার কোট পাণ্টলুন আগে ছাড়া দরকার । 

_আমি তো ছাড়বোই--এই বলিয়া তিনি সবেগে ভিতরে প্রস্থান 
করিলেন, বলিয়া গেলেন, তোমরাও আর দেরী করো না। 

দাসী ত্বরিত পদে প্রভুর দৃষ্টান্ত অন্থুদরণ করিল ! 

আনন্দময়ীর ও্ঠপ্রান্তে ক্ষুদ্র একটুখানি হাসির আভাস দেখ। দিল, 
তিনি অধব্যক্ত স্বরে বলিলেন,--ওদিকে সিপাহীরা ক্ষেপেছে এদিকে 
দেখছি বাঙালী বাবুও ক্ষেপে উঠল। 

অন্তঃপুরে এতক্ষণে না জানি কি কাণ্ড ঘটিতেছে দেখিবার জন্য 
তিনি প্রস্থান করিলেন। 


৩ 


সে রাত্রে মুখুজ্জে পরিবারের কাহারো আহার হইল না। আর 
ঘুম, শুধু সে পরিবারে কেন, সে রাত্রে নিদ্রা শহরেই পদার্পণ করিল 
না। সারারাত্রি শহরময় যে কাণ্ড চলিল ভারতবর্ষের ইতিহাসে 
তাহার তুলন বিরল! সময়টা জ্যৈষ্ঠ মাস, নিদারুণ খরার সময়; 
যেখানে একটি অগ্রিশ্কুলিঙ্গ পড়িতেছে লঙ্কাকাণ্ড ঘটিতেছে। বাঁশের 
গিরা ফাটিতেছে ফটাপ; গাঢ ধোয়ার কুগুলী ভেদ করিয়া প্রকাণ্ড 
একটি অগ্নিময় জিহ্বা আকাশে প্রসারিত হইয়া যায়ঃ সঙ্গে সঙ্গে 
জনতার উল্লাসের আর একটি শব্দময় জিহ্ব। তাহার প্রতিস্পধণ করে। 
জানলার ধারে বসিয়া মুখুজ্জে দম্পতি দেখিতেছে অনুরে--ক্ষণে আলো! 
ক্ষণে আধারে ঠাহর হয় না ঠিক কত দূরে, অসংখা ছায়ামূতি রহিয়! 
রহিয়া ভান্বর হইয়া উঠিতেছে, দেখিতেছে অগ্নিবলয় ক্রমেই স্ফীত 
হইয়। চলিয়াছে, বৈশ্বানরের রক্ত-অশ্বের একি ভয়াবহ অশ্বমেধ লীলা ; 
শুনিতেছে ওখানে প্রচণ্ড কোলাহল, অথচ এখানে স্বপ্নময় অস্বাভাবিক 
এক নৈঃশব্য; তাহারা অভিভূতের ন্যায়, স্তম্তিতের হ্যায়, মুটের 
হ্যায় একাপনে বলিয়া প্রহর যাপিতে লাগিল। বাড়ীতে চাকর, 
দারোয়ান, কোচম্যান, চাপরাশিতে অনেকগুলি প্রাণী, কিন্ত কোথায় 
তাহার! সব ! কেবল এ লছমিয়া পাশের ঘরটিতে প্রভু-দম্পত্তির মতোই 
ভীতিবিহ্বল হইয়া বসিয় আছে। ক্রমে কালরাত্রি প্রভাত হইল । 
সে কি প্রভাত, সে কি দৃশ্ঠ, গ্রলয়-রাত্রির অবসানে সূর্য উদিত হইলে 
বোধ করি জগতের এইরূপ ভগ্রদা। গকট হয় ! 

ভোর হুইলে আনন্দমমী ব্বামীর জন্ত চা তৈয়ারী করিয়া দিলেন! 
কিন্তু তার পরেই মুস্কিল আহার্য না থাকিবার মধ্যেই : চাল, ডাল, 
তেল, স্থুন অবশ্য আছে, কিন্তু তরিতরকারি মাছ? এদিকে চাকর 
দারোয়ানেরও দেখা নাই। কৃষ্ণদয়াল বিশ্মিত হইলেন, তাহারা গেল 
কোথায়? বিদ্রোহ, বিপ্লব ইত্যাদি সম্ন্ধে তত্বজ্ঞান থাকিলে তিনি 


৯ চাপাটি ও পঞ্প 


বুঝিতে পারিতেন যে, ঝড় উঠিলে গাছের ফল পড়ে, ফল কুড়াইতে 
লোক ছুটিয়। যায়, বিদ্রোহ ঘটিলে তাহার বাস্তব ফল কুড়াইবারও 
তেমনি লোকের আবশ্যক হয় । 


অগত্যা কিছু তরিতরকারি সংগ্রহের আশায় কৃষ্জরয়ালবাবু বাহির 
হইলেন । খাঁনিকট। আসমিয়। সিভিল লাইনের মধ্যে গ্রবেশ করিলেন । 
কিন্তু একি দৃশ্য। দগ্ধ বাংলোগুলার তণ্ত প্রাচীর চারটা শুন্ে হাত 
তুলিয়া! দণ্ডায়মান, এমন সারি নারি । বাংলোর প্রাচীরগুলা স্থাবর 
বলিয়াই বোধ করি আছে -আর কিছুই নাই। জানালা, দরজা, 
খাট, চৌকি, আলমারি, আসবাবপত্র সমস্ত অপস্থত | যাহা লওয়। সম্ভব 
হয় নাই তাহা ভগ্নাবস্থায় ছড়াছড়ি যাইতেছে । অকিঞ্চিংকর জঙ্গম 
পদার্থ এখনো যাঁ ছু'চারটি আছে, বিদ্রোহের বাস্তব ফল লাভেচ্ছুগণ 
নিজেদের মধ্যে কাড়াকাড়ি করিয়া তাহ সরাইতেছে। আইন ও 
শৃঙ্খলার লেশমাত্রও কোথাও নাই। কৃঞ্খদয়ালবাবু ভাবিলেন কয়েক 
ঘণ্টার মধ্যে একি পরিবর্তন। কোম্পানীর সরকারের উপরে তাহার 
মতে। লোকের অটল বিশ্বাস, সেই বিশ্বাস টলিয়া যাওয়াতে নিজেকে 
তিনি ভারকে ব্দ্রচ্যুত গ্রহের মতো বোধ করিতে লাগিলেন। তিনি আর 
চলিতে পারিলেন না, কেন বাহির হুইয়াছিলেন তাহাও মনে পড়িল ন? 
তিনি যন্ত্রবৎ ফিরিয়া আসিলেন। এ দগ্ধ বাংলোগুলার শুম্ত প্রাচীর- 
গুলার মতোই তাহার অবস্থা এখন নিরর্৫থক | 

সন্ধ্যার সময় মুখুজ্জে দম্পতি ঘরের মধ্যে বসিয়া আছেন এমন 
সময় লছমিয়! ঢুকিল। আনন্দময়ী শুধাইলেন-_লছমিয়৷ কি খবর? 

--তেওয়ারি এসেছিল । 

তেওয়ারি বাড়ীর অন্ততম চাঁকর। 

--কাল থেকে কোথায় ছিল? 


_ লছমিয়া সে ওশ্সের উত্তর দেওয়া! আবশ্যক মনে করিল না) বলিল, 
মাইজি, কি হয়ে গেল। 


স্কেন রে? 


চাপাটি ও পদ্স ১৩ 


--দানিয়েল সাহেব গুলি লেগে মরলো । হিউম সাহেব আর 
আর গোরা লোগ, বিবিলোগ সব পলাইল। 

--কার কাছে শুনলি ? 

--তেওয়ারি বল্লে। 

_-আর কি বল্ল? 

_-বল্ল যে কোম্পামীর মুন্তুক খতম হইয়ে গেল । 

--এবার কার মুন্তুক হ'ল। 

বাদশার. দিল্লীর বাদশার । 

এতক্ষণ কৃষ্জদয়ালবাবু শ্রোতামাত্র ছিলেন, কিন্তু সংলাপ রাজ- 
ফ্রোহিতার সীমানায় প্রবেশ করিয়াছে দেখিয়া তিনি বলিলেন--ওসব 
বাক্তে কথ রাখ.। 

--তেওয়ারিটা গেল কোথায় ? 

_-সিপাহী লোগ দিল্লী চলছে । তেওয়ারিভি দিল্লী যাইছে। 

কষ্দয়ালবাবু নিক্ষল আক্রোশে ভাবিতে লাগিলেন চব্বিশ ঘণ্টা 
আগে হইলেও তিনি তেওয়ারিকে দেখিয়া লইতেন। বহু দিনের 
বাঙালী সংস্কার কয়েকটি শব্দ সমন্বয়ে তাহার অন্তরে ঝঙ্কার দিয়া 
উঠিল--ঘত সব ছোট লোকের আস্প্ধ৭। 

এমন সময়ে ঘরের বাহিরে একটি অস্ফুট আর্তনাদ উঠিল। রাত্রি 
তখন অতীত প্রহর । 


৪ 


স্তিমিত-আলোক গৃহের মধ্যে চাপা গলায় মুখুজ্জে দম্পতি কথা 
বলিতেছিলেন। কৃষ্ণদয়াল শুধাইলেন-_-কি হ'ল? 

আনন্দময়ী বলিলেন--একটি ছেলে, বেশ ফুটফুটে আর বেশ 
সবল। 

--কিস্ত এ আপদ এখন রাধি কোথায়? 


১১ চাপাটি ও পদ্ম 


_ প্রসূতির অবস্থা ভালো! নয়, বোধ হয় টিকবে না। 

--বলো কি, কিন্তু তার আগেই আমাদের না নিকেশ হতে হয়। 

-কেন? 

কেন, বোঝো না? সিপাহীর৷ খবর পেলে কি আর আমাদের 
আস্ত রাখবে? 

--ভাগ্যি ভালো যে আজ তোমার পশ্চিম চাকর-দারোয়ানগুলো 
নেই, থাকলে জানাজানি হয়ে যেতো । 

--কিস্ত লছমিয়া৷ তো আছে ! 


--আরে সে যে স্ত্রীলোক । স্ত্রীলোক কি স্ত্রীলোকের এমন বিপদে 
সাড়া না দিয়ে পারে । লছমিয়াকে কাগর কোন ভয় নেই। 


»-কিস্তু মেয়েটা এখানে এলো কোথা থেকে কিছু শুনেছ ? 

--ওর। আইরিশম্যান না এমনি কি বলছিল। 

-হ্থ্য আয়ারল্যাণ্ডের লোককে আইরিশম্যান বলে । 

-_-ওর স্বামী পান্রী। ওরা থাকতো শিকোয়াবাদে, অনেককাঁল 
সেখানে ছিল, সেখানেই হিন্ৃস্থানী শিখেছে, বেশ হিন্দী বলতে পারে। 

--কি বলল? | 

_শিকোয়াবাদের সিপাহীরা ক্ষেপে উঠলে ওরা স্বামী-্ত্রীতে 
পালিয়ে এটোয়া আসবে বলে রওনা হয়। ওদের ধারণ ছিল, এখানে 
গোলযোগ ঘটে নি। 

--তারপরে ? 

-আজ বিকালবেল। পিপাহীরা ওর স্বামীকে হত্যা করে। 
মেয়েটা কোন রকমে লুকিয়ে নদী বরাবর চলতে আরম্ত করে, 
সন্ধ্যাবেলায় আমাদের বাড়ীর কাছে এসে বসে পড়তে বাধ্য হয়, আর. 
চলবার শক্তি ছিল না। মেয়েটা বারবার বলছিল, তোমরা আশ্রয় 
না৷ দিলে পথে পড়ে মরতে হত 

--এখন কি করছে ? 

--ও বুঝতে পেরেছে যে, ওর আর বেশি সময় নেই, ওর স্বামী 


চাঁপাটি ও পক্স ১২ 


নাকি ওকে ডাকছে। বলছে কোন রকমে ছেলেটাকে তোমরা রক্ষা 
করো । 

দাড়াও আগে আমরা রক্ষা পাই । 

--কে আর জানছে? আছে তো এ গোয়াল ঘরে। 

যারা জানবার ঠিকই জানবে। 

এমন সময়ে লছমিয়া ঘরে ঢুকিয়া আনন্দময়ীকে কি যেন বলিল । 
কুষ্ণদয়াল ব্যস্তভাবে শুধাইলেন--আবার কি হল? 

--যা আশঙ্কা করেছিলাম, তাই হয়েছে । 

কুষ্ণদয়াল চমকিয়! উঠিলেন-_-কেউ খবর পেয়েছে নাকি ? 

__নী, মেয়েটা মারা গেছে। 

-যাক, একটা আপদ তে! চকলো । ভগবান ! 

কৃষ্ণদয়ালের মাতা লোকের মুখে ভগবানের নাম শুনিয়াই বুঝিতে 
পারা উচিত, তাহার উদ্বেগের গুরুত্ব কি বিষম | 

তিনি শুধাইলেন--কিস্তু এখন মৃতদেহটা নিয়ে কি করবে ? 

--যা করবার আমর! করছি । তুমি চুপ করে থেকো । 

- ছেলেটা ? 

__দ্ুমুচ্ছে। তার জন্যে তোমার ভাবন। নেই। 

এই বলিয়া আনন্দময়ী লছমিয়াকে লইয়া বাহির হইয়া গেলেন । 

কৃষ্ণদয়াল কতক্ষণ একল ছিলেন, সে জ্ঞান বোধ করি তাহার 
ছিল না। যখন সম্বথিৎ হইল, কানে শুনিলেন দেয়ালের ঘড়িতে তিনটা 
বাজিতেছে আর চোখে দেখিলেন সম্মুখে সিক্তবসনা আনন্দময়ী । 

--একি কাপড় ভিজলে। কি করে ? 

_লছমিয়া আর আমি ধরাধরি করে নিয়ে গিয়ে দেহটা নদীতে 
ভাঙিয়ে দিলাম । তাই একটা ডুব দিতে হল। 

»-যাঁক, বাঁচিয়েছ। এখন ছেলেটাকে নিয়ে কি করি? 

-সে আমি দেখবো । তুমি একটু শোও দেখি। 

--আর কি শোবার সময় আছে। বাইরে এতক্ষণে বোধ করি 
আলো হয়েছে। 


১৩ চাপাটি ও পদ্ম 


-তবে থাকো, আমি আমি । বলিয়! আনন্দময়ী প্রস্থান করিতে 
উদ্ধত হইলেন, তখনি আবার ফিরিয়া আসিয়া বলিলেন, দেখো, কেউ 
যদি কিছু জিজ্ঞাসাবাদ করে, সব অস্বীকার করবে । 

যদি তল্লাসী করতে চায়? 

বাধা দিও না, একে একে সব ঘরগুলে। দেখিয়ে দিয়ো । 

_-কিস্ত-- 

__কিন্ত আমি বুঝবো, তোমার চিন্তা নেই। 

এই বলিয়। তিনি প্রস্থান করিলেন । 

আনন্দময়ীর আশঙ্কাই বুঝি সত্য হয়! কারণ ঠিক পর মুহ্ুতেই 
সম্মুখে একদল লোকের পদশব্দ শ্রুত হইল এবং সঙ্গে সঙ্গে একটা 
নাকাড়া বাজিয়! উঠিল। নাকাড়ার শব্দ থামিলে একজন নকীব 
তারস্বরে হাকিল--. 

খাল্ক-ই-খুদ 
মুল্কৃ-ই-বাদশা 
হুকৃম্ই-সিপাহী । 

নকীব থামিলে দরজায় ঘ পড়িল, এ মুখাজিবাবু, এ মুখাজিবাবু। 
মুখাজিবাবু ঘরের মধ্যে বসিয়া পলকে প্রলয় গণিতেছিলেন, পাছে 
দরজ। ভাঁডিয়া ঢুকিয়া পড়ে অথচ দরজ। খুলিবারও সাহস নাই, তাই 
মাঝামাৰি রফা করিয়া জানল! খুলিয়। হিন্দিতে শুধাইলেন--কি বাবা 
সব। 

অপর পক্ষ হইতে হিন্দিতে বলিল- দরজা খুলুন । আমরা সংবাদ 
পেয়েছি যে আপনার বাড়ীতে এক ফিরিঙ্গি মেয়ে আশ্রয় নিয়েছে । 

কৃষ্ণদয়াল ইতস্তত কারতেছেন, দরজ। খুলিবেন কিনা, এমন 
সময়ে পিছন হইতে আনন্দময়ী বলিলেন, দরজ। খোলো, তারপরে চাপা 
গলায় বলিলেন, কোন ভয় নেই। 

কৃষ্ণদয়াল দরজা খুলিয়া দিলেন, একসঙ্গে চার পাঁচজন সিপাহী 
ভিতরে প্রবেশ করিল। তাহাদের একজন বলিল-আমরা বাণী 
তল্লাসী করবে । 


চাপাটি ও পদ্প ১৪ 


সনিবীময়ী অগ্রসর হইয়া আসিয়া বলিলেন, বেশ তে। এসো । 

আনন্শ্নয়ীকে দেখিয়া সিপাহীরা সন্ত্রম প্রকাশ করিল, বলিল, 
মাইজি স্লোম। কিন্ত তাহাদের সন্কল্প লিল না। তখন আনন্দময়ী 
আগে আগে চলিলেন, পিছনে চলিল্‌ সিপাহীরা, সকলের পিছনে 
চলিলেন কুষ্ণদয়ালবাবু। তখন মনে মনে নিশ্চয় তিনি ভগবানের 
নাম করিতেছিলেন। কারণ দিপাহীদের ভাবগতিকে বুঝিয়া লইয়া- 
ছিলেন যে, হিউম সাহেবের প্রতাপের দিন গত হইয়াছে । 

আনন্দময়ী একে একে ঘরগুলি দেখা ইতেছেন। 

--এই দেখো শোবার ঘর। 

--এই আর একটা শোবার ঘর। 

--এই ঘরে বাক্স পেঁটরা থাঁকে। 

"এই যে খাবার ঘর, তার পাশেই ভাড়ার ঘর। ন।; না, বাধ! 
নেই ভিতরে এসে দেখো । 

দিপাহীর। আর ভিতরে আদিল না, বাহির হইতে উকি মারিয়া 
মাত্র দেখিল। 

-মাইজি, ওটি কিসের ঘর? 

- গোয়াল ঘর। চলো ওদিকে যাই। 

_ দেখলে তো, আর বৈঠকখান। ঘর তো গোড়াতেই দেখেছ । 
আর তো বাপু কোন ঘর নেই। 

দিপাহীর। বুঝিল ভূল সংবাদ পাইয়াছিল। 

একজন সিপাহী শুধাইল, মাইজি ও ঘরটি তো দেখালেন না। 

-_ভুল হয়েছিল বাপু । ওটি আমার পুজোর ঘর, ওখানে ঠাকুর 
আছে ; চলে দেখবে। 

সিপাহীরা! জিভ কাটিয়া বলিল, শরম ক! বাৎ হ্যায় মাইজি । 

তারপর কৃষ্ণদয়ালের দিকে তাকাইয়1 যাহা! বলিল, তাহার মমার্থ 
হইতেছে--যদিচ বাঙালীবাবুরা আচার বিচার মানে না, খাস্তাখা্ 
বিচার করে না, তাহাদের একরকম খৃষ্টান বলিলেই হয়, তবু ঠাকুরঘরে 
ফিরিঙ্গিকে স্থান দিবে ইহা একেবারেই অবিশ্বাস্য । 


১৫ চাপাটি ও পদ্ধ 


অতঃপর সিপাহীর! মুখুজ্ছে দম্পতিকে, বিশেষভাবে আনন্দময়ীকে 
সেলাম করিয়! বিদায় হইয়া গেল। 

তাহারা নিরাপদজনক দূরত্বে চলিয়া গেলে কৃষ্ণদয়াল শুধাইলেন, 
ছেলেটাকে কি করলে ? নদীতে ভাঙিয়ে দিয়েছ নাকি ? 

আনন্দময়ী বলিয়। উঠিলেন, ষাট, ষাট, অমন কথা বলতে নেই । 

তবে কোথায় ? 

স্পদেখবে এসো । 

স্বামীকে সঙ্গে করিয়া লইয়া গিয়া! ঠাকুরঘরে দরজ! খুলিলেন, 
কৃষ্ণদয়াল দেখিতে পাইলেন, আনন্দময়ীর আরাধ্য দেবতা শ্্রীগৌরাঙ্গ- 
মৃতির পায়ের কাছে লছমিয়ার কোলে শুইয়। নবজাতক নিশ্চিন্ত মনে 
আঙ,ল চুষিতেছে ! 

কৃষ্দয়ালের মনে হইল, তিনি এক অসম্ভব স্বপ্ন দেখিতেছেন। 


তিন চারদিন পরের ঘটনা । কানপুর হইতে একদল বৃটিশ সৈন্ 
এটোয়াতে আসিয়া পৌছিয়াছে ;ঃ এটোয়। এখন শান্ত; আইন ও 
শৃঙ্খলা আবার প্রতিষ্টিত হইয়াছে । পথের মোড়ে লাল পাগড়ি এবং 
ইতস্তত; লালকোর্তা দেখিয়া কৃষ্ণদয়ালের সাহম যে-পরিমাণে 
বাড়িয়াছে, ভগবদ্ভক্তি সেই পরিমাণে কমিয়াছে, কৃষ্দদয়াল বুঝিতে 
পারিয়াছেন যে, ভগবান সাময়িক মাত্র আর হিউম সাহেব বা তাহার 
স্থলাভিষিক্ত ব্যক্তিই চিরকালীন আশ্রয় । 


কৃষ্ণদয়ালবাবু ও আনন্দময়ীতে কথোপকথন হইতেছিল। 

কৃষ্ণদয়াল বলিলেন-- তোমার ধর্ম তো। গেল। 

আনন্দময়ী বলিলেন-__যিনি ধর্ম দিয়েছেন তিনিই বাছাকে 
দিয়েছেন । 

--এখন আচার বিচারের কি হবে? 

--এবারে বিচার করে আচার করবো । 

- আমার বিচারে কি বলে জানো? শুধু তোমার জাত যায়নি, 
তোমার ঠাকুরস্দ্ধ অপবিত্র হয়েছেন। 


চাপাটি ও পদ্ম ১৬ 


--উনি যে প্রেমের অবতার । উনি জাত বিচার করেন না বলেই 
বাছাকে আশ্রয় দিয়ে রক্ষা করেছেন। নইলে সাধ্য ছিল কি সেদিন 
ওকে সিপাইদের হাত থেকে রক্ষ। করি। 


__বেশ, বেশ, তোমার গৌরাঙ্গের পোস্ুপুত্রের নাম রেখো “গোরা”, 
ওতে ওর পিতৃকুলের পরিচয়টাও থেকে যাবে । 


--সে দেখা যাবে। 


-_ দেখো, যে কথা বলতে এসেছিলাম ।॥ ওকে পাত্রীদের হাতে 
দিয়ে দিই। 


_কেন? 
নইলে শেষে বিপদে পড়বো । সরকারের কাছে জবাবদিহিতে পড়তে 


হবে, চাকরি যাবে। এখনো সব স্বীকার করে পান্রীর হাতে দেওয়া 
ভালো । 


অচিরজাত সেই শিশুকে পান্দ্রীর হাতে দিতে হইবে এই আশঙ্কায় 
স্বভাবতঃ সহিষণুতাময়ী আনন্দময়ী আবেগে কাপিতে লাগিলেন, তাহার 
চোখ দরিয়া জল গড়াইয়া পড়িতে লাগিল, তিনি আর স্থির হইয়া 
থাকিতে পারিলেন না, কম্পিত কণ্ঠে বলিতে লাগিলেন_-“তোমার 
তো মনে আছে ছেলে হবার জন্য আমি কি-না! করেছি, যে-যা বলেছে 
তাই শুনেছি, কত মাছুলি, কত মন্ত্র নিয়েছি, সে তো তুমি জানই। 
একদিন স্বপ্নে দেখলুম যেন সাজি ভ'রে টগর ফুল নিয়ে এসে ঠাকুরের 
পুজো করতে বসেছি, এক সময়ে চেয়ে দেখি সাজিতে ফুল নেই, ফুলের 
মতো! ধবধবে একটি ছোট্ট ছেলে ; আহা, সে কি দেখেছিলুম, সে কি 
বলবো, আমার ছুই চোখ দিয়ে জল পড়তে লাগলো, তাকে তাড়াতাড়ি 
কোলে তুলে নিতে যাবো আর ঘুম ভেডে গেল। তার দশদিন ন৷ 
যেতেই তো ওকে পেলুম, সে আমার ঠাকুরের দান, সে কি আর কারো 
যে আমি কাউকে ফিরিয়ে দেবো । আর জন্মে তাকে গর্ভে ধারণ করে 
বোধ হয় অনেক কষ্ট পেয়েছিলুম, তাই আজ সে আমাকে ম। বলতে 
এসেছে । কেন, পাদ্রীকে দিতে যাবো কেন? পান্রী কি ওর মা-বাঁপ» 


১৭ চাপাটি ও পপ 


না, ওর প্রাণরক্ষা করেছে 1.""তুমি বাই বলো, এছেলে যিনি আমাকে 
দিয়েছেন, তিনি স্বয়ং যদি না নেন, তবে প্রাণ গেলেও আর কাউকে 
নিতে দিচ্ছি নে।” 

মাতৃহ্ৃদয়ের এই ন্বসমুখখ দাবীর বিরুদ্ধে কি বলিবেন ভাবিয়া ন। 
পাইয়া কৃষ্দয়াল নিবাক হুইয়। রহিলেন। 


জেমি গ্রীনের আত্মকথ। 


আজ যে কাহিনী বলিতে বপিয়াছি তাহা! জীবনীও বটে, ইতিহাসও 
বটে ; তারও চেয়ে কিছু বেশি, ইহ! মনোরম ও চিত্তাকর্ষক একটি গল্প । 
এমন কত-শভ গল্পের ভাঙ! টুকরা হিন্দৃস্থানের মাঠময় ছড়াইয়! পড়িয়। 
আছে কে তাহার সন্ধান রাখে। কেহ সেগুলি সংগ্রহ করিলে, যত 
করিয়া বিন্যস্ত করিলে ভারতজোড়া উপন্যাসের সৌধ হইতে পারে। 
তেমন শিল্পসাধ্য আমার নাই, আমি ছোট টুকরা সংগ্রহ করিয়াছি । 
এই কাহিনী-খগুটি এমনই অসাধারণ যে, ইহার উপরে কারিগরি 
করিবার প্রয়োজন নাই, যেমন আছে তেমনি পাঠকের সম্মুখে ধরিতেছি, 
ইহার অসামান্ততা নিতান্ত অনবধানীর পক্ষেও অগ্রাহা করা কঠিন। 

দিপাহীবিদ্রোহের সময়। সিপাহীবিদ্রোহকে রাজনীতিকগণ নব্য 
ভারতের প্রথম জাতীয় চিত্ববিক্ষেপ বলিয়া বর্ণন1 করেন, সব এতিহাসিক 
ইহার সে দাবী সমর্থন করেন না। এঁতিহাসিকগণের মতে সিপাহী- 
বিদ্রোহকে সচেতন জাতীয় আন্দোলন বা গণবিক্ষোভ বল1 চলে না। 
বিশেষজ্ঞগণের তর্ক-বিতর্কের হুর্গম মতসঙ্কটে প্রবেশের ক্ষমতা আমার 
নাই, সে প্রয়োজনও বোধ করি নাই। ইহা নব্য ভারতের প্রথম 
জাতীয় চিত্তবিক্ষেপ না হইলেও হইতে পারে, কিন্তু ইহা যে মুঘল 
ভারতের শেষ রাষ্ত্ীয় চিত্তবিক্ষেপ তাহাতে সন্দেহ নাই। নিপাহী- 
বিদ্রোহের অধিকাংশ নেতার কার্ধকলাপ এই মতেরই সমর্থক । তবে 
ব্যতিক্রম আছে। আজ ধাহার কথা৷ বলিতে বনিয়াছি তিনি এক 
ব্যতিক্রম । 

ইংরাজি-শিক্ষিত সম্তরান্ত বংশজাত এই যুবক সচেতন প্রয়াসে 
কোম্পানী রাজত্ব উৎখাত করিবার আকাজক্ষ করিয়াছিলেন এবং তাহার 
আকাজ্ষা আংশিক ফলিয়াছিল । ইংরাজ ভারত ত্যগ করে নাই, কিন্তু 
সিপাহীবিদ্রোহের পরিণামে কোম্পানীর রাজত্বের সত্যই অবসান 
ঘটিয়াছিল। দীর্ঘ ভূমিকা নিশ্রায়োজন, ইহার আত্মকথা শুনিলে নব্য 
ভারতবাসী তাহাকে মুহূর্তে আপনার কথা বলিয়। বুঝিতে পারিবে । 


২ 
কথারস্ত 


১৮৫৮ সালের ফেব্রুয়ারী মাস। স্যার কলিন ক্যাম্পবেলের অধীনে 
বৃটিশ সৈন্য লখনৌ অধিকার করিতে চলিয়াছে। কানপুর হইতে লখনৌ 
চল্লিশ মাইল পথ। বৃটিশ সৈন্য কানপুরে গ্গ। পার হইয়া লখনৌ মুখে 
উত্তর দিকে যাত্রা করিয়াছে । বৃটিশ বাহিনীর অগ্রগামী দলের ঘণাটি 
আলমবাগ লখনৌ শহরের উপক্, তিন মাইল দক্ষিণে । কানপুর হইতে 
আলমবাগ পর্যস্ত ভূখণ্ড বৃটিশ পদাতিক, অশ্বারোহী, গোলন্দাজ প্রভৃতির 
চলাচলে ব্যস্ত। মাঝখানে উনাও শহর | এখানে একটি বড় ঘাঁটি। 
এখানে অনেক তাবু পড়িয়াছে, কিছুদূরে অস্থায়ী বাজার বসিয়! গিয়াছে, 
সৈম্তবাহিনী তাবু গাড়িলে যেমন বাজার বমে তেমনি । এই কাহিনীর 
দুইজন নায়ক, প্রথম নায়ক ফরবেস-মিচেল, ৯৩ নম্বর হাইল্যাগ্ডার 
রেজিমেন্টের একজন সাজেপ্ট, প্রধান নায়ক গুবোক্ত যুবক । ফরবেস- 
মিচেল শহরের একটি বাড়িতে আশ্রয় লইয়াছে। সন্ধ্যা আসন্ন । 

সে একাকী বসিয়। আপন মনে ভাবিতেছিল-- 

আশ্চর্য এ লোকটা! জেমি গ্রীন, যেমন নুপুরুষ, তেমনি সুবেশ, 
তেমনি সুশিক্ষিত | ওকে কেক বিক্রি করতে দেখে প্রথমে ভেবেছিলাম 
কোন সন্ত্রান্ত বংশের ছেলে অভাবে পড়ে ফিরিঅলার কাজ করছে। 
কিন্তু লোকটা! বললে কি না দে ইংরেজ, নাম জেমি গ্রীন। ওর ইংরেজী 
ভাষ৷ আর উচ্চারণ শুনে অবিশ্বাস করা কঠিন, কোন দেনী লোককে 
এমন ইংরেজি বলতে শুনি নি। কেবল যে ব্যাকরণ শুদ্ধ তা নয় ভাষার 
মারপ্যাচ সব জানে । আর উচ্চারণ ! বই পড়ে তে উচ্চারণ শেখা 
যায় না। প্রথমে সন্দেহের বশে জিজ্ঞাস। করলাম, যুদ্ধের সময়ে কত 
অভিসন্ধি নিয়ে কতলোক আসে, জিজ্ঞাসা করতেই হয়--পাশ ঠিক 
আছে তো? সে অমনি পকেট থেকে পাশ বের করে বল্ল, সাজেপ্ট 
সাহেব পরীক্ষা করে নাও, খোদ ব্রিগেডিয়ার এড্রিয়ান হোপ সাহেবের 
হাতের অক্গর কিনা। 


চাপাটি ও পদ্প ২ 


তাই তো বটে। ব্রিশ্রেডিয়ার হোপ ৯৩ নম্বরের কনে, তীর 
হস্তাক্ষর সবাই চেনে ! 

কিন্তু এখানে কেন ? 

কি করবে! সাহেব, যেখানে রুটি সেখানে জুটি । 

সবই যেন বুঝলাম কিন্তু এমন ইংরেজি শিখলে কোথায় ? তুমি 
তো ইংলগ্ডে যাও নি। | 

সাহেব আমরা ছুপুরুষের ফৌজী মেস খানসামা । আমার বাবা ছিল 
৮২ নম্বর রেজিমেন্টের খানসামা, পরে আমিও কিছুদিন ছিলাম। 
ত'রপরে রেজিমেপ্টটা পাঞ্জাবে চলে গেলে আমি আর যাই নি। 

তারপরে একটু হেসে বলল, সাহেব গ্রামার-স্কুলে আর ইংরেজি 
ভাষার কতটুকু শেখা বায়? ওখানে ইংরেজি সরস্বতীর তে গাউনপর। 
মৃতি। ভাষ। শিখতে হয় তে৷ ফৌজী মেস। দেখি সাহেব কাগজগুলে।। 

এ বিলাতী কাগজ, এতে তোমার দরকার কি? 

সাহেব, যে দেশ বাপের জন্মে দেখলাম ন। তার খবর জানতে বড্ড 
ইচ্ছে করে। 

খবরের কাগজগুলো৷ নিয়ে উল্টে পান্টে লোকট। ষেন গোগ্রাসে 
গিলতে লাগলে। । 

এমন সময়ে ঘরের বাইরে গোলমাল শুনে তাকিয়ে দেখি জেমি 
গ্রীনের কেকের বাক্সবাহী চাকরটার সঙ্গে ফৌজী লোকদের বচস। আন্ত 
হয়েছে। : 

এমন বীভৎস চেহারার লোক আগে দেখি নি। জেমি গ্রীন যেমন 
সুপুরুষ, লোকটা তেমনি পাঁষগাকৃতি, জুটেছে ভালো, দেবদূতের সঙ্গে 
শয়তান । 

লোকটা বলছে ফৌজী আদমিরা কেক খেয়েছে, এখন দাম দিতে 
নারাজ। 

আমি কিছু বলবার আগেই জেমি গ্রীন বলে উঠল, ভাইসব, ঠা 
ঠাট্টা, কিন্ত কেক খেয়ে দাম ন! দেওয়া বোধ করি হাইল্যান্তী ঠাট্টা । 

সবাই হো হে! করে হেসে উঠলো। | ব্যাপারট 'তখনি মিটে পেল । 


২১ চাপাটি ও পদ্ম 


'শুধোলাম, জেমি গ্রীন এই বস্তীর্টকে সংগ্রহ করলে কোন্‌ 
জাহান্নাম থেকে? কোন্‌ দিন তোমাকেই খুন করবে, যা চেহারা। 
সাহেব, জাহান্নাম কি আর দূরে কোথাও আছে। কানপুরে ওকে 
পেলাম। সব লোক তো এসব মেহনতী কাজে আসতে চায় না। 
লোকট! খুব খাটিয়ে । শরীরটাঁও মজবুত, কখনো অন্ুুখ-বিস্বথ করতে 
দেখি নি। 
ওর পরিচয় কি? 
ও তো৷ বলে ইংরেজ। 
ইংরেজ? এমন পাক। আবলুশের রং হল কি করে? 
ওর মা নেটিভ খৃষ্টান । 
বাপ? 
নাম বলতে পারে না, একটি তো নয়। 
একটি নয়? 
না, রেজিমেন্টের সবাই, মায় খানসাম। অবধি সেই গৌরব দাবী 
করে থাকে। 
ছু'জনেই হেসে উঠলাম । 
নাম? 
মিকি। আচ্ছা সাহেব এবারে আমি । 
'টাটকা তাজা কেক? হাকতে হাকতে জেমি গ্রীন ও মিকি বিদায় 
হ'য়ে গেল। 
ফরবেস-মিচেলের চিন্তাস্থত্র মাঝে মাঝে ছিন্ন হ'য়ে যাচ্ছিল 
কামানের আওয়াজে । উত্তর দক্ষিণ ছুই দিক থেকেই আসছিল 
কামানের শব্দ, সমান দূরত্ব তাই সমান অস্পষ্ট। উত্তরে আলমবাগে 
জেনারেল উদ্টামের কামানের ধ্বনি, আর দক্ষিণে স্যার রবার্ট নেপি- 
য়ারের কামানের আওয়াজ কানপুরে । 
কিন্ত তার আজকার অভিজ্ঞতা এমনি অভিনব যে চিন্তার ছিন্ন ত্র 
তখনই জোড়া লেগে বাচ্ছিল, আর মে কেবলি ভাবছিল-_-আশ্চর্য এ 
লোকটা জেমি গ্রীন। 


৩ 


এমন সময়ে অদূরে 'গোয়েন্দা', “গোয়েন্দ' রব শুনতে পেলাম । 
এ রবের সঙ্গে আজকাল খুব পরিচিত হয়েছি। যেখানে বৃটিশবাহিনী 
সেখানে চারদিক থেকে ঝীকে ঝাঁকে গোয়েন্দা এসে হাজির হয়, কিছু- 
ক্ষণের মধ্যেই কাছাকাছি যত গাছ আছে সেগুলোর ডালে তাদের 
মূতদেহ ঝুলতে থাকে । অবশ্য আমাদের গোয়েন্দাদেরও এ অবস্থা 
হয় বুঝতে পারি ! ছুই পক্ষের মধ্যে এ লড়াই যে-ভাবে চলছে তাঁকে 
কশাইগিরি ছাড়া কি বল! যায়। ছুই পক্ষই সমান নিষ্ঠুর হয়ে উঠছে, 
না আছে বাছ না আছে বিচার। 

গোয়েন্দা! গোয়েন্দ। ! 

শব্দ এবার আমার ঘরের দরজায় এসে উপস্থিত হওয়ায় কৌতৃহলী 
হয়ে বাইরে বেরুলাম। বেরিয়ে দেখি--একি? এ ষে জেমি গ্রীন 
আর মিকি? 

ষে পাহারাওয়াল৷ ওদের বেঁধে নিয়ে এসেছিল বল.লে--এরা 
লখনৌর বেগমের গোয়েন্দা । ছু'জনেই মুসলমান । কর্নেল সাহেব 
বিচার করেছেন, কাল ভোরে ওদের লটকিয়ে দেওয়া হবে। কর্নেল 
সাহেবের হুকুম আজ রাতটা ওর! আপনার জিম্মায় থাকবে 

আবার মনে হ'ল আশ্চর্য গর লোকট। জেমি গ্রীন। 

ওর! মুসলমান শুনবামাত্র কয়েকজন সৈম্য বলে উঠল, নিয়ে এস 
তো বাজার থেকে খানিকটা শুওরের মাংস, হতভাগ! ছুটোর মুখে 
গুজে দি, জাহান্নামে যাবার আগে বস্তটার ব্বাদ পেয়ে যাক, কখনে! 
তে? পায় নি। 

আমি বল্লাম, সাবধান, বন্দী আমার জিম্মায়। যে ওরকম 
অসভ্যতা করবে তার চাপরাশ উদ্দি খসিয়ে নিয়ে তাকে গ্রেপ্তার 
করবে | 

আমার কথা শুনে লোকগুলোর উৎসাহ দমে গেল; যে যার 
কাজে চলে গেল। জেমি গ্রীন আর মিকিকে ঘরের মধ্যে তুললাম । 


২৩ চাপাটি ও পদ্ম 


অপমানের হাত থেকে বেঁচে যাওয়ায় শ্রী আমাকে ধন্যবাদ দিল, বলল, 
সাজেন্ট সাহেব, অনেক ধন্যবাদ, খোদা তোমার ভালে। করবেন। 


সে আরও বললে,--গ্রেপ্তার হ'বার পরে মনের মধ্যে অনেকখানি 
আগুন নিয়ে এখানে এসেছিলাম । তোমার সদয় ব্যবহারে তার কতক 
নিভ.ল ! লালমুখো ইংরেজের কাছে এরকম ব্যবহার প্রত্যাশা করি নি। 
আরও একবার আর একজন ইংরেজের কথায় মনে এমনি ভাবের উদয় 
হয়েছিল । 


মে একটি ঘটনার উল্লেখ করলে।। সে বলল, কানপুরে গঙ্গার 
উপরে বৃটিশ যে নৌকোর পুল বানিয়েছে তার রক্ষার জন্যে নিকটবতা 
একটা! শিবমন্দির ধ্বংস কর! আবশ্যক হ'য়ে পড়ল। কনে'ল নেপিয়ার 
যখন সেই মন্দিরটা উড়িয়ে দেবার আয়োজন করেছে তখন একদল 
ব্রাহ্মণ এসে বলল-_হুজুর এ মন্দিরট। রক্ষা করুন । 


নেপিয়ার বলল, দেখো, তোমাদের স্পষ্ট করে একটা কথা বলি। 
তার আগে বলে নিই যে, এ মন্দিরটার উপরে আমাদের রাগের কোন 
কারণ নেই, তবে পুল রক্ষার জন্য ওটা ধ্বংস কর! দরকার । কিন্ত 
তাতেও ন। হয় মন্দিরটা ছেড়ে দিতে পারি যদি তোমর! আমার প্রশ্নের 
মতা উত্তর দাও । 


নেপিয়ার বলল,--কিছুর্দিন আগে বিবিঘরে বহু ইংরাজ স্ত্রীলোক ও 
বালকবালিকাকে হত্যা কর! হয়েছে । তখন তোমরা সকলেই এখানে 
ছিলে। তোমাদের মধ্যে এমন একজনও কি আছে যে তাদের বাঁচাবার 
চেষ্টা করেছিলে? এমন একজনও কি আছে যে তাদের হ'য়ে ছুটে 
কথা বলেছিলে, বলেছিলে অসহায় নারী ও শিশু হত্যা করা পাপ? 
যদি তোমরা বলে। যে হা আমি বলেছিলাম, সিপাহীপক্ষ শোনে নি, 
তাতেই আমি খুশী হ'ব--মন্দির বেঁচে যাবে। ব্রাহ্মণের দল মুখ নীচু 
ক'রে চলে গেল। কি আর বলবে । নেপিয়ার হুকুম করলেন, বারুদে 
আগুন দেওয়। হ'ল--গুম, মন্দিরের ভাণ্া। ইট কাঠ আকাশে লাফিয়ে 
উঠল । 


চাপাটি ও পদ্স র ২৪ 


সে বলল, আমি তখন ক্ীছেই দাড়িয়ে ছিলাম, সব শুনলাম, সব 
দেখলাম । মনে মনে নেপিয়ারকে প্রশংসা করলাম । 

তারপরে আমার দিকে তাকিয়ে গ্রীন বলল,--সাজেন্ট, তোমার 
কথায় আজ আমার ফালির আসামীর মনটা শাস্ত হ'ল। খোদার 
কাছে শাস্তভাবে যেতে পারবে, গিয়ে আবার তোমার ভাল করবার 
জন্য আরজি করবে। ৷ 

তার এই ধন্যবাদের বদলে আমি তার হাতের বাঁধন খুলে দিতে 
আদেশ করলাম । সে খুশী হ'য়ে নমাজ পড়তে লাগল। অবশ্য 
পাষগুদর্শন মিকির বাঁধন খুলে দিতে সাহস করি নি, আর সে বোধ করি 
নমাজ পড়বার জন্তে ব্যস্তও ছিল না। সে এক পাশে মুখ গৌঁজ 
ক'রে বসে খুব সম্ভব মনে মনে আমার মুগুপাত করছিল । 

ওর নমাজ পড়া শেষ হলে আমি একজন পাহারাওয়ালাকে বাজার 
থেকে একজন মুনলমান হোটেলওয়ালাকে ডেকে আনতে বল্লাম। 
হোটেলওয়ালা এলে বল্লাম, এরা ছুজন বা খেতে চায় দাও, আমি 
খরচ দেবে । 

হোটেলওয়ালা! বল্ল, সে কি কথা সাহেব! এই ফাসির 
আসামীরা মুসলমান, আজ তাঁদের খানা জুগিয়ে দাম নেবো? আর 
আপনি ষদি দিতে পারেন তা আমরা কি দিতে পারি নে? নী, দাম 
দেওয়৷ চলবে না। 


জেমি গ্রীন বেশ তৃপ্তির সঙ্গে খান খেয়ে আয়েস করে তামাক 
টেনে স্থির হয়ে বসঙ্গে আমি তাঁকে বললাম, জেমি গ্রীন, তোমাকে 
শিক্ষিত ভদ্রবংশজাত ব্যক্তি বলে মনে হয় তুমি গোয়েন্দাগিরি করতে 
গেলে কেন? নিশ্চয় এই হীন বৃত্বির সঙ্গে অনেক ক্ষোভ আর 
অনেক রহস্য জড়িত । সরলভাবে তোমার জীবনকথ। আমাকে বলো-- 
আমি লিখে আমাদের দেশের কাগজে ছাপবে। | 

খুব উপকার হবে সাহেব, কারণ লগুন ও এডিনবরায় আমার 
পরিচিত বন্ধুবান্ধব আছে। 

লগ্তন ও এডিনবরায়? তোমার বন্ধু? 


হ৫ চাপাটি ও পন্ম 





বিন্ছে? আমার জীবনকথা শুনলে বিস্ময়ের নিরসন 

হবে। আমার বন্ধুরা আমাকে গোয়েন্দা বলে জানবে এর 
চেয়ে ছুঃখের আর কি হ'তে পারে ? 

তুমি কি গোয়েন্৷। নও? 

সাধারণত গোয়েন্দা বলতে ষ। বোঝায় আমি ত1 নই, তবে আমি 
সিপাহীপক্ষের লোক বটে। আমার জীবনকথা শুনলে বুঝতে 
পারবে কেন আমি কোম্পানীর চাকুরে হয়েও বিদ্রোহীপক্ষে যোগ 
দিলাম ! বুঝতে পারবে কোন্‌ ক্ষোভ, কোন্‌ জাল আমাকে চাকুরির 
মায়! ছাড়িয়ে এমন আত্মনাশের পথে টেনে আন্লো। আর বুঝতে 
পারবে কি না জানি নে, এই জ্বালা, এই ক্ষোভ, কেবল আমার একার 
নয়, আমার মতো! ইংরাজি-শিক্ষিত অনেকেরই । সাহেব একটা! 
ভবিষ্যদ্বাণী করছি, আসন্ন মুত্যুকালে বোধ করি ভবিষ্যতের জানলা 
দরজ। একটু ফাক হয়ে যায়, যেদিন ইংরাজি-শিক্ষিত লোকে তোমাদের 
প্রতি বিরূপ হবে সেদিন তোমাদের হিন্দুস্থানের মসনদ টলবে। গোয়ার 
সিপাহীদের সাধ্য কি সে আসন টলায়। দেশময় আজ যেকাণ্ড 
চলেছে এ হচ্ছে পুরনে। হিন্দুস্থানের অস্তিম বিকার ; এ ঝড় কেটে 
গেল; কিন্তু যে ঝড়ে তোমাদের হিন্দুস্থান ছাড়া করবে, তার 
কেন্দ্র হচ্ছে বেরিলি কলেজের মতো নয়া তালিম। সেদিনকার সেই 
ঝড়ের আকর্ষণে তামাম হিন্দৃস্থান উল যায়েঙ্গে । তখন জানবে 
তোমাদের আসন টলল। বোধ করি সেদিন ভালে করে জানবারও 
অবকাশ পাবে না, সমস্ত এক লহ্মায় হুড়মুড় করে ধনে পড়বে । 

সে যখন এই কথাগুলো বলছিল মমি স্থির করেছিলাম আজ 
রাতট। জেগেই কাটাবো। প্রথমত তার কাহিনী শোনবার কৌতুহল, 
দ্বিতীয়ত ভ্রেগে থাকলে . চোখের উপরে রেখে তাকে খানিকটা মুক্ত 
রাখতে পারবো । নয় তো হাত পা বেঁধে ফেলে রাখতে হয়। তাই 
সারারাত্রি জাগবার উদ্দেশ্যে স্থির হয়ে বসলাম । বললাম, জেমি 
গ্রীন, আমার কৌতৃহল ক্রমেই বাড়ছে, বলো, তোমার নাম, ধাম, 
বংশপরিচয়, পূর্ব বৃত্তাস্ত কি? 


চাঁপাঁটি ও পদ্ম ২৬ 
সে শুরু করলে । 


আমার নাম মহম্মদ আলি খা, রোহিলখণ্ডের এক অতি সন্ত্াস্ত 
মুসলমান জায়গীরদার পরিবারে আমার জন্ম । আমি বেরিলি কলেজ 
থেকে পাশ করে বেরিয়ে রুড়কি ইঞ্জিনীয়ারিং কলেজে প্রবেশ করি। 
সেখানকার শেষ পরীক্ষায় আমি প্রথম হলাম, দেশী ও ইংরেজ সব 
ছাত্রের চেয়ে অনেক বেশী নম্বর পেয়েছিলাম । এবারে প্রশ্ন হল-- 
এখন কি করবো? চাঁকুরিতে ঢুকবো কি? বাবা বললেন যে, 
কোম্পানীর চাকুরী গ্রহণ করো । তিনি বললেন, রাজত্ব কোম্পানীর, 
এখন মান সম্মান টাকাকড়ি কোম্পানীর চাকুরিতে। কোম্পানীর 
চাকুরি নাও। 

তাই নিলাম, কোম্পানীর ফৌজী এঞ্জিনীয়ারিং বিভাগে প্রবেশ 
করলাম। সেই থেকে আমার পরীক্ষা আরম্ভ হল। ভাগ্যের কি 
লীলা । এঞ্জিনীয়ারিং বিভাগের জমাদার নিযুক্ত হলাম আমি আর 
আমার উপরওয়াল। হল এক ইংরেজ, বিলেতে থাকলে যে মিস্ত্রী ছাড়। 
আর কিছু হতে পারতো! না। কেন এমন হল? না! আমি দেশী 
লোক। আমার গুণপন। যতই হোক একজন আকাট মূর্খ ইংরেজের 
উপরে ওঠবার আমার শক্তি হল না। আর সে লোকটার কি দস্ত 
আর অবহেলা! । প্রতি মুহূর্তে সে বুঝিয়ে দিত যে সে ইংরেজ আর 
আমি নেটিভ। অল্পদিনেই আমার মন বিষাক্ত হয়ে উঠল প্রথমে তার 
উপরে, তারপরে কোম্পানীর ব্যবস্থার আর তার রাজত্বের উপরে ! 
সাহেব, আজ যে পথে আমায় দেখেছ সে পথে টেনে এনেছে কে? 
এ লোকটার মত দম্ভী ইংরেজ। এ কেবল আমার একলার অভিযোগ 
নয়--আমার মত ইংরেজী-শিক্ষিত সমস্ত ভারতীয়েরই অভিযোগ । তবে 
সকলে হয়তো অসন্তোষ প্রকাশ করে না, হয়তো সুযোগ পায় না, 
হয়তো সাহস পায় না। কিন্তু তাই বলে যদি ধরে নাও যে তারা 
স্থখে আছে তবে মস্ত ভূল করবে। জলের চাপে বাধ কি একদিনে 
ভাঙে? চাপ প্রতি মুহুতে” পড়ছে, ঠিক কখন ভাঙ্গবে তা কে বলতে 
পারে। এ বিদ্রোহ সেই বাধভাঙার তাণ্ডব । এইজন্যেই বলেছিলাম 


২৭ চাপাটি ও পদ্প 


ষে কোম্পানীর মসনদ টলবে যখন ইংরেজিশিক্ষিত দেশী লোক বিদ্রোহ 
করে বসবে । কোম্পানী যদি ইংরেজি শিক্ষা না দিত এ দেশে কখনো 
বিদ্রোহ হত না! । তোমাদের প্রদত্ত শিক্ষাই বিকৃত হয়ে উঠে একদিন 
তোমাদের এ দেশ ছাড়া করবে । আজ কি সেই দিন এসেছে? 

এই বলে কিছুক্ষণ মহম্মদ আলি খা চুপ করে বসে রইলো» 
তারপরে আবার আরস্ত করলো-_ 

বাবা সব অবস্থ। শুনে চাকুরী ছেড়ে দিতে উপদেশ দিলেন । 
কোম্পানীর চাকুরীতে ইস্তফা দিয়ে চলে এলাম। আবার প্রশ্ন 
হল এখন কি করি? চলঙ্গাম লখনৌর দিকে, নবাব নসরুদ্দিনের 
সরকারে চাকুরী নেবার আশায়। লখনৌ গিয়ে শুনলাম নেপালের 
মন্ত্রী জঙ্গ বাহাছুর গোরখপুরে এসেছেন, তিনি শীঘ্রই বিলাত যাবেন, 
'ন একজন ইংরেজি-জান। সেক্রেটারী । তীর কাছে গিয়ে দরখাস্ত 
করলাম, তিনি আমার সঙ্গে কথা বলে খুশী হয়ে আমাকে সেক্রেটারী 
নিষুক্ত করলেন। চললাম ইংলগ্ডে। সেখানকার একটি ঘটনায় 
সাহেব তুমি নিশ্চয় কৌতুহল অন্থুভব করবে। এডিনবরায় জঙ্গ 
বাহাছবরকে অভ্যর্থন৷ করবার যে আয়োজন হয়েছিল তার মধ্যে ছিল 
৯৩ নম্বর হাইল্যাণ্ডের রেজিমেন্ট ! তখন কে জানতে। যে তাদেরই 
একজনের উপরে ভার পড়বে আমার জীবনের শেষ রাত্রি পাহারা 
দেবার। 

জেমি গ্রীন তার আত্মকথা বলে যাচ্ছিল আর আমি শুনতে 
পাচ্ছিলাম থানার ঘড়িতে ঢং ঢং করে প্রহর বেজে তার জীবনের শেষ 
মুহুত” কয়টি ক্রমে সংক্ষিপ্ততর হয়ে আসছে। 

তারপরে ইংলগ্ড থেকে ফিরে এসে কয়েক বছর বিভিন্ন দেশী রাজা 
আর নবাবদের সরকারে চাকুরী করলাম । শেষে দেখ। হ'ল আজিমুল্লা 
খার সঙ্গে। তার কথ! নিশ্চয় শুনেছ, এখন সে বিদ্রোহের একজন 
পাণ্ডা, নানা! সাহেবের ভানহাত। তখন মে ছিল নানা সাহেবের 
এজেণ্ট। আমি আগে ইংলগু গিয়েছি শুনে আমাকে সে সঙ্গে নিল। 
তার বিলাত যাবার উদ্দেশ্ট ছিল লর্ড ডালহৌসির যে ফর্মানবলে নানা 


চাপাটি ও পঙ্লপ ২৮ 


গদিচ্যুত হঃয়েছিল ইংলগডে গিয়ে পালমেণ্টের মেম্বরদের কাছে দরবার 
ক'রে তা নাকচ করা । সাহেব একটা বিষয় ভেবে দেখো, এ দেশের 
লোক কোম্পানীর উপরে যতই বিরক্ত হোক না কেন ইংলগ্তের শাসন- 
ব্যবস্থার উপরে খুব তাদের ভরসা । যেদিন এ ভরসা তাদের যাবে, 
তার! বুঝবে এ দেশের কোম্পানী আর ওদেশের পালবধমেনটট একই 
ব্যবস্থার ডান হাত বাঁ হাত সেদিন এ দেশ থেকে তোমাদের রুটি 
উঠল । সাহেব আজিমুল্পা খ। নিতান্ত মুন্দী লোক, শাদনতান্ত্িক 
ব্যবস্থার উপরে তার ভরসার অন্ত নেই। তার বিশ্বাস একজনে যদি 
ফরমান দিতে পারে, আর একজনে তা নাকচ করতে পারবে না 
কেন? সে বিশ্বাস যখন ভাঙ্গে তখন এই সব মুন্পী লোক ক্ষিপ্ত হ'য়ে 
ওঠে, তাদের বিদ্রোহের তুলনায় এই সব গাওয়ার সিপাহীদের 
বিদ্রোহ ছেলেখেলা । 


আচ্ছা ইংলগ্ডে গিয়ে তোমরা কি করলে ! 

সে ইতিহাস বিস্তারিত বলে লাভ নেই। মোটের উপরে পঞ্চাশ 
হাঁজার পাউণ্ড খরচ হ'ল । বৈঠকখানায় আর মজলিশে আমাদের 
আদর অভ্যর্থনার অন্ত রইলে। ন1। কিন্তু আসল কাজের বেলায় 
ঢঁঢু। আশ্চর্য জাত তোমরা সাহেব, সামাজিক আসরে তোমরা 
ভদ্রতার অবতার, আফিসের চেয়ারে একটি পাথরের মুতি। এইজন্তেই 
লোকে তোমাদের জাত হিসাবে ভণ্ড বলে। হয়তো মে অভিযোগ 
ঠিক নয়, হয়তো ওইটেই তোমাদের জাতিগত প্রকৃতি। আবার 
ফিরলাম দেশের দিকে । এধারে এলাম ইস্তাম্বুল হ'য়ে। গিয়েছিলাম 
ক্রিমিয়ায়,। তখন মেখানে রুশের সঙ্গে তোমাদের লড়াই চলছে। 
একটা যুদ্ধে ইংরেজ বাহিনীর পরাজয় দেখে ভাবলাম তবে তে৷ এরা 
অজেয় নয়। ভাবলাম রাশিয়ানদের হাতে যদি হারে ভারতীয়দের 
হাতেই বা হারবে ন। কেন? এমন সময়ে একজন রাশিয়ান এজেন্টের 
সঙ্গে আজিমুল্লা খার পরিচয় হ*ল। আমাদের মনোভাব জেনে সে 
বলল, তোমরা বিদ্রোহ কর না কেন? দেখছ তো ওদের বীরত্ব । 
তার কথা শুনে আজিমুল্লা খার মনে বিদ্রোহের পরিকল্পনা প্রথমে 


২৯ চাপাটি ও পাল্স 


এলো ! আজিমুল্লা। স্থির করলো! প্রথম স্ুযোগেই বিদ্রোহ করতে হবে 
আর কোম্পানীর বনিয়াদ উপড়ে ফেলতে হুবে। 

তারপরে জেমি গ্রীন একটুখানি নীরব থেকে বলতে লাগলো, 
এবারে যেন আমাকে নয়, নিজেকেই--সেই বিদ্রোহ ঘটেছে, আর 
এ যে কিছুক্ষণ আগে বিলাতী খবরের কাগজগুলো পড়লাম তা 
থেকেই জানতে পেরেছি কোম্পানীর বনিয়াদও আলগা হয়ে গিয়েছে, 
পালণমেন্ট এবারে নিজ হাতে শাসনভার নেবে। কোম্পানী গেল, 
ইংরেজ গেল না। হয়তো! এতে দেশের ভালই হবে । ভালই হোক 
আর মন্দই হোক, একশ বছর । কোম্পানী একশ বছর সময় পেয়ে- 
ছিল, পালণমেণ্টও একশ বছরের বেশী সময় পাবে না । 

এর পরের কথা সবাই জানে সাহেব, তুমিও জানে! । মীরাট, বেরিলি, 

কানপুরে আগুন জ্বলে উঠল । আমি ভাবলাম এ সুযোগ ছাড়া নয়। 
এমন সময়ে শুনলাম সিপাহীরা দিল্লী গিয়ে বাহাহবুর শাহকে আবার 
হিন্ুস্থানের মসনদে বসিয়েছে । স্থির করলাম দিল্লীতেই আমার স্থান, 
মেখানে নিশ্চয় এঞ্জিনীয়ারের দরকার আছে । কিন্তু সেখানে যাওয়ার 
আগে স্ত্রীপুত্রকে নিরাপদে রাখা আবশ্যক । তাদের নিয়ে গেলাম 
রোহিলাখণ্ডের স্ত্দুর এক গ্রামে । তারপরে চললাম দিল্লীর দিকে । 

একটা কথা বলবে? কানপুরের বিবিঘরের হত্যাকাণ্ড কি 
“দখেছ ? 

না, সে সময়ে আমি রোহিলাখণ্ডে গিয়েছি স্তীপুত্রদের নিয়ে । 

আচ্ছা, একথা কি সত্য যে মেয়েদের হুত্য। করবার আগে তারা' 
ধধিত হয়েছিল ? 

সাহেব এদেশের লোককে তোমর! জানো না, তার! নিষ্ঠুর হতে 
পারে, কিন্ত পাশব কখনো নয়। 

এ হত্যাকাণ্ডের আসল কারণট। কি? 

আমি যতদূর জানি নানার ইচ্ছ1 ছিল না। কিন্তু তাকে অনিবার্ধ- 
ভাবে বিদ্রোহের সঙ্গে জড়িয়ে ফেলাই এর উদ্দেশ্ট, যাতে নানা আর 
পিছিয়ে যেতে না পারে। 


চাপাটি ও পঞ্ রি 


কে এর নেতা ছিল? আজিমুল্লা খঁ। ? 

হয়তো সে ছিল। কিন্ত আসল নেড়। নানার হারেমের এক বাদী, 
জুবেদী তার নাম। 

স্ত্রীলোক? 

বিস্মিত হয়ো না সাহেব। স্্রীলোক-দানবের মতে দানৰ আর 
কোথায়? 

এসব শুনলে কার কাছে! 

তাতিয়। টোপির কাছে, বিবিঘরের কাণ্ডের পরে নানার সঙ্গ ছেড়ে 
সে চলে যায়। 

হত্যা করলে কারা? নানার সৈন্দল ? 

না, তার! স্রেফ অস্বীকার করেছিল । 

তবে? 

&ঁ দানবাটা টাকার লোভ দেখিয়ে জনকতক কশাইকে সংগ্রহ 
করেছিল । 

হত্যাকারীদের একজনের বর্ণনার সঙ্গে তোমার এ মিকির বড্ড 
বেশি মিল। জানো কিছু ? 

নিশ্চয় জানি না । তবে হ'লে আশ্চ্ হব না। 

তবে ওকে তোমার অন্ুচর করলে কেন ? 

আগে সন্দেহ হয় নি, পরে শুনেছি । 

তখন ওকে পরিত্যাগ করলে না কেন? 

তখন আর উপায় ছিল না। ছাড়। পেলেই ও গিয়ে আমাকে 
ধরিয়ে দিত। সাহেব আলকাতরায় হাত দিলে হাতে কালি লাগবেই । 
মিকির সঙ্গদোষে আমার সব শুভ স্ঙ্কল্প মলিন হয়ে গিয়েছে । হয়তো 
সেই অপরাধেই, আজ এই শেষ মুহূর্তে ধরা পড়লাম । 

যাক, এবার যা বলছিলে বলে।। 

সত্রীপুত্রকে নিরাপদে রেখে দিল্লী গিয়ে উপস্থিত হ'লাম। সেনাপতি 
বখত খা আমাকে জানতো, তার ইচ্ছাতে আমি বাদ্‌শাহী ফৌজের 
টাফ এঞ্জিনিয়ার নিযুক্ত হয়ে কাজে লেগে গেলাম । কিন্তু কাজ করবার 


৩১ চাপাটি ও পদ্ম 


কি উপায় আছে? সৈন্যদের মধ্যে কোন নিয়ম নেই, শৃঙ্খল! নেই, 
শহরে কোন ব্যবস্থা নেই । আর কে থে কর্তা, কজন যে কর্তা স্থির 
নেই। প্রত্যেক বাদশাজাদা আসে, একবার ক'রে হুকুম ক'রে যায় । 
সকলেরই মাতব্বরি করবার শখ, কিন্তু সাধ্য কারো! নেই ৷ পরাজয় 
অবশ্যন্তাবী তখনই বুঝলাম । হঃলও তাই। 

বাদশার অবস্থা কিরকম ? 

ওরকম সিংহাসনের চেয়ে জেল ভালো, তাতে জায়গা কিছু বেশি, 
হাত পা নাড়বার সুযোগ আছে। 

তার বাদশাহী করবার শক্তি কিরকম ? 

সে একবার কপালে হাত ঠেকালো, বললো, জীর্ণ নৌকোয় সমুদ্র 
পার হওয়। বদি সম্ভব হয়, তবে তার পক্ষেও হিন্দৃস্থানের বাদশাহী করা 
সম্ভব! 

তিনি কি বিদ্রোহের মূলে ছিলেন ? 

সমস্ত শাহাজানাবাঁদে তার চেয়ে নিরীহ নির্দোষ কেউ ছিল ন1। 

তার পরে? 

বৃটিশ ফৌজ দিল্লী অধিকার ক'রে নিলে বাদশাজাদা, ফেরোজ, শা, 
সেনাপতি বখত খ। আর আমি যমুনা পার হ'য়ে মথুরায় চলে এলাম । 
তখনে। আমাদের অধীনে ত্রিশ হাজার ফৌজ ছিল। 

থানার ঘড়িতে তিনটা বাজলো । মিকি এক কোণে আগের মতো 
মুখ গুঁজে বসে আছে, হয়তো বা ঘুমিয়েই পড়েছে। 

সাহেব আমার সময় ফুরিয়ে এলো, হয়তো আর ছু'এক ঘণ্টার 
মধ্যেই ডাক পড়বে। তার আগে তোমাকে ঝলে সব চুকিয়ে দিই । 
তুমি লিখবে বল্ছ, যার চোখে পড়বে সে বুঝবে মহম্মদ আলি খঁ৷ 
গোয়েন্দা ছিল না, ছিল বাদশাহী ফৌজের চীফ এঞ্জিনিয়ার। 

আমার সঙ্গীরা অন্য দিকে গেল। আমি গেলাম লখ নৌ, সেখানে 
গিয়ে নবাবী ফৌজের চীফ এঞ্জিনিয়ার নিযুক্ত হ'লাম। লখনৌতে 
ফৌজের অবস্থা ও ব্যবস্থা দিল্লীর চেয়ে ভালো, কিছু কাজ করবার 
উপায় ছিঙ্গ। সেকেন্দ্রাবাগ আর শাহনজফ-কে কেন্দ্র ক'রে ছুর্ভেছ 


চাপাটি ও পক্ম ৩২ 


প্রতিরোধ গ'ড়ে তুললাম। নভেম্বর মাসে সে বাধ। অতিক্রম করতে 
তোমাদের হিমসিম খেতে হ'য়েছিল। এ 

খুব মনে আছে । তাই বলো, সে লাইন তুমি গড়েছিলে। আমর! 
মে-সময় নিজেদের মধ্যে বলাবলি ক'রেছিলাম নিশ্চয় কোন ইউরোপীয় 
এঞ্জিনিয়ারের কাজ । কথাটায় অনেকেই বিশ্বাস করেছিল, কারণ 
একটা জনশ্রতি আছে যে, শাদা চামড়ার কোন কোন লোক নিপাহী 
দলে যোগ দিয়েছিল । 

মে কথা একেবারে মিথ্যা নয়, কিন্তু ঘটনার ওলব ডালপালার মধ্যে 
প্রবেশ করলে আসল কথা আর শেষ হ'য়ে উঠবে না। 

শুধু একটা প্রশ্ন । বৃটিশ সৈম্ বখন আক্রমণ করছিল তুমি 
কোথায় ছিলে ? 

শাহনজফের উপরে । আর তুমি ? 

শাহনজফের নীচে । 

আজ তুমি উপরে, আমি নীচে 

জেমি গ্রীন, কে উপরে কে নীচে তার চূড়ান্ত স্থির কি এখানে হয় ? 
যাক তারপরে তোমার কথ। বলে। ৷ 

বৃটিশ সৈন্য লখনৌর অবরোধ মোচন করতে পারলে। না, কেবল 
রেসিডেব্সির অধিবাসীদের নিয়ে চলে এলো । লখনৌর সকলে জয়ের 
আনন্দে মগ্ন হ'ল। আমি বললাম--আনন্দ করবার সময় আসে নি। 
বৃটিশ সৈন্য আবার আসবে । এবারে অনেক বেশী প্রস্তুত হ'য়ে, অতএব 
কালব্যাজি ন। করে শহরের অবরোধ আরও দৃঢ় ক'রে তোলো । লেগে 
গেলাম সেই কাজে । করেওছি। এবারে লখনৌ শহরে গেলে জেমি 
গ্রীনকে তোমার মনে পড়বে । এমন সময়ে খবর এল, বুটিশ সৈম্ 
শীঘ্রই কানপুর পরিত্যাগ করবে লখনৌ অভিমুখে যাত্রার উদ্দেশ্ঠে । 

এ সময়ে লখনৌ ছাড়লে কেন ? 

সেই কথাতেই আসছিলাম । শুনেছিলাম এবারে বৃটিশ সৈন্যের 
সঙ্গে অনেক শক্তিশালী কামান, অনেক আয়োজন । প্রন্তুতিট! কিরকম, 
দেখ! দরকার মনে হ'ল। 


৩৩ চাঁপাটি ও পল্প 


গুপ্তচর পাঠালে না৷ কেন? 

তারা কামানের শক্তির কি খবর রাখে? বড় জোর সংখ্যাটা গিয়ে 
আমাকে জানাতে পারবে । তাই স্থির করলাম 'আমাকেই যেতে হবে। 
গেলাম কানপুরে । ফিরিওয়াল! সাজলাম, তখনই পেলাম মিকিকে ! 
হায়, কে জানতো, তখন আমি পাপের সঙ্গ নিলাম । যাই হোক, বৃটিশ 
ভাবুতে ঘুরে ঘুরে যা! জানবার সব জানলাম । মনে হ'ল ফিরবার মুখে 
একবার উনাও শহরট। দেখে যাই । উনাও শহর ছেড়ে রওন। হবার 
মুখে একজন মুসলমান আমাকে চিনে ফেলল, বেরিলিতে থাকতে সে 
আমাকে চিনতো । তারপরে বিচার। তার পরে এখন আমি তোমার 
কাছে! এই তো। আমার ইতিহাস। এবারে বলো মহম্মদ আলি খা 


কি গুপ্তচর ? 
জেমি গ্রীন, সে প্রশ্নের উত্তর দেবার ভার আমি নেবো ন।। 


লিখবে। তোমার কথা । ভবিষ্যৎ দেবে উত্তর, হয় তো সে উত্তরে 
তোমার অসম্মান হবে না। 

এমন সময়ে থানার ঘড়িতে পাঁচটা বাজলো । ছস্টায় ফাসির সময় 
স্থির হয়েছে । কি বলবো ওকে ভাবছি এমন সময়ে জেমি গ্রীন বলে 
ড 

সাহেব সময় হ'য়ে এল, একবার শেষ নমাজ প'ড়ে নিই। 

হাত মুখ ধুয়ে সে নমাজ পড়তে লাগলো । 

সারা রাত্রি জাগরণে মিকি এতক্ষণে ঘুমিয়ে পড়েছে। 

নমাজ শেষ হ'লে জেমি তার মাথার লম্ব! চুলের মধ্যে থেকে একটি 
সোনার আংটি বের করলো, বলল, আমার সঙ্গে আর ঘ। কিছু ছিল 


বিচারের আগে সব নিয়ে নিয়েছে, এটার সন্ধান পায় নি। 
তারপর আওটিট। আমার হাতে দিয়ে বলল, সাহেব এটা তুমি 


রাখো । না, না, অস্বীকার ক'রো না, এর দাম সামান্ই। ইস্তাম্থুলের 

একজন ফকির আমাকে দিয়েছিল, বলেছিল মন্ত্রপড়া এ আওটির 

অসাধারণ ক্ষমতা, যার কাছে থাকবে তাকে সমস্ত বিপদে রক্ষা করবে। 

কত বিপদ না আমি উদ্ধার পেয়ে গিয়েছি এই আংটির জাদুতে । কিন্তু 
ঞ 


চাপাটি ও পদ্প ৩$ 


পাীর সঙ্গ নিয়েছি বলে আগুটির জাছ এবারে আর খাটলো৷ না, ধর! 
পড়ে গেলাম। কিস্তু তোমাকে রক্ষা করবে। লখনৌ সহরে গিয়ে 
এবার যখন মহম্মদ আলি খাঁর প্রস্তুত অবরোধের সম্মুখীন হবে, তখন 
মহম্মদ আলি খাঁর প্রদত্ত এই জাছু-আগঙটি তোমাকে রক্ষা করবে। 
তুমি ভাবছ সাহেব শত্রুকে কেন দিলাম? কে শত্রু, কে মিত্র তা 
নিশ্চিতভাবে জানবে কি উপায়ে? আজ পৃথিবী থেকে বিদায় নেবার 
সময়ে তোমার কাছে যে সদয় ব্যবহার পেলাম, এ কি শক্রর কাছে 
প্রত্যাশিত? আমার মন সিগ্ধ হ'য়ে গিয়েছে । আজ আমার আর কি 
আছে? ওটা রাখে। । মাঝে মাঝে চোখে পড়লে হতভাগ্য জেমি 
গ্রীনকে মনে পড়বে । আমার মনে আর কোন ঠূঃখ নেই, কোম্পানীর 
রাজত্বের উৎখাত চেয়েছিলাম, তা হয়েছে বলে জানতে পেরেছি। 
কেবল-- 

এতক্ষণে সে যেন ভেঙে পড়ল, বলল-__ 

কেবল স্ত্রী আর ছেলে ছুটির কথা মনে পড়ছে । জানি তারা 
নিরন্তর আমার জন্য খোদার কাছে প্রার্থনা করছে। আজ সকালে উঠে 
তাঁরা যখন আমার নিরাপত্তার জন্ত প্রার্থনা করবে, তখন আমার মৃত- 
দেহ ফাসিগাছে লম্বমান। তারা জানতেও পাবে না । কতদিন পরে 
খবর পাবে কে জানে? আল্লা হাকিম, তোমার মঞ্তির আমরা কি 
বুঝি ! 

অগত্যা আঙটিটা নিয়ে পকেটে রাখলাম । 

কিছুক্ষণ পরে কয়েকজন সৈম্ভ এসে ওদের দুজনকে নিয়ে চলে 
গেল। 

পরদিন উনাণড পরিত্যাগ করবার সময়ে থানার কাছে একটা গাছে 
ওদের দেহ লগ্বিত দেখতে পেলাম । জেমি গ্রীনের শেষ উক্তি মনে 
পড়লো, এতক্ষণে ওর স্ত্রী পুত্র নিশ্চয় ওর নিরাপত্তার জন্য খোদার 
কাছে প্রার্থনা করছে। মনে পড়লো» আল্ল। হাকিম, তোমার মঞ্জির 
আমরা কি বুঝি! 


6 


তারপরে ঘটনার চাপে জেমি গ্রীনের কথা ভুলেই গিয়েছিলাম, মনে 
পড়লো ১১ই মার্চ “বেগমকুঠি আক্রমণের সময়ে। আমাদের ৯৩ নম্কর 
রেজিমেট্টের হুকুম হল “বেগমকুঠি, আক্রমণ করবার। বেগমকুঠি 
প্রকাণ্ড একট! অট্রালিকা, প্রতিরোধ লাইনের কেন্ত্র। তার প্রতোক 
জানলা, দরজা। কার্ণিশ সশস্ক্ব সিপাহীতে পূর্ণ, ভিতরে কত সৈশ্ত আছে 
কেজানে। 
আমরা বেগমকুঠির সম্মুখে এসে দেখি কুড়ি ফিট গভীর এক পরিখা । 
সেটা অতিক্রম করতেই আমাদের অনেক সৈন্য মারা পড়লো । কিন্ত 
বেগমকুিতে আর প্রবেশ করা যায় না। তখন স্থির হল যে, কামান 
দিয়ে দেয়ালের কতকটা উড়িয়ে দিয়ে তার মধ্য দিয়ে প্রবেশ করতে 
হবে। কামান দিয়ে দেয়ালের কতকটা মহজেই উড়িয়ে দেওয়া গেল, 
তিন চারজন মানুষ ঢুকতে পারে এমন ফুকর হয়েছে । কনেপ্প আদেশ 
করলেন, চারজন সৈম্ চারটা বারুদের থলি নিয়ে এ ফুটো দিয়ে বেগম- 
কুঠির মধ্যে লাফিয়ে পড়বে, আর তারপর বারুদে আগুন ধরিয়ে দেবে। 
এ নিশ্চিত মৃত্যুর আদেশ, কিন্তু যুদ্ধ তো৷ আদর আপ্যায়ন মাত্র নয়, 
এমন আদেশ প্রয়োজন হলে দিতে হয়। চারজন বারুদের থলি পিঠে 
বেঁধে, ইসারায় সকলের কাছে ব্দায় নিয়ে এ ফুটোর দিকে যাত্রা 
করলো। এ চারজনের মধ্যে আমি একজন। আমাদের লক্ষ্য করে 
বেগমকুঠি থেকে গুলী চলছে ! তবু অনাহত ফুটোর কাছে এসে 
পৌছলাম। এবারে লাফ দিয়ে নিশ্চিত মৃত্যুর গহ্বরে প্রবেশ করাত 
হবে। জেমি গ্রীনের সেই আংটিটা আউ,লে ছিল, একবার সেটার দিকে 
তাকালাম। আর তখনই মনে পড়লো হাইল্যাণ্ডের একট! পার্বত্য 
গ্রামে আমারও স্ত্রী এবং ছুটি পুত্র আমার নিরাপত্তার জন্ত নিরম্তর 
প্রার্থনা করছে। কিন্তু আর এক মুহূর্ত পরেই."“তারা জানতেও পাব 


$ 


চাপাটি ও পল্প ৩৬ 


না''*কতদিন পরে জানতে পারবে কে জানে...এমন সময়ে গ্রুপ 
ক্যাপ্টেন হুকুম করলো, জাম্প । 

আর একবার জেমি গ্রীনের আওটিটার দিকে তাকিয়ে নিয়ে 70৬5 
01 8০৪০)-এর মধ্যে লাফ মারলাম । 

আমি কি করে বাঁচলাম জানি নে, আমার তিনজন সঙ্গীই মারা 
পড়লো । 

লখনৌ সহর অনেককাল অধিকৃত হয়েছে, বিদ্রোহ অনেককাল 
প্রশমিত হয়েছে, আমি সৈন্তবাহিনী অনেককাল পরিত্যাগ করেছি, 
এখন আমি বৃদ্ধ, হাইল্যাণ্ডের নিজ গ্রামে বান করছি। জেমি গ্রীনের 
আঙটি এখনো! আমার অনামিকায় রয়েছে। মৃত্যুকালে এ আঙটি 
আমার পুত্রকে দিয়ে যাবোঃ আর তাকে বলে যাঁবো সে-ও যেন এ- 
আঁটি শেষ সময়ে তার পুত্রকে দিয়ে যায়। 

জেমি গ্রীন গোয়েন্দ। ছিল কিন? সে উত্তর ইতিহাস দিক, তবে 
আমার সিদ্ধান্ত আমি স্থির করে নিয়েছি । নতুবা! মৃত্যুকালে তার 
আওটি পুত্রকে দিয়ে যাবার সন্কল্প করতাম না । * 


&020500350275555 0 056 3268৫ ৩05 1857-59 5 ঘ০2৮০5- 
2116০0611, 


কোকিল 


অদূরে শক্রসৈন্তের সন্ধান মিলিয়াছে, তাহারা আক্রমণ করিবার 
আগেই তাহাদিগকে আক্রমণ করিতে হইবে । কামানবাহী গাড়ীগুলি 
যথাস্থানে সজ্জিত হইতে লাগিল, তাহাদের চাকার ক্যাচক্্যোচ শব্দ 
উঠিতেছে, ফৌজের ভারী বুট জুতার মস্‌ মস্‌ শব, বন্দুকে বারুদ 
ঠাসিবার খটুখটু আওয়াজ, অশ্ববাহিনীর দ্রুত কঠোর ক্ষুরের ধ্বনি, সৈম্- 
নায়কগণের আদেশের সংক্ষিপ্ত চকিত রব, বিচিত্র শব্দের একট চাঁপা 
তুফান। প্রস্ততি সমাণ্ড হইবামাত্র কয়েক মূহুর্ত পরে সম্ভাবিত রণক্ষেত্র 
নিস্তব্ধ ভাব ধরিল, হাজার ছুই লোক অথচ একটিও শব্ধ নাই। ঝটিকা- 
পূর্ব নিস্তব্ধতার মতো যুদ্ধ-পু নিস্তরূতা, উৎকণ্ঠায় পূর্ণ প্রগাঢ 
প্রশান্তি । 

এমন সময় অদূরে আত্রকুঙী হইতে কোকিলের ডাক শ্রুত হইল-_ 
কু-্উ, কু-উ! এ ধ্বনি যেন রশি ফেলিয়া নিস্তব্ততার তলা সন্ধান 
করিতেছে__কু-উ, কু-উ ! 

1385, 71070 182 0009510৮ ০0* 06 11065 ০, 00৪0? 
81656, 10 16 529 1806 ৪0821701960 010. ০0৫০]00 !+ 

+16 19, 105 ৬0105501015 “চ/2002116 ০1০০*-0১৪ 
০017010210101) 01 006 5011175-0006 01 001 501010, 

তখন স্থানকাল ভুলিয়া কথক ছুইজন তন্ময় ভাবে বাল্যকলে 
শোনা সেই কুহুধ্বনি আর একবার শুনিতে লাগিল, তাহাদের মনে 
পড়িয়া গেল সুদূর মাতৃভূমির 'পল্পবঘন' পল্লীপথ, “পাঠশাল। পলায়ন, 
চিত্রপক্ষ পতঙ্গ ধরিবার জন্য ইতস্ততঃ ছুটোছুটি, আর তারি মাঝে বালক- 
চিত্তকে উচ্চকিত করা অশরীরী কণম্বর_কু-উ, কু-উ। আজ আবার 
এতকাল পরে অতিদূর বিদেশে, রণক্ষেত্রের অদূরে, যুদ্ধারস্তের ঠিক পুর্ব 
মুহুর্তে সেই পুরাতন কণ্ঠ, তেমনি অশরীরী, তেমনি অপূর্ব !-কু-উ 
কু-্উ ! 


চাঁপাটি ও পদ্ম ৩৮ 


“এ 52, 1616৮251706 58. 0:2101760. 010 ০০0০1:০০ 1, 

15, 1015 ৬৬010570105 “ভি 806511715 ৬০102 !+ 

অনেকে ভাবিতে পারেন যুদ্ধক্ষেত্র ও যুদ্ধ-পূর্ব মুহূর্ত এমন কবিত্বের 
স্বর্ণ সম্ভাবনাপূর্ণ নয়। কথাটি স্বীকার করিতে পারিলাম না। যুদ্ধ- 
পূর্ব মুহুর্তে মান্তুষের যাবতীয় চিত্তবৃত্তি ও ইন্দ্রিয় এমন প্রথর ও স্পর্শ- 
কাতর হইয়া ওঠে যে, পূর্বে অদৃষ্ট জগতের অনেক সৌন্দর্য্য, পূর্বে 
আবোধ্য জীবনের অনেক সত্য সহজগ্রাহা হইয়া পড়ে, মনে রাখিতে 
হইবে যে, গীতার স্তায় হরূহ তত্ব বুঝাইবার জন্য শ্রীকষ্ষ এমনি একটি 
যুদ্ধ-পূর্ব মূহূর্ত বাছিয়া লইয়াছিলেন। তা! ছাড়া এ ক্ষেত্রে আরও কিছু 
কারণ ছিল। কথক ছুইজন প্যাপিসার ও বিউস আহত সৈনিক, যুদ্ধে 
ষোগ দিবার ভুকুম তাহাদের ছিল না, সৈন্যদলের পিছনে আহতদের জন্য 
নিদিষ্ট স্থানে তাহারা অবস্থান করিতেছিল, কাজেই কোকিলের কুহু 
শুনিয়া কিছু কবিত্ব করিলেও তাহারা করিতে পারে। 

প্যালিসার ও বিউস অর্ধশায়িত ভাবে কোকিলের ডাক শুনিতেছে 
এমন সময়ে অশ্বপদ-শব্দে তাহারা চমকিয়া উঠিল, দেখিল একজন 
অশ্বারোহী আসিতেছে । 

হ্যালো জন, সংবাদ কি? 

করন ঘোড়া হইতে নামিতে নামিতে বলিল, “সপাহীর! পিছু হটে 
গিয়েছে । জেনারেল হ্যাভেলক বললেন, ওদের আক্রমণ করে বৃথা 
সময় নষ্ট না করে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব কানপুরে পৌছাবার চেষ্টা করা 
দরকার । 

উত্তম অভিপ্রায় ।, 

“আশা করি কানপুরে ইংরেজ মহিলা ও শিশুরা এখনো নিরাপদে 


আছে ।+ 
“জেনারেল তো সেই রকম অনুমান করেন।: 


থ্যাঙ্ক, গড'-_বিউস বলে। 
তাহার স্ত্রী কয়েক দিনের জন্য আগ্র! হইতে কানপুরে বেড়াইতে 
আসিয়াছিল। সে আবার শুধাইল, "আর আগ্রার খবর কি ?' 


৩৯ চাপাটি ও পদ্প 


'আগ্রীর হুর্গ এখনো আমাদের হাতে। আগ্রার ইংরেজ সমাজ 
সেখানে আশ্রয় নিয়েছে আর সম্পূর্ণ নিরাপদে আছে বলে নিশ্চিত খবর 
পাওয়। গিয়েছে । 

'থ্যাঙ্ক গড" বলিয়! নিশ্চিন্ত বিউস ঘাঁসের উপরে দেহ এলাইয়া 
দিল। 

এমন সময়ে লেঃ জনের খানসাম। চা লইয়া! আসিল। চা-পাঁন শেষ 
করিয়া জন জেনারেল হ্যাভেলকের উদ্দেশে প্রস্থান করিল। বিউস 
ও প্যালিসার উদ্দিগ্ন মনে সেখানে আমবনের ছায়ায় শুইয়া রহিল, 
তখনে। কোকিলট। ডাকিয় চলিয়াছে__-কু-উ, কু-উ, কু-উ, কু-উ ! 

বিউস-_“কোঁকিলের ডাক শুনলেই আমার একটা 1215 
ঘটনার স্মৃতি মনে প'ড়ে যায় |, 

“খুবই স্বাভাবিক, কেননা আগাদের অনেকেরই বালা-জীবনের সঙ্গে 
কোকিলের স্মৃতি জড়িত 1 

“এ ঠিক আমার বাল্যকালের স্্ৃতি নয়, প্রথম যৌবনের-_+ 

'বাইজোভ ! বিউস, তুমি কি শেষে কোকিলের ডাক শুনে পদ্- 
টগ্ লিখে ফেলেছিলে নাকি ? 

অভিযোগের গুরুত্বে বিউস শিহুরিয়া উঠিল-_খ্যাঙ্ক গুডনেস ? 
প্যালিসার, তুমি বলতে চাও মানুষ খুন করেছি ?' 


“সেটা আর এমন গুরুতর কিঃ সেই উদ্দেশ্যেই তো আমরা এদেশে 
এসেছি । কিন্তু পগ্চ-লেখা যে আর এক ব্যাপার, ওকাজ যারা পারে 
তাদের অসাধ্য কিছু নেই ।' 

তুমি নিশ্চিন্ত হও, বন্ধু, আমি চুরি, প্রবর্চনা বা পদ্য লেখার 
অপরাধে অপরাধী নই ।" 

'মৃত্যিই নিরুদ্বিগ্ন হলাম, এখন বলো! ব্যাপারট1 কি? 

পু) এই জন্য যে কোকিলের ডাকের সঙ্গে একটা ছবি আকার 
স্মৃতি জড়িত ।' 

“টাও অপরাধ তবে পছ্যের মতো একেবারে দগুযোগ্য অপরাধ 


চাঁপাটি ও পষ্স ৪০ 


নয়। দেখো বিল, আমি আর্ট, টেম্পারেন্স ও প্যাসিফিজম এসব 
জিনিষকে সত্যই ভয় করি।; 

“আমি এ সঙ্গে আর একট। জিনিষ যোগ ক'রে দিতে চাই, গল্প- 
আোতে বাধ! দান ।' 

প্যালিসার হে। হো করিয়া হাসিয়া উঠিল,বলিল--গুড হিট্‌, 
এবারে বলো-- 

__“সেবারে বসস্তকালে আমি লেক ডিছ্রীকূটে বেড়াতে গিয়েছিলাম, 
একেবারে খাস ওয়ার্ডম্বার্থের দেশে । একদিন সকালবেলা বেড়াতে 
বেরিয়েছি, শুনলাম কোকিল ডাকছে । কোকিলের ডাক বাল্যকালে 
আমার কাছে যেমন রহস্তময় ছিল এখনো তেমনি আছে, 220) 
তখনে। তেমনি ছিল বল! উচিত। কেন এমন হয় জানো, পাখীটার 
ডাক যত বেশি শোনা যায় তত বেশি পাহীটাকে দেখ। যায় না| 
সত্য কথা বলতে কি কোকিল পাখী ক্ৃচিং দেখেছি । যাই হোক, 
ডাক শুনে ভাবলাম আজ পাখীটাকে দেখতে হবে, হাতে অথপ্ড অবসর । 
এ গাছ ও গাছ তাকাতে তাকাতে চলেছি। একটা গাছের কাছে 
এসে মনে হ'ল পাথীটা ওরই কোন পাতার আড়ালে লুকিয়ে ভাকছে। 
আমি চলেছি পাতার অন্ধিসন্ধির দিকে চোখ রেখে এমন সময়ে একে” 
বারে হুড়মুড় ক'রে গিয়ে পড়লাম” 

“কি খানায় পড়লে নাকি ? 

“তা-ও বোধ করি ভালো ছিল, পড়লাম এক আর্টিষ্টের ঘাড়ে!” 

'আর্টিষ্টের? 1] 200 095196073০5 | বিস্ফোরণ ঘটল না? 

“ঘটলো বই কি, নইলে আর মাঠ) কেন ?? 

“সেখানে গুলোর আড়ালে নিরিবিলি বসে এক শিল্পী আকছিল ছবি 
এ কোকিলটারই। শিল্পী খাড়া হয়ে দাড়িয়ে বলে উঠল, দিলে তো! 
আমার পাখীট1 উড়িয়ে, অভদ্র কোথাকার ! 

£অভদ্র বল্ল? আর তুমি ঘুঁষি মারলে না? 

তুমি হ'লেও মারতে না । 

'মারতাম না ! একে শিল্পী তায় গালাগালি দিল।' 


৪১ চাপাটি ও পদ্ম 


“আরে শিল্পী যে স্ত্রীলোক ।, 

“একে শিল্পী তাতে আবার স্ত্রীলোক, এ যে অগ্ট্রলিয়ার বুশম্যানদের 
বিষ-মাখানে। শরের ফলা । যাক্‌, তোমার কি রকম লাগলো ?' 

“সত্যি কথা বলতে কি আমার খারাপ লাগলো না, বরঞ্চ বড 
মনোরম লাগলো) 

“তখন কি করলে ? 


হাজার বার মাপ চাইলাম। মহিলাটি বল্ল, কিন্তু তোমার 
মনোভাব তো। কোকিলে বুঝতে পারবে না। আমার ছবিটা যে শেষ 
হলো না। দেখো দেখি লেজের কাছে খানিকটা! আক হয় নি। 
বল্লাম, মনে করো না কেন, পাখীটার লেজ ছিল না। আঁমার কথা 
শুনে মেয়েটি হেসে উঠল । সেকিহাসি। হঠাৎ যেন বাতাসে এক" 
রাশ জুই ফুল ঝরে পড়লো |, 
বলো কি! মেয়েটি তবে সুন্দরী !' 
“সুন্দরী বলে সুন্দরী । আবার বুড়ো ওয়ার্ডম্বার্থের সাহায্য নিতে 
হ'ল-- 
91)0 25 8. 79109170010) 0: 06115170, 
৬৬1)21) 11756 5122 51921020 11901) 1005 5151), 


প্যালিসার বাকি পদটুকু পুরণ করিল, বলিল-- 
14৯ 10ড৬01% 213921:101012, 5210 
20102 8, 17001071005 01102170610 !' 


“ওখানে একটু ভূল হ'ল, সে আর 10001061005 011)875077% নয় !? 

“কেমন ? 

“মহিলাটির বর্তমান নাম 7115 [২032 85৬5 1 

বিস্মিত প্যালিসার উল্লাসে চীৎকার করিয়া উঠিল--*£০ 180] 
9081 71১0 01000810625 102001 + 

তারপর ঠা করিয়। বলিল--“দেখলে তে। শিল্পীরা মারাত্মক লোক 
কিনা! পাথী উড়িয়ে দেবার অপরাধে এখন আস্ত শিল্পীটাকে ঘাড়ে 


চাপাটি ও পদ্প ৪২ 


কারে নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছ তো! তারপরে একটু থামিয়া বলিঙলগ-- 
শিল্পীর স্বামী হিসাবে তুমিও কম মারাত্মক নও)” 

'এবারে ঝুবলে কোকিলের স্মতি কেন আমার কাছে আঃ! 

বিউস ও প্যালিসার কেহই রীতিমতো সৈনিক নয়। বিউস 
এঞ্জিনিয়ার। বিবাহের পরে সন্ত্রীক সে এদেশে আসিয়াছিল নির্মীয়মান 
ইষ্ট ইপ্ডিয়া রেলপথের দপ্তরে এঞ্জিনিয়ারের চাকুরি লইয়। ৷ আশ্রা। সহরে 
সে বাসের জন্য একটি সরকারী বাংলে। পাইয়াছিল। দীর্ঘকাল নিজে 
আগ্রায় থাকিতে পারিত না। এলাহাবাদ ও কানপুরের মধ্য তখন 
রেল শড়ক তৈয়ারী হইতেছিল। তদারকের জন্য সে এলাহাবাদে 
চলিয়া গিয়াছিল। তাঁদের ফিরিতে বিলম্ব হইবে জানিয়া মিসেস বিউস 
কানপুরে এক বান্ধবীর কাছে বেড়াইতে গিয়াছিল। ইতিমধ্যে সিপাহি 
বিদ্রোহ ঘটিয়া আগ্রা, কানপুর, এলাহাবাদ পরম্পর বিচ্ছিন্ন হুইয়া 
পড়ে। জেনারেল হ্যাভেলকের সৈম্থদল এলাহাবাদে আসিয়া পৌছিলে 
বিউস সৈশ্দলে এঞ্জিনিয়ার রূপে ভন্তি হয়। এলাহাবাদ ও কানপুরের 
মধ্যে ছোটখাঁটেো৷ এক সংঘর্ষে সে কিঞ্চিৎ আহত হয়, কিন্তু এলাহাবাদে 
ফিরিয়া ন! গিয়া সৈন্তদলের সঙ্গেই থাকিয়া যায়, কানপুরে পৌছানো 
তাহার বড় দরকার। 

প্যালিসার এলাহাবাদ স্হরের সিভিল সাভিস দপ্তরভুক্ত চাকুরে। 
সে-ও এ একই সংঘর্ষে আহত হইয়াছিল। বিউস ও প্যালিসারের 
পরিচয় অল্প দিনের, সৈশ্তদলে পরিচয় পাকিয়া উঠিতে বেশি সময় নেয় 
না। কানপুর সহর সিপাহিদের হস্তগত হইলেও ইংরেজ নরনারীগণ 
তখনো নিরাপদে আছে এইটুকু সংবাদ মাত্র তাহারা পাইয়াছে। 
জেনারেল হ্যাভেলকও তার বেশি সংবাদ জানে না৷ বিউস অশক্ত না 
হইয়া! পড়িলে বোধ করি একাকী সৈম্তদলে আগেই কানপুরে পৌছিবার 
চেষ্টা করিত। কিন্তু সে উপায় না থাকায় সে আহতদের সঙ্গে চলিয়াছে 
এবং সৈম্তদলের পিছনে একটি আমকুঞ্জে বিশ্রাম করিতেছে । 

তখন গ্রীক্মকালের মধ্যাহ্ন। যুক্তপ্রদেশের রৌদ্রমাজিত শস্তবঞ্জিত 
অসীম প্রাস্তরের আসর ম্রীচিকার দিগন্ত পর্যান্ত প্রসারিত। ইতস্ততঃ 


৪৩ চাপাটি ও পদ্সপ 


আম্রবনের ছায়ার মরপ্ভান। ..ছায়াটি যেমন লিগ্ধ এবং গম্ভীর, রৌদ্র 
তেমনি প্রথর এবং অবারিত; আর দিগদিণন্তব্যাপী প্রশান্তি এমন অটল 
ষে এ কুহুম্বরের নিরস্তর গুণ টাঁনাতেও তাহ! যেন একপা1-ও নড়িতেছে 
না। এমন অথগু শান্তিময় পরিবেশের কোথাও যে ছুইদল মানুষে 
সংঘর্ষ চলিতেছে ভাবিতেও কেমন বিস্ময় বোধ হয়, মনে হয় সেটা যেন 
পৃথিবীর দিবানিজ্রার দুঃস্বপ্ন । 

তখন অপরাহু, রোদ পড়িয়া আনিয়! বাতাসের তাপ কমিয়াছে। 
বিউল ও প্যালিসার শষ্যাত্যাগ করিয়া আতম্্বনের প্রান্তে আসিয় 
ঈাড়াইল। 

বিউস বলিল-_“হিন্দুস্থানের কোকিলের ধৈর্ধ্য অসীম 

প্যালিসার বলিল, “হি! হিন্ৃস্থানের দিপাহির মতোই-_ 

এখনো ডাকিতেছে । 

এখনো লড়িতেছে । 

ওর কুহুস্বরে জীবনের কত বড় ট্রাজিডি প্রচ্ছন্ন হইয়া আছে। 

ওর গুনতে ষে ট্রাজিডির স্ষ্টি। 

প্যালিসার বিস্ময়ে বলিয়া উঠিল, 'কি আশ্চর্য্য, এখানে একখানা 
বই এ কি করে! 

এক গাদা ভাঙা বোতল গেলা দড়িদড়া হাড়িকুড়ির মধো মরকো 
চামড়ায় বাঁধানো একখান। বই। 

প্যালিসার বইখান। কুড়ীইয়া লইতেছে সেই অবকাশে বিউস 
বলিল-- “লুটের মাল বোধ হচ্ছে, ছু' একদিন আগে সিপাহিরা এখানে 
স্মাশ্য় নিয়ে থাকবে।' 

বই নয়, একটি স্তুদৃশ্য লেদার কেস্‌। 

প্যালিসার লেদার কেস্টি খুলিয়া বলিয়া উঠিল-_-“ ৯ 012176020 
0: 0০11576 !? 

কোথায় ষেকি পাওয়া যায়! এ প্রায় তোমার কোকিলসন্ধানে 
গিয়ে শিল্পীর সাক্ষাৎ লাভের মতো!” 

কাছে আপ্তে আসিতে বিউস বলিল--“এমন কি রত্বু পেলে । 


চাপাটি ও পঞ্স ৪৪ 


'একখানি ছবি--তরুণীর এবং সুন্দরীর |' 
ল্যাকিম্যান! দেখি, দেখি'--এই বলিয়া লেদার কেস্টি হাতে 
লইয়াই বিউস চমকিয়! উঠিল, বলিল--'মিসেস বিট 
“মিসেস বিউস !, 
'আমার স্ত্রী! 
প্যালিসার বলিল--'এখানে এলো কি কারে? 
বিউস কেসটির খোল খাপ হাতড়াইয়। দেখিল আর কিছু নাই। না 
একটা টুকিটাকি, না একছত্র লেখা । 
'তোমার স্ত্রীর লেদার কেস ? 
“সে বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই, আমি চিনি ।' 
প্যালিসার বলিল--'তবে কি লুটের মাল? 
বিউম বলিল--'খুনের মাল নয় তার নিশ্চয়তা কি ?' 
“না, না, তা হ'তেই পারে না। কানপুর সহরের ইংরেজ নরনারী 
এখনও নিরাপদে আছে । 
প্যালিসারের কথা বিউসের কানে গেল কিনা জানি না, ছবিখানার 
দিকে তাকাইয়। মূঢ়ের মতো! মে দীড়াইয়া রহিল। 
তখনো কোকিলটা ডাকিয়া চলিয়াছে, কু-উ, কু-উ, কু-উ; কু-উ। 


ছিন্ন দলিল 


জেনারেল হাভেলকের সৈন্যদল কানপুর পুনরধিকার করিয়াছে। 
কানপুরের ভূতপৃর্ব ম্যাজিষ্রেট মিঃ শেরার আবার কানপুরের ভার 
লইয়াছে। সে কয়েকজন গোরা সৈন্ত সঙ্গে লইয়া কানপুর শহর 
পরিদর্শন করিতেছে । লে যখন চকে পৌছিল, দেখিল যে, কোথ। 
হইতে এক ঢুলি আবিভূত হইয়া সশব্দে ঢোল বাজাইয়া দিয় হবাকিল-_ 
খাল্ক-ই-খুদা 
মূল্ক-ই-কোম্পানী বহার 
হুকৃম্ই-সাহেবান আলিশান 
অর্থাং কিনা কোম্পানীর রাজত্ব আবার প্রতিঠিত হইল, এখন 
হইতে বড় সাহেবের হুকুম মানিতে হইবে। 
ঢুলীর অযাচিত সহযোগিত। দেখিয়া মিঃ শেরার ভাবিল যে, 
লোঁকটা হয়তো। ঠিক এমনিভাবেই নানার রাজত্ব-প্রতিষ্ঠী ঘোষণ! 
করিয়াছিল। তাহার মনে হইল, জল্লাদের মত নকিবও নিরপেক্ষ, 
ষে-পাক্ষের জয় নিব্বিকার চিত্তে তাহার আদেশ পালন করিয়! থাকে। 
মিঃ শেরার কোটওয়ালীর কাছে গিয়া ঘোড়া হইতে নামিল। 
কোটওয়ালীর উত্তরদিকে একটি বড় বাড়ী, লোক আছে মনে হয় না, 
বাড়ীটি সরকারী কাজের জন্য অধিকার করা যায় কিন! দেখিবার জন্য 
উহার সম্মুখে গিয়াছে অমনি এক কাণ্ড ঘটিল। মুহূর্ত মধ্যে বাড়ীর 
ভিতর হইতে পাঁচ, সাত, দশজন লোক ছুটিয়। আসিয়৷ তাহার পায়ের 
কাছে হুমড়ি খাইয়। পড়িয়া গেল-- 
ইওর অনার সেভ আস্‌_ 
হামলোগ লয়াল হায়-- 
শালা লোগ হামলৌগকে। একদম মার ডালা _ 
ওয়ান মান্থ ইন্‌ দিস হাউস-- 
নো ফুড, নে! ্লিপ - 


চাপাটি ও পদ্প ৫৬ 


প্রেয়িং ফর ইয়োর রিটার্ণ__ 

এগু দেয়ার ডিফিট-_ 

সেভ আস্‌্-_ 

ভেরি লয়াল - 

লোকগুলির ভাব, ভাষা, চেহারা ও অবস্থা দর্শনে শেরার হাসিবে 
কি কাদিবে ভাবিয়! পাইল না, অবশেষে মনে মনে হাসিয়া মুখে গম্ভীর 
ভাব আনিয়া শুধাইল, তোমর। কে? 

উই বেঙ্গলিস্- 

ভেরি লয়াল্‌-- 

কোম্পানীক নোকর-- 

আবার এক সঙ্গে হুঃখের কোরাল আরস্ত হয় দেখিয়া দলের একজন 
প্রবীণকে বাছিয়! লইয়া সে শুধায়, তুম কোন্‌ হ্যায়? 

লোকটি বলে, ইওর অনার হাম বদ্ভিনাথ মুখাজ্জি কোম্পানীক। 
নোকর ফর থি, জেনারেশন্স। মাই গ্র্যাণ্ফাদার কোম্পানীকা 
নোকর। 

শেরার বিরক্ত হইয়। ওঠে, বলে, হ্যাং ইওর গ্রাযাগ্ডফাদার । 

মুখুজ্জে বলে, হি ইজ'লং ডেড, স্যার। 

দেন হ্যাং ইওর ফাদার । 

হি অল্সো ডেড স্যার । 

দেন গো হ্যাং ইওরসেলফ,। 

কোম্পানীর বিচারবিভ্রাটে সন্তস্ত যুখুজ্জে সাহেবের পায়ের বুট 
'জুতার উপরে পড়িয়। বলে, হামতো ইওর বুটশিপক। লয়াল সার্ভেন্ট 


হায়। 
দেন টেল মি হোয়াট ইউ আর এণ্ড হোয়াট ইউ ওয়ান্ট। 


কথঞ্চিং আশ্বস্ত হইয়? যুখুজ্জে নিজেদের অবস্থা ও প্রার্থন! বিবৃত 
করে, তাহার সঙ্গীর নীরব সমর্থনে মুখুজ্জের বাগ্মিত। ও সাহেবের 


সুখভাব লক্ষ্য করিতে থাকে । 
বছ্িনাথ মুখুজ্জে যাহা! বলিল, তাহা হইতে ন্বেদকম্পপুলক অশ্রু 


৪৭ চাপাটি ও পদ 


ও মুচ্ছ1 বাদ দিলে এবং হিন্দী, উ্দুঃ বাংল! ও ইংরাজীর বিচিত্র মিশ্রণ 
ছাঁকিয়। লইলে এইরূপ ্াড়ায়। 

এই কয়জন রাজভস্ত বঙ্গসস্তান বহুদিনের প্রবাসী । সকলেই 
কোম্পানীর চাকুরে । সিপাহী বিদ্রোহ ঘটিবার আগে তাহার! আগ্রা, 
মীরাট, সীতাপুর প্রভৃতি স্থানে চাকুরী করিত। খোদ বদ্িনাথ 
কানপুরের কাছে সরকারের তহশীলদারী করিত। এমন সময়ে শ্যালক 
সিপাহীলোকের। ক্ষেপিয়৷ ওঠে । এই সব বাঙ্গালী রাজভক্ত কাজেই 
অনেক নিগ্রহ সহিতে বাধ্য হয় এবং ছুঃখকষ্ট অতিক্রম করিয়। কানপুর 
শহরে আসিয়! আশ্রয় লয়। সিপাহীগণ তাহাদের মারিয়াই ফেলিত, 
কিন্তু নিতান্তই হোলি থেড ও হৌলি টাফট, অব. হেয়ারের বলে প্রাণে 


বাঁচিয়া গিয়াছে । তাহার। গ্রাণে বাচিয়াছে সত্য, কিন্ত নিপাহী পক্ষে 
সক্রিয়ভাবে যোগদান ন। করিবার অপরাধে তাহারা খাছ পায় নাই। 


সিপাহী শাসনে অনুমতি ছাড়। খাগ্ঠসংগ্রহের উপায় ন। থাকায় এই 
কটি রাজভক্ত বঙ্গসন্তানকে লংড্রন ফাষ্টিং বা একটানা একাদশী 
করিতে হইয়াছে । তাহাও না হয় সহ হয়, কারণ প্রয়োজন হইলে 
ব্রাহ্মণের যেমন খাইতেও পারে, তেমনি উপবাস করিতেও অভ্যস্ত । 
কিন্ত সবচেয়ে হুঃখের কথ। ইহাদের য। কিছু সঞ্চিত ছিল, যুদ্ধের ঝণ 
বলিয়া নিপাহীরা ছিনাইয়া। লইয়া গিয়াছে । তাহারা কোনমতে 
এখানে আত্মগোপন করিয়া কোম্পানী বাহাছুরের পুনরাগমনের জন্য 
অপেক্ষ। করিতেছিল। কোম্পানী বাহাছুরের শুভাগমন হইয়াছে, এখন 
তাহাদের উপরে যাহাতে জুলুম না হয় ইওর অনারকে' দয় করিয়। 
তাহারই ব্যবস্থা করিতে হইবে। 

বস্ভিনাথ থামিলে অন্তান্ত রাজভক্ত বঙ্গসম্তানগণ সমস্বরে বলিল-_ 
হি ইজ ট্রথফুল স্তার--অর্থাৎ তাহার সব কথ। বর্ণে বর্ণে সত্য । 

শেরার বুঝিল খুব সম্ভব ইহাদের বিবরণ সত্য । প্রথম প্রমাণ 
ইহাদের ভাবগতিক ও অবস্থা । দ্বিতীয় প্রমাণ, কলিকাতা হইতে 
আগত ইংরাজ সৈনিকদের কাছে সে শুনিয়াছিল যে, তথাকার শিক্ষিত 
'বাঙ্গালীগণ সিপাহীদের আচরণ সমর্থন করে না» তাহাদের অনেকে নাকি 


চাঁপাটি ও পদ্প ৪৮ 


মিপাহীদের কাজের নিন্দা করিয়া বুতর গগ্ভ পদ্য রচনা লিখিয়' 
ফেলিয়াছে। শেরার ভাবিল মাতৃভূমি হইতে ছিন্ন হইলেও ইহারা 
সেই বৃক্ষেরই তো! শাখা, কাজেই লয়াল হওয়াই স্বাভাবিক । তবু 
একবার দস্তরের খাতিরে বলিল, তোমরা যে রাজভক্ত তাহার আর 
কি প্রমাণ আছে? 


আর কি প্রমাণ হইতে পারে? ঘোষাল বলিল, টেন ডেজ ফাষ্টিং 
নট প্র্ফ এনাফ ? 


বাড়য্যে বলিল--গড অলমাইটি নোজ। 

গড অলমাইটি এবং টেন ডেজ ফাষ্টিং-এর উপরে সাহেবের খুব 
বেশী আস্থা না থাকায় তাহার মুখে করুণার সঞ্চার হইল না, তখন 
মৃখুজ্জে বলিয়া উঠিল-_স্টাণ্ড স্থার, ষ্ট্যাণ্ড--অর্থাৎ আপনি একটু পড়ান 
এই বলিয়া সে বেগে বাড়ীর মধ্যে প্রবেশ করিল এবং কিছুক্ষণের 
মধ্যেই একখানি কাগজ লইয়া ফিরিয়া আসিয়া সেখানা সাহেনের 
হাতে দিল--সী ইওর অনার প্রুফ অব. আওয়ার লয়ালটি। 

কৌতুহলী সাহেব পড়িতে লাগিল। মুখুজ্জের সঙ্গীগণ কেহই 
ষুখুজ্দের আচরণে কৌতুহল প্রকাশ করিল না, কারণ কাগজখানার 
সহিত তাহারা ঘনিষ্ঠভাবে পরিচিত দিপাহী বিদ্রোহের ছুত্তর সাগরে 
এই উড়়পখান অবলম্বন করিয়াই তাহার! হৃর্দিনের ভরসায় ছিল । 
কৌতুহল অন্থুভব না করিলেও বগ্ঠিনাথের প্রত্যুৎপন্নমতিত্বে তাহারা 
অভিভূত হুইয় পড়িল। তাহাদের মনে পড়িল বদ্িনাথের আশ্বাস, 
বন্িনাথ থাকিতে কোম্পানীর হাতে তোমাদের ভয় নাই। এবারে 
তাহার পরীক্ষার ক্ষণ সমুপস্থিত। 

দরখাস্তখানার প্রথম ছুটি ছত্র পড়িয়াই শেরার স্তম্তিত হইয়া 
গিয়াছিল, ইহাদের রাজভক্তি সম্বন্ধে তিলমাত্র সংশয় আর তাহার মনে 


ছিল না। শেরার মনে মনে পড়িল--[015 ডা০]11 1515012) ৮০০: 
০3611610575 101091010 0১৪6 ১ 002 363591969, 216 2, 
০0%/81:015 19201916. * 

& দোহাই পাঠক এ উক্তি আমার কল্পনা নগনঃ লেখকের কল্পনার পিতারও 
সাধ্য নাই এমন উক্তির হৃত্টি করে। এই উত্ভিটি 71500: ০06 [)01912 


৪৯ চাপাটি ও পল্প 


তবু সে একাধিকবার দলিলখান! পড়িল এবং দরখাস্তকারীদের 
ঘনিষ্ঠতর পরিচয় পাইবার মানসে প্রশ্ন আরম্ভ করিল--তোমরা শিখ- 
যুদ্ধে গিয়েছিলে? 

মুখুজ্জে টত্তর দিতে থাকিল--এরা সবাই নয়, আমি আর বাঁড়জ্জে 
মশাই গিয়েছিলাম । 

যুদ্ধেই ষদি গিয়েছিলে তবে হঠাৎ ভয় পেলে কেন? 

হুজুর যুদ্ধে যাচ্ছি বলেই সত্য সত্যই যে লড়াই করতে হবে 
এমন কথা বাপের কোন্‌ স্মপুত্র ভেবেছিল ? 

তোমরা কি ফৌজি ছিলে না? 

রাম! রাম! ওসব তো পূরবিয়ারা করবে । আমর! ছিলাম 
কমিসারিয়েটে । আমরা বাঙ্গালীরা এ কাজট1 ভাল পারি। * হুজুর 
আমার গ্র্যাণ্ড ফাদার তেসর! মারাঠ। যুদ্ধে এ কাজ করেছেন, আমার 
ফাদার বরাবর এঁ কাজে ছিলেন, বংশধারার দাবীতে আমিও এর 
বিভাগে কাজ পেয়েছিলাম । 

তোমার এতো। পৈত্রিক পেশা হঠাৎ ভয় পেলে কেন? 

পৈত্রিক পেশ সত্য, হুজুর আমার ছেলেটিও লায়েক হয়ে উঠেছে, 
কিন্তু কাউকে কখনও হুকুম দেওয়া হয় নি যে, কামানের পাল্লায় 
এগিয়ে যেতে হবে। 

যুদ্ধের সময়ে কখনো কখনো তেমন প্রয়োজন হয়ে থাকে । 

প্রয়োজন হয় বলেই কি আমাদের স্বভাব বদলাবে? হুজুর 
আমরা বাঙালীর হচ্ছি 00110127 12120106  0907919 অর্থাৎ 
ছাপোষ! মানুষ৷ 

কামানের পাল্লায় যাবার হুকুম শুনে কি করলে? 


140005১ ড০10106]1 (95 01021155 9811) নামক গ্রন্থে ৬১২ 
পাইয়াছি । বিশ্বাস না হইলে, বিশ্বাস না হওয়াই স্বাভাবিক কারণ এপর্য্যস্ত 
পৃথিবীর কোন জাতি নিজেদের সম্বন্ধে এমন সরল সত্য লিপিবদ্ধ করিতে সাহস 
পায় নাই, আপনি উক্তিটি যথাস্থানে পাইবেন। 

* পাঠক ইহাঁও আমার অনুমান নয়। বাঁংল। উপন্যাসের অনেক নায়কই 


চাপাটি ও পল্স ৫৩ 


আর কি করবো? আমর! বাঙালীর! যা পারি তাই করলাম, 
জঙ্গীলাট লর্ড ১ ব্রাবর, 'এই দরখাস্তখান! লিখে তার সেক্রেটারীর 
হাতে, দিলাম |..." - ৬ 

তিনি কি করলেন? *.? 

, ভিখনি দরখাস্ত মঞ্জুর ক'রে বললেন, বাস্তবিক তোমরা মার। পড়লে 
£কমিমারিয়েটের কাজ চালাবে কে? 

তারপরে ? 

তারপরে আর কি, শিখ লড়াই ফতে করে কোম্পানীর ফৌজ সাট. 
লেজ পার হ'ল, আমরা পিছু পিছু চল্লাম । 

দরখাস্তখান। তে। থাকলো মিলিটারী দপ্তরে, তার নকল নিলে 
কেন? 

পাছে কখনো কাজে লেগে যায় এই আশায় । সত্যিই তো আজ 
কাজে লেগে গেল হুজুর! এখান! দেখে তবে তে! হুজুরের বিশ্বাস হ'ল 
যে আমরা রাজতভক্ত । 

তোমরা অবশ্য ভখন রাজভক্ত ছিলে, কিন্তু এখনে যে আছ তার 
প্রমাণ ? 

এবারে মুখুজ্জে যে কয়টি কথা৷ বলিল, তাহ! ত্বর্ণাক্ষরে বাঁধাইয়। 
রাখিবার মতে । সে বলিল--হুজুর ভীরু লোকে কখনে৷ বিদ্রোহী হয় 
না, কারণ ভীরুতা হচ্ছে রাজভক্তির বীজ। 


শেরার বুঝিল তাহার এখনে অনেক দেখিবার, অনেক শুনিবার 
এবং অনেক শিখিবার বাকি আছে। সে বলিল--আচ্ছা তোমরা 
নিশ্চিন্তে থাকে! গিয়ে, কেউ তোমাদের উপরে অত্যাচার করবে না। 


মুখুজ্জে বলিল-নো মাউথ ওয়ার্ড স্তার অর্থাৎ শুধু মুখের কথায় 
হবে না, অমনি এক ছত্র লিখে দিতে হবে। 


কমিগারিয়েটে কাজ করিয়। গ্রভৃত ধনোপার্জন করিয়াছে । আপাততঃ ইন্দির! 
উপন্যাসের ইন্দিরার স্বামী এবং গোরা উপন্গাসের কৃষ্ণদযণল বাবুর কখা মনে 
পড়িতেছে। খুঁজিলে আরো অনেক সন্ধান পাওয়া যাইবে । 


৫১ চাপাটি ও পদ্প 
(২ 


এখন কাগজ কলম পাই কোথায় ? 
এই আনছি বলিয়া মুখুজ্জে মু সহ করিয়। 
বড় বড় অক্ষরে লিখিয়া ফেলিল, রে 







50000৮61685 1006 00 1001৯6 1? 
২ ২ 
তারপরে শেরারের হাতের কাছে ডট 


হস্তে বলিল-স্তার একটা সই বা 

সাহেব স্বাক্ষর করিয়া দিতেই মুখুজ্জে সেখান ছে মারিয়। কাড়িয়। 
লইয়া বাড়ীর দরজার কাছে সযত্ে সাঁটিয়া দিল-_-আর সব কটি বঙ্গ- 
সন্তান সাহেবকে সুদীর্ঘ সেলাম করিয়া ধন্যবাদ জানাইল। 


শেরার অন্যত্র রওন হইল আর মনে মনে ভাবিতে লাগিল আশ্চর্য 
এই বাঙালী জাতটা ! জাছুকরের মতে! কোথা হইতে কাগজ-কলম 
বাহির করিল। আর সাহেবের স্বাক্ষরের উপরে ইহাদের কি অসীম 
বিশ্বাস! হইবেই বা না কেন, এ দেশেই তো কোম্পানীর রাজ্যের 
প্রথম বুনিয়াদ! দীর্ঘকালের শাসনে ইহাদের মজ্জা অবধি বেশ নরম 
হইয়া আসিয়াছে, তুলনায় এই পুরবিয়! গৌয়ারগুলো৷ কি বর্বর । শেরার 
মনে মনে স্থির করিল বিদ্রোহের হাঙ্গাম। চুকিয়া গেলেই উপরে ধরাও 
করিয়া কলিকাতায় বদলি হইতে হইবে-_বাঙালীর কাছে শিখিরার 
অনেক কিছু আছে। 

ওদিকে সাহেব নিরাপদ্জনক দূরে চলিয়া যাইতেই মুখুজ্জে অপজিয়- 
মান সাহেবের প্রতি ছুই হাতের বৃদ্ধান্ুষ্ঠ প্রদর্শন করিয়া সমবয়সী 
বাড়জ্জেকে বলিল--দেখ,লে ভায়া কেমন পলিটিক্স করলাম। 

একজন বলিল-_-অত নীচু না হলেই পারতেন। 

মুখুজ্জে বলিল--আরে নীচু না হলে জুতে। চুরি কর! যায়? তাছাড়া 
নীচুটাই বা কি হলাম? দরখাস্তখানা তো মিথ্যা নয়। তার উপরে 


* এটিও বাস্তব সত্য, কল্পনা নয়। জ্রষ্টব্য [7261090155 7091:010 ০0 
€০81127912 ৮5]. ভ/. 91762181. 


চাপাঁটি ও পদ্ম 0 €২ 


ছুটো মিষ্টি কথা বলেছি এই তো! তা রাজার জাতকে অমন বলতে 
হয়। ৮৮ ্‌ 

দেখা গেল যে, মুখুজ্জের সঙ্গে কাহারো মতের বিশেষ তারতম্য 
নাই। 


অতঃপর বলিল--চলে। আজ ভালো৷ করে খাওয়া দাওয়া যাক। 
এ ক'দিন নাকে ভাত দিয়েছি ন। মুখে ভাত দিয়েছি ঠিক ছিল না । 
আজ নিশ্চিন্তি। বাবা--এ স্বয়ং ম্যাজিস্ট্রেটের সই । গোর কাল! 
সবাই বাড়ীর কাছ থেকে হেঁটমুণ্ডে ফিরে যাবে । নাও চলো, আর 
কোন ভয় নেই। 

তখন সকলে মুখুজ্জের অনুসরণ করিয়। বাড়ীর মধ্যে প্রবেশ করিল। 


২ 

ব্িনাথ মুখুজ্জের আশঙ্কা মিথ্য। নয়, এ সব বিষয়ে রাজভত্ত প্রজার 
অনুমান বড় মিথ্যা হয় না। কানপুর সহর পুনরায় দখল করিবার পরে 
কোম্পানীর ফৌজ অত্যাচার আরম্ভ করিল । বিচার করিয়া করিলে যাহ। 
স্যায়ধর্মরক্ষা, নিবিচারে করিলে তাহাই অত্যাচার । বিবিঘরের হত্যা- 
কাণ্তের অপরাধে ইংরাজ যাহাকে পারিল ফাঁসি দিল, সামান্যতম 
সন্দেহের ছায়াগ্রস্ত ব্যক্তিও মুক্তি পাইল না। অত্যাচারের আশঙ্কার 
লোকের মনে হিতাহিত জ্ঞান লোপ পাইল, আত্মরক্ষার আশায় অনেকেই 
নির্দোষ প্রতিবেশীকে ধরাইয়। দিল; প্রতিবেশী মরিল, নিজেও রক্ষা 
পাইল না। একতরফ। দণ্ডের আঘাতে সমগ্র কানপুর সহর মুহামান 
হইয়া পড়িল। ফল কথা সিপাহীর যে কাণ্ড কারয়াছিল কোম্পানীও 
তাহার পুনরভিনয় করিল, তবে সেবারে ইংরাজ মরিয়াছিল, এবারে 
ভারতীয় মরিল তফাৎ এইটুকু মাত্র। জেনারেল নীলের শাসনে 
কানপুরের নাগরিকদেহ ভয়ে নীল হইয়৷ গেল। অবশ্য মুখুজ্জের 
আবাসের উপরে কেহ হান! দিল না, তবে সেটা কোটওয়ালীর কাছে 


৫৩ চাঁপাটি ও পঙ্ল 


বলিয়াই হোক বা ম্যাজিষ্ট্রেট শেরারের অনুশাসন বলিয়াই হোক ব৷ 
অন্য কোন অজ্ঞাত কারণেই হোক । তবু মুখুজ্জের সতর্কতার অস্ত ছিল 
না। সে নিজে কখনো বাড়ী হইতে বাহির হইত না কিংবা অপর 
কাহাকেও বড় বাহির হইতে দিত না। তবু এক-আধবার বাহির ন! 
হইলে চলে না, বাজার করিতে হয়। সন্ত্রস্ত ইছুর গৃহস্বামীর অনবধানতা 
লক্ষ্য করিয়া যেমন চুরি করিয়? বাহির হইয়াই আবার গতে”প্রবেশ 
করে তেমনি কেহ একজন কোন এক ফাঁকে গিয়া বাজার করিয়া 
আনিত। কিন্তু ঘরের মধ্যে গোপনে থাকিয়াও সহরের বিভীষিকার 
প্রভাব হইতে মুখুঙ্জে ও তাহার সঙ্গীগণের রক্ষা ছিল না । শ্মশান 
যাত্রীর উৎকট চীৎকারে ঘুম ভাঙিয়৷ গৃহস্থ যেমন জাগিয়। উঠিয়া! ভীতি 
বোধ করে, তেমনি আসামীর অন্তিম আত মিনতিতে মুখুজ্জেদের 
মুুযু'্ু চকিত করিয়। দিত । 


দোহাই কালেকটার সাহেব আমার কোন কন্ত্ুর নাই। 

দোহাই কোম্পানী বাহাছবর আমি নির্দোষ । 

গোড় লাগে কাপ্তান সাহেব তুমি আমার বাঁপ। 

আসামীদের কোটওয়ালীতে টানিয়া আনা হইতেছে । 

মুখুজ্জে জানল! দিয়া উকি মারিয়! সদর রাস্তায় ভূপাতিত দেহটি 
একবার দেখিয়াই স্বস্থানে ফিরিয়া আসিয়া বসিত আর কাপিতে কাপিতে 
উপবীত অবলম্বন করিয়া গায়ত্রীমন্ত্র জপিতে থাকিত। কিন্ত্র মন লাগিত 
না, তাহার দৃষ্টি শিখযুদ্ধের দরখাস্তখানার উপরে পড়িত, মুখুজ্ে কিঞ্চিং 
ভরসা! পাইত। দরখাস্তখানা ঘরের দেয়ালে টাঙাইয়! রাঁখা হইয়াছিল 
যাহাতে গোরা লোক ঘরে ঢুকিবামাত্র দেখিতে পায়। মুখুজ্জে অনেক 
ঠেকিয়া বুঝিয়াছিল যে, সময়বিশেষে ভগবানের চেয়ে শেরার সাহেব 
প্রবলতর । 

একদিন সন্ধ্যাবেলায় সপারিষদ মুখুজ্ে দ্বার দিয়! বসিয়াছিল। 
মাঝখানে মুখুজ্জে আর চারদিকে বীড়,জ্জে, ঘোষাল, ঘোষ, বন্ধ, মিত্র 
প্রভৃতি রাজভক্ত বঙ্গ-সম্তানগণ। একট! পাটের দড়িকে অতিরিক্ত 
কয়েকটা পাক দিয় সুক্মতর করিয়! একপ্রান্তে একটি গেরো বাঁধিয়া 


চাঁপাটি ও পদ্প ৫৭ 


দিলে যেমন দেখিতে হয় মুখুজ্জের দেহটি ঠিক তেমনি, সমস্ত দেহটা 
শুকাইয়া পাক খাইয়া রসকষহীন একটি রজ্জুতে পরিণত হইয়াছে, 
এ গেরোটি তাহার মস্তক, ঠাহর করিয়া দেখিলে সুখমগ্তলে নাক চোখ 
মুখের কয়েকটি গর্ত দৃষ্ট হওয়া অসম্ভধ নয়। মুখুজ্জের জীবনের যাবতীয় 
হুঃখ-কষ্ট পরীক্ষা প্রবঞ্চনার ইতিহাস সম্যক জানিলে হয়তো তাহার 
প্রতি ধিকাঁরের ভাব মনে উদ্দিত না হইয়! সহানুভূতির ভাবটাই জাগ্রত 
হইবে, কিন্তু তেমন অবসর কোথায় ? মানুষকে দৌষমুক্ত করিবার 
উদ্দেশ্টে কেহ বিচার করিতে বসে না, তাহাকে দণ্ড দেওয়া যখন স্থির 
হইয়া গিয়াছে তখনি বিচার প্রহসন আরম্ভ হয়। সুখুজ্জে ঠকিতে 
ঠকিতে শিখিয়াছে যে, ঠকাঁনোটাই জীবনের উদ্দেশ্য, হুঃখ পাইতে 
পাইতে শিখিয়াছে যে, ছুঃখটাই জীবনের ধর্ম, ভয় পাইতে পাইতে 
শিখিয়াছে যে, ভীতিবোধ না থাকিলে কার্যোদ্ধার হয় না; আর রাজ- 
ভক্তি ! বাল্যকালে পিতামাতার প্রতি ভক্তি, পাঠশালায় গুরুমহাশয়ের 
প্রতি ভক্তি-এসমস্তই তে রাজভক্তির ভূমিকা, রাজভক্তি সমস্ত 
ভক্তির ঘনীভূত চরম মৃতি। মুখুজ্জেকে আমি বিচার করিতেছি 
না, অন্কন করিতেছি মাত্র । 


যে দিনের কথা বলিতেছি সেদিন সন্ধ্যায় মুখুজ্জের বাড়ীর সদর 
দরজায় ঘা পড়িল এবং সেই শব্দে বঙ্গসস্তান কয়টির চিত্ত উদ্বেগে 
উৎকর্ণ হইয়া উঠিল, অসময়ে দরজায় ঘা দেয় কে? বীঁড়ুজ্জে 
আফিংয়ের ঘোরে ঝিমাইতেছিল, চটক ভাঙিয়া বলিযা উঠিল, দরজা 
এঁটে দাও, বলিয়াই আবার নেশার স্রোতে ডুব দ্রিল। 

গুম্‌ গুম্‌ গুম্‌! 

গুম্‌ গুম্‌ গুম্‌! 


মুখুজ্ছে রাজভক্ত হইলেও নির্ধবোধ নয়। তাহার আশঙ্ক1 হইল 
যদি সরকারি লোক হয় তবে তাহাকে উপেক্ষা করা কিছু নয়, আর 
উপেক্ষা করিলেও তাহাকে এড়ানো যাইবে না, দরজ। ভাডিয়া ঢুকিবে। 
তাই সুখুজ্দে একজনকে বলিল--দেখে,এসো৷ কে? 


৫৫ চাপাটি ও পঙ্গু 


কিছুক্ষণ পরে এক ব্যক্তিকে সঙ্গে করিয়া! একজন ফিরিয়! আদিল, 
বলিল--ইনিই দরজায় ঘা দিচ্ছিলেন। 

সকলে দেখিল একজন বাঙালী যুবক, বয়স পগিশের বেশী হইবে 
না, ছিন্ন মলিন বেশ, উদ্ধান্ত চেহারা । 

মুখুজ্জে শুধাইল, তুমি কে বট? 

যুবক বলিল-- মহাশয়, আমি একজন বাঙালী যুবক । 

সে তো৷ দেখতেই পাচ্ছি, কিন্তু কোথেকে আসঙ, কি সমাচার, কি 
পরিচয় জানা আবশ্বাক ৷ 

মশায় আমার নিবাস কাশীধামে । আমি কাজের সন্ধানে এলাহাবাদে 

আসি, সেখানে কোন কাজের সন্ধান ন। পাওয়ায় কানপুরের উদ্দেশে 
রওনা হই । পথে মিপাহীদের অত্যাচারে সর্বস্বাস্ত হয়ে কোন মতে 
এখানে এসে পৌছেছি। 

এ বাড়ীর সন্ধান পেলে কিভাবে ? 

সহরের একজনের কাছে শুনলাম এ বাড়ীতে কয়েকজন বাঙালী 
আছেন । 

তোমার নাম কি বাপু? 

আজ্ঞে শ্রীতারকচন্দ্র রায় । 

তোমরা ? 

আজ্ছ ব্রাহ্মণ । 

এ পরিচয় যথেষ্ট নয় । 

আর কি পরিচয় দেবে। বলুন । 

তুমি ষে লিপাহীদের গুপ্তচর নও তার কি প্রমাণ? 

তাদের দ্বারাই যে আমি সব্বন্াস্ত ৷ 

তোমার কথা ছাড়া তার তো কোন প্রমাণ নেই । 

আজ্ঞে আমার কথা বিশ্বাস করুন । 

এই সময়ে বীড়ুজ্দে হঠাৎ আবার চটকা ভাঙিয়৷ বলিয়া উঠিল-- 
“অজ্ঞাতকুলশীলস্ বাসো দেয়ো ন কস্তচিং--তারপরে মে আবার 
পূর্ববং নীরব হইল । 


চাপাটি ও প্স ৫৬ 


সকলের মৌনভাবে বোঝা গেল যে বিপদের সময়ে অজ্ঞাতপরিচয় 
ব্যক্তিকে আশ্রয় দেওয়া উচিত হইবে না। 

তাহাদের ভাবগতিক দর্শনে উদ্বিপ্ন যুবকটি বলিল-_ আজ্ঞে বাঙালী 
হয়ে বাঁঙালীকে রক্ষা না৷ করলে কে আর রক্ষা করবে? 

ঘোষ বলিল--ওসব অনেক শুনেছি এখন কেটে পড়ে । 

যুবকটি ইতস্ততঃ করিতেছে দেখিয়া মুখুজ্জে বলিল--আচ্ছা, তুমি 
বসো। 


সঙ্গীদের দিকে তাকাইয়! বলিল-_এতরাত্রে আর কোথায় যাবে ? 

যুবকটি থাকিয়া গেল। 

সেদিন শেষ রাত্রে আর্ত বামাকঠম্বরে হঠাৎ সকলের ঘুম ভাঙ্গিয়' 
গেল। সকলেই এরূপ আর্তম্বরে অভ্যস্ত, তবে নারী কগন্বরটা নুতন 
বটে। অনুরূপ অবস্থায় কি কর্তব্য সকলেরই পরিজ্ঞাত, সকলে উঠিয়! 
দরজা জানলার অর্গল পরীক্ষা করিয়। স্থির হইয়া বসিল। 


কেবল সেই বাঙালী যুবকটি বলিল-_আপনারা চুপ ক'রে বসলেন 
ষে! একবার সন্ধান নেওয়া আবশ্যক ব্যাপারটা কি? 


কিন্ত সকলের মুখের ভাব দর্শনে তাহার মনে হইল এমন অদ্ভুত 
কথা যেন তাহারা ইতি শোনে নাই। 


একজন বলিল-_তুমি কি পাগল হয়েছ নাকি? অপরে বলিল--- 
চুপ করে বসে থাক তো। 

তারক বলিল--আমি বরঞ্চ একবার খোঁজ নিয়ে আনি। 

বাঁডজ্জের নেশা! তখনো সম্পূর্ণ কাটে নাই, শ্লেম্সাবিজড়িতকঠে 
বলিল--অব্যাপারেষু ব্যাপারং যো নর কতুমমিচ্ছতি, স ভূমৌ-*" 
বাকিটুকু আর শ্রুতিগোচর হইল ন]। 

তাহারা কিছুই করিবে না বুঝিতে পারিয়া আর্ত বামাকণ্ঠের 
রহস্তোদঘাটনের উদ্দেশ্টে তারক জানালার দিকে অগ্রসর হইতেই সকলে 
তাহার উপরে গিয়া! পড়িয়া তাহাকে ধরাশায়ী করিয়া! দিল। 

কে একজন বলিল, সিপাহীর গুপ্তচর না হয়ে যায় না ! 


৫৭ | চাঁপাটি ও পঞ্ন 


মুখুজ্জে বলিল-_বাবা, তোমাকে আশ্রয় দিয়ে কি অপরাধ করেছি ? 
তবে? তবে এমন ক'রে ছাপোষা মানুষগুলোকে মেরে কি লাভ? 

আপনাদের দেখছি প্রাণের ভয় বড্ড বেশি । 

এত ছুঃখের মধোও তাহার কথায় সকলের হাসি পাইল ; যুখুজ্জে 
বলিল--ভয়ট1 তবে কিসের জন্য হবে ? 

কে কার উপরে অত্যাচার করছে দেখতে হবে না ? 

চারদিকে অত্যাচারের বন্যা বইছে । কে কার উপরে নয় ! যে যার 
উপরে পারছে করছে । নিবারণ করতে গেলে তার কোন লাভ হবে না, 
মাঝে থেকে তুমি প্রাণে মারা পড়বে । 

কিন্তু এমন অসহাঁয়ভাবে থাকাও যে কঠিন । 

সেকি আমরা জানি নে। দয়ামায়া আমাদেরও আছে। তবেকি 
জানো হুর্বলের দয়! করবার অধিকার নেই। অন্তায় সহ্য করতে হয় 
বলেই তো ছুবল হুর্বল। 

মুখজের সারগর্ভ উপদেশে তারকের ষে চৈতন্যোদয় হইল মনে হয় 
না, কিন্ত সে এক্ষণে নিতান্তই অশক্তঃ কেননা ইতিমধ্যে কয়েকজনে 
মিলিয়া তাহাকে একখান বিছানার চাদর দিয়! শক্ত করিয়া বাঁধিয়। 
ফেলিয়াছে। সে অসহায়ভাবে পড়িয়! পড়িয়া গজরাইতে লাগিল। 

আর্তম্বর থামিয়া গিয়াছে । তখনো রাত্রি ছিল। সকলে ঘুমাইয়! 
পড়িল। কেবল মুখ,জ্জে চোখ বুজিয়া' আপন মনে ভাবিতেছিল আজ- 
কালকার ছেলের ক্রমেই বেয়াড়া হইয়া উঠিতেছে, না মানে গুরুজনের 
উপদেশ, না! জানে আত্মরক্ষার উপায়। তারপরে এই ভাবিয়া মনে 
সাস্তবনা পাইল ঘষে একটু বয়স ভারী দিলেই ছোকরার বীরত্বের অভিনয় 
টুকিয়া যাইবে, তখন সত্যই সে জীবনের রস পাইবে যেমন নিজের! 
আজ পাইতেছে। হঠাৎ তাহার মনে পড়িল সে নিজে একদিন পরমা- 
রাধ্য পিতৃদেবের আদেশ অমান্য করিয়া একট! বুনো মহিষকে তাড়া 
করিয়াছিল, আর একটু হইলেই মারা পড়িত আর কি! বহুদিন পুবে- 
কার অবিষুষ্যকারিতায় নিজের প্রতি সে ধিককারের ভাব অন্থভব করিল-_ 
আর সেইন্বত্রে মনস্তত্বের কোন্‌ নিয়মে না জানি যুবকটির প্রতি তাহার 


চাপাটি ও পদ্ম ৫৮ 


মনে এক প্রকার সন্বেহ অন্থুকম্পার ভাব উদিত হইল। মুখুজ্জে উঠিয়। 
গিয়৷ তাহার বাধন খুলিয়া দিল । 

পরদিন সকালে যুবকটিকে চোখে চোখে রাখিল, তাড়াইতেও সাহস 
হয় না, আবার আশ্রয় দিতেও কু! । 

দেয়ালে বিলম্বিত সেই দরখাস্তখান1] দেখিয়া! তারক শুধাইল-_ 
ওটা কি? 

কাল বাত্রে কাগজখান৷ সে দেখিতে পায় নাই। 

যুখ,জ্জে বলিল-_প'ড়ে দেখো, এ কাগজখানার জোরেই এখনো 
টিকে আছি । 

কাগজখান! পড়িয়া যুবক ক্রোধে বলিয়া উঠিল--এমন কথা 
আপনারা লিখতে পারলেন? 

মুখুজ্জে বলিল--কেন বাপু মিথ্যে কি লিখেছি ? 

মিথ্যা নয়? 

তুমিই ভেবে দেখোনা কেন, গ্রাম থেকে গ্রামাস্তরে যেতে হলে 
বাঙালীর গুরু-পুরুত শালগ্রাম শি! দর্শন চাই, মন্ত্রপাঠ চাই, নির্মাল্য 
ধারণ চাই ! চাই কিনাবল? এগুলোকেই গুছিয়ে এক কথায় যদি 
ভীরুতা বল। হয় তবে দোষ কিসের? 


অপরে বলে বলুক, তাই বলে নিজ মুখে স্বীকার ? 

আমাদের বাপু মনে মুখে আড় নেই । তাছাড়া কামানের মুখ 
একবার ছাড়া ছুবার কথ। বলে না। 

তেলেঙ্গি লড়ছে, পূরবিয়া লড়ছে, শিখ লড়ছে, মুসলমান লড়ছে, 
আর আপনাদেরই যত ভয়। 

আরে বাপু আমরা যে বাঙালী! তেলেজলে আমরা মানুষ । 
মাছের ঝোল-ভাভ আমাদের প্রাণ, মা-মাঁসির কোলে আমাদের স্থান । 
ওসব চোয়াড়দের সঙ্গে আমাদের তুলনা করো কেন? 

জগতে আর কারো! মাসি পিসি নেই-_-আর মাছ ভাতও কেউ খায় 
না! আমরাই কি সব চেয়ে অকর্মণ্য ! 

অকর্মণ্য এমন বলি না। কাজ আমরাও জানি । হিসাব রাখতে 


৫৯ চাপাটি ও পদ্প 


দাও, খাতা! লিখতে দাও, সাহেবের মুন্সীগিরি করতে দাও । করুক তো? 
দেখি 'এসব কাজ ওরা ! জিভ বেরিয়ে পড়বে। 

বলিয়া কিভাবে কত খানি জিহ্বা বহির্গত হইবে মুখজ্জে তাহা 
অভিনয় করিয়া দেখাইল। 


বাঁড়যোর নেশা! এখন সম্পূর্ণ কাটিয়! যাওয়াতে মাতৃভাষার উপরে 
পুনরধিকার স্থাপিত হইয়াছে, মে বলিল---ভালো রে ভালো, ছোকর৷ 
ষে আবার তর্ক করে। 

ব্যাপারটা তখন এ খানেই মিটিয়া গেল। 


সেদিন সন্ধ্যাবেলায় কোটওয়ালীতে মুখ.জ্জের ডাক পড়িল। সে 
নবমীর পাঁঠার মতে। কাপিতে কাপিতে সেখানে পৌছিয়া দেখে স্বয়ং 
শেরার সাহেব উপস্থিত। 


হালে! মুখাজি তোমাদের বাড়ীতে কি একজন বাঙালী ছোকর৷ 
আশ্রয় নিয়েছে? 


না, হুজুর । 


আমিও তাই বলি। আমাদের গোয়েন্দা বলেছিল তাকে নাকি 
&ঁ দিকে যেতে দেখেছে, লোকটা দিপাহীপক্ষের লোক। 

না হুজুর, এমন লোককে আমি কেন আশ্রয় দিতে যাব ! 

রাইট ! আমি গোয়েন্দাকে তখনি বলেছিলাম এ কখনো সম্ভব 
নয়। মুখাজি রাজভক্ত প্রজা, এরকম কাজ সে কখনো করবে না। 

হুজুর ঠিক বুঝেছেন । 

আচ্ছা তুমি যাও । 

সুখুজ্জে লম্বা সেলাম করিয়। চলিয়া আসিল । 


অন্যস্থান হইলে শেরার খানাতল্লামী করিত, কিন্তু মুখ,জ্জের বাডী 
সম্বন্ধে প্রয়োজন অনুভব করে নাই, কারণ মুখুজ্জের মুখ-নিঃস্যত 
সেই অক্ষয় বাণী অন্ধ বাহুড়ের মতো এখনো তাহার অন্ধকার মনের 
মধ্যে পাক খাইয়। ঘুরিয়া মরিতে হিল--ভীরুতাই রাজভক্তির বীজ ! 
মুখ্জ্জের মতো! ভীরু লোক কোন অপরিচিত ব্যক্তিকে আশ্রয় দান 


চাপাটি ও পঞ্গ ৬৩০ 


করিবে ইহা! শেরারের কল্পনাতীত । তাছাড়! রাজনৈতিক প্রয়োজনেও 
আশ্রিতবাৎসল্য প্রদর্শনের প্রয়োজন ছিল। 


মুখুজ্জে ফিরিয়া আসিয়া আসল ঘটনা প্রকাশ করিল না, যা হয় 
কিছু একটা বলিয়া দিল। কিন্তু মনে মনে ভাবিতে লাগিল এখন 
কর্তব্য কি? উক্ত যুবকই যে শেরার সাহেবের উদ্দিষ্ট লোক সে বিষয়ে 
তাহার সন্দেহ ছিল না। শেষে ভাবিল রাতে আর গোলমাল করিয়া 
কাজ নাই, কাল ভোরবেলায় ভালোয় ভালোয় উহাকে বিদায় দিলেই 
চলিবে । 

পরদিন ভোরবেলায় উঠিয় যুবকটিকে খজিয়৷ পাওয়। গেল না । 
মুখুজ্জে মনে মনে বুঝিল যে শেরার সাহেবের তলবের কারণ অনুমান 
করিয়া যুবক সরিয়। পড়িয়াছে, ভাবিল ভালই হইয়াছে, অপ্রিয় কাজটা 
আর করিতে হইল ন]। 

এমন সময় একজন ছুটিয়া আসিয়া বলিল, মুখ,জ্জে মশাই ব্যাপার 
কি! 

সকলে শুধাইল, কি হ'য়েছে ? 

আর কি হবে? দরজায় শেরার সাহেবের পরোয়ানাখান। নেই, 
ভার বদলে এই কাগজখান। ছিল। 

সকলে পড়িল কাগজখানায় লিখিত আছে --1715 10059 1০- 
101)55 0 :81601:5 00 076 ০০106 --ঞ 4 921510. 

এ এ যুখপোড়ার কাণ্ড । 

হঠাৎ কি সন্দেহ হওয়াতে দেয়ালে বিলম্বিত দরখাস্তখানার কাছে 
কাছে গিয়া মুখুজ্জে একেবারে ডুকরিয়া কীদিয়া উঠিল--চগ্ডাল, 
চগ্ডাল, চণ্ডাল। 

কিহ'ল কি হ'ল, বলিয়া সকলে অকুস্থলে গিয়। দেখিল কে যেন 
দরখাস্তখান! কুটি কুটি করিয়া ছি'ড়িয়া রাখিয়াছে। আর মুখুজ্জে 
সশব্দে মেঝেতে মাথা কুটিতেছে-_চগ্ডাল, চগ্ডাল, চগ্ডাল | 


গুলাব সিং-এর পিস্তল 


বিনা নোটিসে হঠাৎ গুলাব সিং স্বগ্রাম গুজরানপুরে ফিরিয়! আসিল, 
সে সংবাদ পাইয়াছে আগামীকাল ১ল! নভেম্বর কানপুর শহরে মহা- 
রাণী ভিক্টোরিয়ার ঘোষণাপত্র পঠিত হইবে, তাহাতে তিনি নাকি 
দিপাহী পক্ষে যাহারা যোগ দিয়াছিল তাহাদের ক্ষমা করিয়াছেন । 
গ্রামের লোকে গুলাব সিংকে ফিরিতে দেখিয়া চমকিয়। উঠিল, বন্ধুর! 
শুধাইল, এতদিন ছিলে কোথায়? গুলাব সিং বলিঙ্গ, শ্বশ্তর বাড়ী। 
শত্রুরা মনে মনে বলিল, এবার শ্বশুর বাড়ী যাইবার পথ প্রস্তুত 
করিয়াছ, ঈ্াড়াও আগে থানাদার মর্ধান আলি সংবাদ পাক। গলা 
সিং স্বগৃহে ঢুকিয়া দেখিল অস্থাবর সমস্ত লুষ্টিত হইয়া! গিয়াছে, সে 
বুঝিল শক্র-মিত্র নিবিশেষে উক্ত কাজ করিয়াছে, থাকিবার মধ্যে 
আছে একখান! পুরাতন চার পায়া, তাহার উপরে গুলাব সিং বসিল, 
আর তারপরে ধীরে স্ুস্থে ছুই হাত দিয়! প্রচুর গুক্ষ শ্মশ্রু আয়ত্তে 
আনিবার চেষ্টায় নিযুক্ত হইল। সংসারে আছে তাহার একমাত্র পুত্র 
অজ্জুন সিং বয়স কুড়ি বাইশ, কি ভাবিয়া গুলাব সিং একাই 
ফিরিয়াছে, পুত্রকে আনে নাই। 

গ্রামের অপর প্রান্তে থানাদার মর্দান আলির বাড়ী। গুলাব সিং- 
এর প্রত্যাবর্তন সংবাদ পাইয়া উল্লাসে লাফাইয়। উঠিয়া সে বলিল-_ 
এবারে শয়তানকে দেখে নেবো, এখনি গ্রেপ্তার ক'রে আনবো । 

ছোট থানাদার বলিল, তা কেমন করে সম্ভব? ঘোষণাপত্রে 
মহারাণী যে সকলকে বে-কমুর খালাস দিয়েছেন । 

মর্দান আলি বলিল--ঘোষণাপত্র তো আজও জারি হয়নি, আজ 
ওকে গ্রেপ্তার করতে বাধা নেই। ছোট থানাদার এখনো পুরাপুরি 
থানাদার না হওয়ায় আইনের অক্ষরের চেয়ে অর্থের মর্ধাদ। বেশি দিত, 
সে বলিল--শেষে আবার টাকার সাহেব না গোলমাল করেন । 

টাকার সাহেব কানপুরের ম্যাজিষ্ট্রেট । 


চাপাটি ও প্র ৬২ 


মর্দান আলি সংক্ষেপে টাকার সাহেবের পদমর্যাদা উড়াইয়! দিয়া 
বলিল--কে টাকার সাহেব । গুজরানপুরে আমিই সব। 


তারপরে বলিল, টাকার সাহেব যখন পালিয়ে এলাহাবাদে চলে 
গিয়েছিল তখন গুজরানপুর কোম্পানির নামে শাসন ক'রছিল কে? 
আমি থানাদার মর্দান আলি খা, বাপের নাম মজবুব আলি খা, 
ঠাকুর্দার নাম রহমত খা» আমরা তিন পুরুষের থানাদার। কে 
তোমার টাকার সাহেব? 

তার পরে প্রশস্ত বুকের উপর কয়েকবার চাপড় দিয়! বলিল, 
আমরা পাঠান, আজ দেখে নেবে। বেটা শিখ শয়তানকে । 


এই বলিয়া মে কয়েকজন বরকন্দাজ সঙ্গে লইয়া, স্বয়ং ঢাল তলো।- 
য়ারে সজ্জিত হইয়া! গুলাব সিংকে গ্রেপ্তার করিতে চলিল, সঙ্গে একট 
নাকড়া লইতে ভূলিল না। 


* 


গুলাব সিং ও মর্দান আলি ছু'জনেই কানপুর জেলার অন্তর্গত 
গুজরানপুরের অধিবাসী । ছু*জনেই অবস্থাপন্ন । কাজেই স্বাভাবিক 
নিয়মে ছু'জনের মধ্যে মারপিট দাঙ্গাহাঙ্গামা লাগিয়াই ছিল। গুলাব 
সিং-এর শারীরিক শক্তি বেশি, মর্দান আলির প্রতাপ বেনী, মে থানা- 
দার। কিন্তু হইলে কি হয় গুলাব পিং-এর হাত লাঠি, তলোয়ার, 
বন্দুক পিস্তলে এমনি পাকা যে থানাদারকেও ভয় করিয়। চলিতে হয়। 
গুলাব সিং-এর বন্ধুরা তাহাকে একটু সামলাইয়৷ চলিবার অন্ভুরোধ 
করিলে মে বলিত, আরে রেখে দাও, থানাদার বলে কি তার ছুটে 
জান। একবার আন্মুক না। 

মর্দান আলি লম্বা চওড়া জোয়ান বটে, কিন্ত গুলাব সিং-এর কাছে 
কিছুই নয়। ও রকম বিরাট বপু কদাচিৎ দেখ যায়, বিধাতা তাহাকে 
দরাজ হাতে স্ষ্টি করিয়াছেন, ভিড়ের মধ্যে কখনই তাহার কাধের 


৬৩ | চাপাটি ও পদ্ল 


বেশি ভোবে না, প্রশস্ত স্বন্ধ এবং কাচা পাক! চুল দাড়ি সমেত মস্তক 
ও মুখমণ্ডল অনেক দূর হইতে দেখিতে পাইয়া! লোকে ফিসফিস করিয়া 
বলে এঁ যে গুলাব দিং। সে নাকি পাঞ্জাব কেশরী রণজিৎ সিংহের 
খাস শরীররক্ষী ছিল। 
একথা শুনিলে মর্দান আলি বলিত--মারে আমার ঠাকুদণ ছিল 
বাদশা আলমগীরের খাস পাইক। বল! বাহুল্য, ছুটি দাবীরই 
এতিহাসিক মূল্য সমান । 
এমন সময়ে উত্তর ভারতে সিপাহী বিদ্রোহের আগুন জলিয়া উঠিল 
এবং সে দাবানল দেখিতে দেখিতে প্রথমে শহরে শহরে পরে গ্রামে 
গ্রামে ছড়াইয়া পড়িল। শহরের ও গ্রামের অবস্থাপন্ন অনেক 
লোকেই একদিকে ব৷ অন্থদিকে যোগ দিল» কেহ বা স্বেচ্ছায় কেহ বা 
অবস্থাগতিকে । গুজরানপুরের প্রতিদন্্ীদ্ধয় গুলাব সং ও মদ্দান 
আলি ভিন্নপক্ষে যোগ দিল, তবে তাহ! কোন আদর্শের খাতিরেও নয় 
বা অবস্থার চাপেও নয়। কেন যে তাহারা ভিন্নপক্ষে যোগ দিল 
তাহা পাঠকের বুঝিতে পারা উচিত। সিপাহী বিদ্রোহের অগ্নিকাণ্ডকে 
তাহারা প্রতিদ্বন্দ্ীর ঘরে আগুন লাগাইবার জন্য ব্যবহার করিতে 
কৃতসম্থল্প হইল। গ্রামের ছুই প্রান্তে ছুইজনে নীরবে বসিয়৷ অপরের 
গতিবিধি লক্ষ্য করিতে লাগিল। এমন সময়ে কানপুর হইতে খবর 
আদিল যে, জেনারেল হুইলার ও সাহেব-বিবিগণ সেখানে কোণঠাস। 
হইয়াছে, ওদিকে তাতিয়। টোপি সসৈন্ে যমুনা পার হইয়া কানপুরের 
দিকে আমিতেছে। গুলাব সিং বুঝিল আর বিলম্ব নয়, পাছে বিজয়ী 
পক্ষে মর্দান আলি যোগ দিয়া তাহার সুযোগ নষ্ট করিয়া দেয়। সে 
সিপাহীদের পক্ষে যোগ দিল। 
মর্দান আলি বুঝিল সিপাহী পক্ষে ষোগ দিলেই সর্বপ্রকার লাভের 
সম্ভাবনা । কিন্তু না, যে পক্ষে গুলাব পিং তাহার বিপরীতদিকে যোগ 
দিয়া সহত্রবার মৃত্যুও যে শ্রেয়ঃ। দে বলিয়া বেড়াইতে লাগিল 
তাহাদের তিনপুরুষ কোম্পানীর নিমক খাইয়! মানুষ, কোম্পানীর পক্ষ 
স্রে ছাড়িতে পারে না। গুশাব নিং সদ্লবলে তাহাকে তাড়া করিল, 


চাপাটি ও পদ্ঘ ৬৪ 


মর্দান আলি পলাইল। গুলাব সিং তাহার বাড়ী ঘর লুটিয়া লইয়া 
গেল এবং গ্রামের গ্রান্তে দাঁড়াইয়া বুকে চাপড় মারিতে মারিতে 


পলায়নপর নর্দান আলির উদ্দেশে বলিল--আও শালা বাদশ। 
আলমগীরকা-_ 


যে শব্দটি সে প্রয়োগ করিল তাহা সত্য বা সাহিত্য কোন কিছুর 
খাতিরেই লেখ। সম্ভব নয়। 


কিন্তু চিরদিন কাহারো৷ সমান যায় না। এবারে গুলাব সিং-এর 
পালাইবার পাল। আসিল। জেনারেল নীল ও হ্যাভলক কানপুরে 
আসিয়া উপস্থিত হইলে সিপাহীদের সৌভাগ্যে ভাটা পড়িল। একদল 
লোক লইয়া মর্দান আলি গুজরানপুরে ফিরিয়া আসিল, খবর পাইয়৷ 
গুলাব সিং পলাইল। মর্দান আলি তাহার বাড়ীঘর লুটিল, নিজের 
জিনিষ তো৷ পাইলই, উপরক্ত গুলাব দিং-এর শখের পিস্তলটি পাইল। 
তারপরে গ্রামের প্রান্তে দাড়ায় দূরগামী গুলাব সিংকে উদ্দেশ 
করিয়া বলিল--আও শাল। রণজিৎ মিংকা-_. 

নিরপেক্ষতার খাতিরে এ শব্দটিও বাদ দিতে বাধ্য হইলাম । 


এবার আবার মর্দান আলির পলাইবার পালা । জেনারেল নীল 
ও হ্যাভিলক সসৈন্যে লখনৌ যাত্রা করিলে কানপুর জেলা আবার 
অরাজক হইয়। উঠিল। মর্দান আলি গ্রাম ত্যাগ করিল, গুলাব সিং 
তাহার সখের পিস্তল উদ্ধার করিয়া বলিল--কবে শয়তানটাকে এর 
গুলিতে হত্যা ক'রতে পারবো | 

তারপরে যখন স্তার কলিন ক্যান্থেল প্রকাণ্ড সৈন্যবাহিনী লইয়া 
কানপুরে উপস্থিত হইল মর্দান আলি গ্রামে ফিরিল, গুলাব সিং 
পলাইল, এবার সঙ্গে পিস্তলটি লইতে ভূলিল না। মোট কথা গুলাব 
সিং ও মর্দান আলির পরিবর্তমান সৌভাগ্য ও দুর্ভাগ্যকে কোম্পানী 
ও সিপাহীপক্ষের ভাগ্যতুচী বলিয়া গ্রহণ করিলে ভুল হইবে না। 

এই ঘটনার প্রায় একবৎসর পরে মহারাণী ভিক্টোরিয়ার ঘোষণাবাণী 
পঠিত হইতে চলিয়াছে এবং তাহারাই ঠিক পূর্বাহ্থে গুলাব সিং গ্রামে 
ফিরিয়াছে আর মর্দান আলি তাহাকে গ্রেপ্তার করিতে চলিয়াছে। 


৩) 


মর্দান আলি সদল বলে গুলাব লিং-এর বাড়ীতে উপস্থিত হইল। 
তাহার দলের একজন নাকড়া বাজাইয়। দিয় হাকিল-_ 
“খাল্ক-ই-খুদা 
মুল্ক-ই-কোম্পানী বাহাদুর 
হুকম্-ই-সাহিবান আলি শান্‌। 


মর্দান আলি স্বয়ং হাকিল, এ শালে দরবাজা খোল। গুলাব সিং 
দরজা বন্ধ করিয়া ভিতরে বসিয়া আছে। কোম্পানী বাহাছ্বরের 
দোহাই দেওয়াতেও দরজ। যখন খুলিল না, মর্দান আগির ইঙ্গিতে 
সকলে মিলিয়! দরজ। ভাঙিয়া,.ফেলিল। তখন সকলে দেখিতে পাইল 
চারপায়াখানার উপরে গুলাব সিং নিবিকারভাবে বসিয়া! আছে, বাহিরে 
আমিবার কোন লক্ষণ তাহার নাই। 

মর্দান আলি বলিল--ওকে গ্রেপ্তার কর। 

কিন্ত সিংহকে গ্রেপ্তার করিতে তাহার গহ্বরে প্রবেশ করিবে কে? 

তখন অগত্যা মর্দীন আলি খোদ খোলা তলোয়ার হাতে ঘরের 
দিকে অগ্রসর হইল। গুলাব সিং তখনও নিবিকার নিশ্চল। কিন্ত 
তারপরেই এক কাণ্ড ঘটিল। মর্দান আলি দরজার চৌকাঠের কাছে 
পৌছিবামাত্র গুলাব পিং তাহার সেই পিস্তলটি তুলিয়া তাহাকে গুলি 
করিল, অব্যর্থ গুলি মর্দান আলির বক্ষ ভেদ করিল, কিন্তু সে মাটিতে 
পড়িবার আগে গুলাব সিং এর গায়ের উপর লাফাইয়৷ পড়িয়। 
তলোয়ারখানা আমূল তাহার বক্ষে বিঁধাইয়া দিল। এবার দুজনে 
পড়িল, একত্রে পড়িল, এক মৃত্যুর অতলে ছুই প্রতিঘন্দ্ী চিরকালের 
জন্য তলাইয়া গেল। 

এই ঘটনা এক লহমার মধ্যে ঘটিয়া গেল, মর্দান আলির সঙ্গীরা 
হতচকিত হইয়া সব দেখিল, তাহাদের করিবার কিছু ছিল না। 
কিছুক্ষণ পরে সম্বিৎ পাইলে তাহার! গুলাব সিং-এর বাড়ী লুট করিল, 

৫ 


চাপাটি ও পল্পস ৬৬ 


লুঠিবার বড় কিছু ছিল না। তারপরে মৃতদেহ ছুটি গরুর গাড়ীতে 
চাপাইয়। থানায় লইয়া আসিল। গুলাব সিং-এর পিস্তলটি সরকারী 
মালখানায় জম! হইয়া গেল। 


শু 


এই ঘটনার পরে কয়েক বছর চলিয়া গিয়াছে । কানপুরের 
পূর্বোক্ত ম্যাজিষ্রেট বিলাত যাত্রার প্রাক্কালে চল্লিশ টাক! মূল্যে গুলাব 
সিং-এর পিস্তলটি কিনিয়া লইল। পিস্তলটির সঙ্গে একটি রোমাঞ্চকর 
কাহিনী জড়িত বলিয়া জানিত, সেইজন্য এ বস্তটির প্রতি অনেক দিন 
হইতে তাহার লোভ ছিল। 

কানপুর পরিত্যাগের কয়েক দিন আগে টাকার তাহার বাংলোর 
বারান্দায় বসিয়া আছে এমন সময়ে এক শিখ যুবক আসিয়া সেলাম 
করিয়া দাড়াল, আর মৃত গুলাব সিং-এর পুত্র বলিয়। নিজ পরিচয় 
দিল। | 

টাকার বলিল--তোমার কি চাই? 

সে বলিল--সাহেব, আমার পৈতৃক পিস্তলটি দিন। 

সেটা তে৷ আমি চল্লিশ টাকায় কিনেছি। 

টাক! আমি ফেরৎ দিচ্ছি। 

এখন টাকা ফেরৎ পেলেই বা আমি দেব কেন? 

ওটা আমাদের পরিবারে ২।৩ পুরুষ আছে, অনেক স্মৃতি ওর সঙ্গে 
জড়িত। 

সেই জন্তেই তে। ওটা কিনেছি-_ 

শিখ যুবকটি বলিল, সাহেব ওটা কাছে রাখলে আপনার অমঙ্গল 
হবে 


কেমন ? 
এ পিস্তলটার উপরে অনেকের লোভ ছিল। কতজনে কতবার 


টুরি করেছে আর তাদের সকলেরই অমঙ্গল হয়েছে» শেষে তার! নিজে 


৬৭ চাপাটি ও পদ্ম 


এসে ফেরৎ দিয়ে গিয়েছে । পিতাজী বলতেন এ পিস্তল নিয়ে কেউ 
হজম করতে পারবে না। শেষবারের ঘটন! বলি সাহেব। মর্দান 
আলি আমাদের বাড়ী লুটে পিস্তলটা চুরি করেছিল । কিছুদিন পরে 
তার এক লায়েক ছেলে গুলিতে মারা পড়ে । মর্দান আলি বলত 
সিপাহীদের বন্দুকের গুলি, কিন্তু পিতাজী শুনে বলেছিলেন, এ 
পিস্তলের গুলিতেই সে মারা পড়েছে । কানপুর থেকে গুজরানপুরে 
ফিরবার পথে ছেলেটি মারা পড়ে। মুতদেহের পিরাণের জেবে 
পিস্তলটি পাওয়া গিয়েছিল । 

পিতাজী তখনই বলেছিলেন হয় পিস্তলের গুলি হঠাৎ ছুটে গিয়ে 
ছেলেটি মারা পড়েছে, নয়, মর্দান আলির কোন শকত্র পিস্তল কেড়ে 
নিয়ে তাকে খুন ক'রে ফেলে রেখে গিয়েছে । 

পিস্তলটি নিয়ে গেল না কেন? 

এ দিকের সকলেই পিস্তলটির ছুনম জানত। 

তোমগ%া পিস্তলটি ফেরৎ পেলে কি ক'রে? 

মর্দান আলি বাড়ী ছেড়ে পালালে আমর ওটা উদ্ধার ক'রে- 
'ছলাম ! 

তখন টাকার বলিল, ভোমার পিস্তলটি ফিরে দিতে পারলাম ন। 
বলে আমি হুঃখিত। 

যুবকটি আর একবার পিস্তলটির শোচনীয় এতিহ্া স্মরণ করাইয় 
দিয়া প্লান মুখে প্রস্থান কারল। 

টাকার বুঝিল লোকটি ধাঞ্প। দিয়! পিস্তলটি ফেরৎ লইবার চেষ্টায় 
আমিয়াছিল। 

অতঃপর টাকার বিলাত রওনা! হইয়া গেল এবং পার্কার নামে 
তাহার পরিচিত এক দিভিলিয়ান কানপুর জেলার ভার গ্রহণ করিল । 

পূর্বোক্ত ঘটনার বছর খানেক পরে পার্কার বিলাত হইতে একখানি 
পত্র ও একটি পুলিন্দা পাইল ! পত্রখানি টাকার কতৃকি লিখিত, 
টাকার লিখিতেছে যে পুলিন্দায় প্রেরিত পিস্তলটি যেন অবিলম্বে 
গুজরানপুরের মুত গুলাবদিং-এর পুত্রকে ফের দেওয়া হয়। টাকার 


চাপাটি ও পল্প ৬৮ 


সতর্ক করিয়া দিয়া লিখিয়াছে পার্কার যেন কোন অছিলাতেই 
পিস্তলটি ব্যবহার না করে এবং যত শীঘ্র সম্ভব উহ! মালিকের হাতে 
পৌছাইয়া দেয়। 

তারপর লিখিয়াছে--“আঁমার দেশে রওনা হওয়ার আগে গুলাব 
দিং-এর পুত্র এসে পিস্তলটি ফেরৎ চেয়েছিল । আমি উচিত মূল্যে 
কিনেছি এখন কেন ফেরৎ দেব বল্লে সে জানিয়েছিল যে ওদের বংশ 
ছাড়া অন্ত সকলের হাতেই পিস্তলটি শোচনীয় পরিণাম ঘটিয়েছে। 
থানাদার মর্দান আলির পুত্রেরও নাকি এ পিস্তলের গুলিতে মৃত্যু 
হয়েছিল। আমি স্বভাবতই তখন গল্পগুলোকে হয় ধাপ্পা না হয় 
কুসংস্কার মনে করেছিলাম । যুবকটি যাবার সময়ে বারংবার আমাকে 
সতর্ক করে দিয়েছিল, কিন্তু তখন কি তুবুদ্ধি যে চেপেছিল। 
পরে রক্তমূল্য দিতে হয়েছে । পিস্তুলটি আমার অন্তান্ত অস্ত্রপাঁতির 
সংগ্রহের সঙ্গে ডাইনিং রুমে রক্ষিত ছিল। একদিন জন্ধ্যাবেলায় 
ফিরে দেখি আমার ছোট ছেলে বাগানের মধ্যে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় 
নিহত হ'য়ে পড়ে আছে, পাশে পিস্তলটি। হয় তো খেলবার 
জন্যে নিয়ে গিয়েছিল । কিন্তু গুলি এলে! কোথেকে ? ভিতরেই কি 
ছিল? আমার তো মনে পড়ে না, মনে পড়ে যুবকটির সতর্কবাণী, 
“সাহেব এতে তোমার নিশ্চয় অমঙ্গল হবে ।” যাই হোক, নিবুদ্ধিতার 
রক্তমূল্য দিয়েছি, অশ্রমূল্য এখনো গড়াচ্ছে, আমার স্ত্রী শোকে 
পাগলপ্রায়। তুমি মালিকের সন্ধান ক'রে পিস্তলটি অবিলম্বে তাকে 
অবশ্য অবশ্য ফেরৎ দেবে ॥ 

পত্রখানি পড়িয়া পাকর্ণর কৌতুহলের সঙ্গে পিস্তলটি লক্ষ্য 
করিল---তাহাঁর মনে হইল কোন হিংভ্র প্রাগৈতিহাসিক জন্তর জীর্ণ 
চোয়াল জোড়। দিম! জিনিষটা প্রস্তুত। মালিকের সন্ধান করিবার 
; স্থা' তখনি ৫স জরুরি হুকুম জারি করিয়া দিল । * 


ক 772৬০109015 109101 02 09 19015--5 0. ৬,191612, 


ছায়া-বাহিনী 


প্রায় একশ বছর আগেকার কথ বলিতেছি । তখন সমস্ত উত্তর 
ভারতে সিপাহি-বিদ্রোহ চলিতেছে । বিদ্রোহের আর ১৮৫৭ সালের 
মে মাসে। আমরা তার কয়েক মাস পরের কথ। বলিতেছি। ইতি. 
মধ্যে বুটিশ বাহিনী দিল্লী পুনরাধিকার করিয়া! লইয়াছে, তাহার 
আগেই কানপুর তাহাদের হস্তগত হইয়াছে, বড় সহরের মধ্যে লখনৌ 
তখনও বিদ্রোহীগণ কড়ি অধিকৃত। স্যার কলিন ক্যাম্থবেল লখনৌ 
অধিকার করিবার উদ্দেশ্ঠে রওন! হইয়াছিল। বুটিশ বাহিনীর একটি 
শাখা এলাহাবাদ হইতে অপর একটি শাখা কানপুর হইতে লখনৌ যাত্র 
করিয়াছে। কানপুর হইতে লখনৌ অভিযাত্রী শাখাটিকে অবলম্বন 
করিয়াই আমাদের গল্প। এই শাখাটির সেনাপতি হোপগ্রাণ্ট। 
দলের মধ্যে আছে লেঃ রবার্টস, 'তরুণ বয়স, এদেশে নবাগত | 
লেঃ রবার্টন পরে বৃটিশ ভারতের কমাগ্ডার-ইন-চীফ হইয়াছিল । গল্পটি 
আংশিক ভাবে তাহার আত্মজীবনীতে আছে। 

এখন ১৮৫৮ সালের ফেব্রুয়ারী মাস। কানপুরে সসৈন্যে গঙ্গা পার 
হইয়া হোপগ্রাণ্ট সংবাদ পাইল যে পলাতক নানা সাহেব মিঞা গঞ্জ 
নামক একটি গ্রামে আশ্রয় লইয়াছে। মিঞ্াগঞ্জ ২০ মাইল দূরে। 
হোপগ্রাণ্ট স্থির করিল যে মিঞাগঞ্জ অধিকার করিতে হইবে। সম্ভব 
হইলে নান! সাহেবকেও বন্দী করিতে হইবে। ছুইদিন পরে হোপগ্রান্ট 
মিঞাগঞ্জের কাছে পৌছিল। 


মিঞ্াগঞ্জ শহর বা ছুর্গ নয়, একটি বড় গ্রামমাত্র। সেকালের 
অনেক গ্রামের মত এই গ্রামও প্রাচীর দ্বারা বেষ্টিত, গাথুনি কোথাও 
ইটের কোথাও মাটির, আর প্রাচীরের বাহিরে কতক অংশে একটি 
পরিখা, বর্ষাকালে জল থাকে, এখন শীতকালে কাদায় পূর্ণ । হোপগ্রাণ্ট 
আরও খবর পাইল ছুই হাজার সিপাহী গ্রামটিতে আশ্রয় লইয়াছে, 


চাপাটি ও পদ ৭০ 


তাহারাই প্রাচীরের উপরে কামান সাজাইয়! গ্রামটিকে তুর্তেছ্য করিয়! 
তুলিয়াছে, তাহারাও খবর পাইয়াছে যে বুটিশ সৈন্য আসন্ন । 

বৃটিশ সৈন্য বিভাগ কামানের গোলায় প্রাচীর ধ্বসাইয়! দিল, 
কিভাবে গ্রামটি দখল করিল, এসব চিত্তাকর্ষক কাহিনী হইলেও, আমা- 
দের গল্পের সঙ্গে তাহার প্রত্যক্ষ সম্বন্ধ না থাকায় আমরা সে কাহিনী 
বলিব ন। গ্রামটি দখল করিয়া হোপগ্রান্ট দেখিল দিপাহী কতক 
মরিয়াছে, কতক পলাইয়া গিয়াছে, পলাতকগণের সঙ্গে নান সাহেবও 
উধাও হইয়াছে । তখন বৃটিশ সেনাপতি স্থির করিল যে গ্রামটি এমন 
ভাবে ধংস করিতে হইবে যে সে গ্রামে বিদ্রোহীরা আর আশ্রয় না 
লইতে পারে। গ্রামের বড় বড় বাড়ী ঘর ও অবশিষ্ট প্রাচীর ধ্বংস 
করিবার ভার পড়িল লেঃ রবার্টসের উপরে । রবাটসের সঙ্গে ছিল 
তাহার আরদালী অঞ্জন তেওয়ারী। রবার্টস পরে যখন কমাণ্ডার- 
ইন-চীফ হইয়াছিলেন, তখনে। তাহার সঙ্গে অগ্জন তেওয়াঁরী ছিল, 
আরদালিরপে। 

বৃটিশ সৈন্য বাড়ী ঘর ভাঙিতেছিল, যেখানে প্রয়োজন কামান 
ব্যবহার করিতেছিল, রবার্টস্‌ ঘুরিয়৷ ঘুরিয়া তদারক করিতেছিল। 
এমন সময় একজন মুসলমান বৃদ্ধ আপিয়। তাহার পায়ের কাছে কীদিয়া 
পড়িল, বলিল, সাহেব আমার বাড়ীখানা রক্ষা কর, সব্ধবনাশের ভরা 
আর আর ভারী করে না। সে বলিতে লাগিল আর অঞ্জন তেওয়ারী 
সাহেবকে বুঝাইয়া দিতেছিল। 

সাহেব কালকে আমার মত স্থী কে ছিল? আজ আমার মত 
হনভাগ আর কে? কাল আমি পাঁচটি উপযুক্ত ছেলের বাপ ছিলাম, 
পরী দেখ তাদের মধ্যে তিনজন ওখানে উপুড় হয়ে পড়ে আছে, তাদের 
মুখের উপরে মাছি উড়ছে, আর ছুজন যে কোথায় গিয়েছে খোদা 
জানেন। 

রবার্টস তাঁকাইয়।৷ দেখিল একগাদা মুতদেহের একান্তে একত্রে 
তিনটি যুবকের মৃতদেহ পড়িয়া আছে, তাহাদের সর্ববাঙ্গ মাছিতে 
কালো । 


৭১ চাপাঁটি ও পদ 


রবার্টস মনে মনে শিহরিয়া উঠিল। চিত্রে ও কাব্যে যুদ্ধ অতিশয় 
রমণীয় ও চিত্তাকর্ষক, কিন্তু বাস্তবের সঙ্গে তাহ! মেলে কই ? 

বৃদ্ধ বলিতেছিলঃ সাহেব, আমার বাড়ীখান। ধ্বংস হলে আমার শেষ 
অবলম্বন যাবে, তখন আমি এ বয়সে কোখায় যাবো ? হুজুর, আমার 
বাড়ীখানা রক্ষা করো, খোদা তোমার ভালে! করবে, তুমি জঙ্গীলাট 
হবে। 

রব1টম তাহার বাড়ীখানা ধ্বংস ন। করিতে আদেশ দিল । 

তখন বুদ্ধ মাটির উপরে জানু পাতিয়! বসিয়া হাত আকাশের দিকে 
তুলিয়া! অবোধ্য ভাষায় তারন্বরে কি যেন বলিয়া! গেল। 

বোধকরি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করিল, তবে তাহা খোদার উদ্দেশে ন! 
ভারতের জঙ্গীলাটের উদ্দেশে তাহ! কেহ বুঝিল না, তবে সবাই দেখিল 
যে তখন তাহার বলিচিহ্কিত গাল বাহিয়। তরঙ্গিত অশ্রু বহিতেছে। 


রবার্টস স্থান পরিত্যাগে উদ্যত হইলে বৃদ্ধ তাহাকে একটু অপেক্ষা 
করিতে বলিয়া বাড়ীর ভিতরে টুকিল এবং এক লহম1 পরে বাহিরে 
আসিয়া বলিল--সাহেব এই পাঁথরখানা! কাছে রেখে দাও, বিপদে 
আপদে তোমাকে রক্ষা করবে । 

সকলে দেখিল তাহার প্রসারিত করতলের উপরে জামের বিচির 
আকারের একটি ছোট কালো পাথর। 

বৃদ্ধ বলিল--সাহেব এর নাম “মোল্লাকি পাথর” । এই পাথরের 
অনেক কুদরৎ। 

সে আরও বলিল--এই পাথর যদি সঙ্গে থাকে আর বিপদের 
মুখে 'মোল্লাকি পাথর” যদি স্মরণ করা যায়, তবে সঙ্গে সঙ্গে সব 
মুক্কিলের আসান হয়। 

তারপর সে পাথরটার এক সুদীর্ঘ ইতিহাস বলিয়া গেল। কোন্‌ 
প্রসিদ্ধ মোল্লা প্রথমে কাহাকে দিয়াছিল, কাহার কত সঙ্কট উদ্ধার 
হইয়াছে, তারপর কি ভাবে উহা। তাহার কাছে আসিল ইত্যাদি । 
তখনও তাহার প্রসারিত করতলের উপরে কালো! পাথরট! চকচক 
করিতেছিল ! 


গপাটি ও পপ ৭২ 


বলাবাস্থল্য রবার্টসের মোল্লাক্কি পাথরের উপরে বিশ্বাস হইবার 
কোনে কারণ ছিল না, ভবে এ লামান্ত উপহারটা না লইলে পাছে 


বৃদ্ধ মনে ছুঃখ পায় তাই সে অঞ্জন তেওয়ারীকে উহ! লইতে ইঙ্গিত 
করিল। 


তেওয়ারী উহ৷ সাগ্রহে লইয়৷ সযত্বে কুত্তির জেবের মধ্যে রাখিয়| 


দিল। 


ইহাই গল্পটির আদিপর্র্ব। 


তারপর দিন তিনেক অতিবাহিত হইয়াছে। হোপগ্রান্টের 
সৈশ্বাহিনী লখনৌ দ্রিকে আরও খানিকটা অগ্রসর হইয়াছে। 

সেদিন মেঘনিমুক্ত শীতের সকাল, তাজ। রৌদ্রে মাঠ ভরিয়া 
'গিয়াছে, যত দূর দেখা যায় রৌদ্রে ভাজা অবাধ মাঠ তার আর যেন 
শেষ নাই, কেবল মাঝে মাঝে এখানে ওখানে আমের বাগান। লেঃ 
ধা, ক্যাপ্টেন ওয়াটসন ও অঞ্জন তেওয়ারী মূল বাহিনী হইতে 
কিছু পিছনে পড়িয়াছিল, তাহাদের অশ্ব যথেচ্ছ মন্দ গতিতে 
চলিয়াছিল, তাড়া! ছিল ন! তাই তাড়াতাড়ি ছিল না । 

এমন সময়ে ওয়াটসন বলিয়া উঠিল, রবার্টস এ দেখ একটা 
নীল গাই। 

তাই তো চল দেখ! যাক পাওয়া যায় কিনা । তেওয়ারী কহিল-_ 
হুজুর ওট1 গাই গোরু, মারলে দেবতা রাঁগ করবেন। 

রবাটস বলিল--গোরু নয়, হরিণ, তোমরা ভুলক্রমে গোরু বলো, 
আর সব দেশে ওকে হরিণ বলে । 

এই বলিয়া রবার্ট এবং ওয়াটসন ঘোড়। ছুটাইয়। দিল, অগত্যা 
ভেওয়ারীকেও ছুটিতে হইল। 

নীল গাই যে হরিণ তাহাতে সন্দেহ নাই, গোরুর লাধ্য কি এমন 
ধাতাসের 'আগে ছোটে। কখনও তিনজনে হরিণটির কাছে গিয়া পড়ে, 
আবার মুহুতে'র মধ্যে যেন মন্ত্রবলে কোন্‌ দূর দেশে চলিয়া যায়। 


ণ৩ চাপাটি ও পক্ক 


এমনি ভাবে ঘণ্টা ছুই চলিল, পোয়ার থামিল, ঘোড়া থামিল, 
তাহার পর কোথা হইতে কোথায় আসিয়! পড়িল কিন্তু নীল গাইয়ের 
নাগাল আর মিলিল না । নীল গাইটা মাঠের যেদিকে গিয়াছে 
সেখানটায় দৃষ্টি রাখিয়া তিনজন একটু থামিয়াছে, ঘোড়ার পক্ষে এই 
বিশ্রামটুকুর প্রয়োজন ছিল এমন সময়ে ওয়াটসন চীৎকার করিয়া 
উঠিল, রবার্টস এ দেখ। 

তিনজনে ঘাড় ফিরাইয়। দেখিল উত্তর দিকের দিগন্ত জুড়িয়! 
প্রকাণ্ড একটি অশ্ববাহিনী--সিপাহীদের | 

পালাও, পালাও । 

তিন জনে বিপরীতদিকে ঘোড়া ছুটাইয়া দিল। 

তেওয়ারী বলিল--হুজুর, আমি আগেই বলেছিলাম দেবতার! রাগ 
করেন। 

তাহারা তিনজন, সিপাহীদের অশ্বারোহী অনেক । কত হইবে 
পাঁচশো না হাজার । তিনজনের পক্ষে পাচশোর অনেক কমই যথেষ্ট । 

ইহাদের ঘোড়া ছুই ঘণ্টা ছুটিয়া ক্লান্ত । এখন সে কথ৷ ভাবিয়। 
আর লাভ নাই, তাহারা পরস্পর ঘোড়ার পেটে জুতার কীট। বিধাইয়! 
দিতে লাগিল। ঘোড়াগচলাও যেন আসন্ন বিপদ বুঝিয়াছে, প্রাণপণে 
ছুটিতেছে। 

শত্রবাহিনী ক্রমেই কাছে আসিয়া পড়িতেছে। পাঁচশোর চেয়ে 
হাজারের কাছে হইবার সম্ভাবনা । তিনজনে একবার ঘাড় ফিরাইয়া 
দেখে, তাহাতে একটু সময় যায়, গ ভাবে না৷ দেখাই উচিত, কিন্তু না 
দেখিয়াও পার! যায় কই ! 

এবার শক্র সৈম্ত একশ গজের মধ্যে আসিয়। পড়িয়াছে, অবধারিত 
মৃত্যু । 

তখন রবাটণ্স্‌ বলিল, তিনজনে আর একত্র থেকে লাভ নেই, তিন 
জনে তিন দিকে ছোট, হয়তে। বা কেউ রক্ষা পেতে পারো । তিনজনে 
পরস্পরের দিকে শেষ বারের মত তাকাইয়৷ লইয়া! প্রাণপণে ঘোড়ার 
পেটে কাটা বিধাইয়া দিল, সিপাহীদের হাতে বিপক্ষের কি মর্মান্তিক 


চাপাটি ও পদ্প ৭8 


দশ! হয়, তিনজনে তাহার বহু ঘটনার সাক্ষী । নাঃ আজ আর রক্ষা 
নাই। এবার বোধ করি উহারা পঞ্চাশ গজের মধ্যে আসিয়া 
পড়িয়াছে। এখনি খোলা তরোয়াল সবেগে ঘাড়ের উপর আসিয়া 
পড়িবে । 

এমন সময়ে তেওয়ারির কি মনে হইল জানি না, সে জোরে 
চিৎকার করিয়া উঠিল--মোল্লাকি পথথর ! মোল্লাকি পথথর ! 
এমন বিপদের মধ্যেও রবাটস ন1 হাপিয়! পারিল না। কিন্তু একি 

হুজুর খোদার কুদরৎ। ছুশমন কোথায় গেল! 

--তাইতো৷ একি হ'ল! 

_জাঁছু না চোখের ভূল। 

তিনজনেই দেখিল, তেওয়ারী সকলের আগে দেখিয়াছে, শত্রু 
সৈম্তর চিহ্নমাত্র নাই, সমস্ত বাহিনীটা দ্বিধাবিভক্ত পৃথিবীর গর্ডে 
যেন ঢুকিয়! গিয়াছে । তিনজনে ঘোড়া থামাইয়া দাড়াইল। 

তাইতো ব্যাপার কি? চোখের ভূল হইতেই পারে না, এক সঙ্গে 
তিনজনের এমন ভূল হয় না। 

ওয়াটুসন বলিল, হিন্দুস্থানের জাছু । 

রবাট স্‌বলিল-_-মরীচিক1 । 

মরীচিক1 যদি হয় তবে আর দেখা দিচ্ছে না কেন ? 

জাহুতে বিশ্বাম করিলে কাজ চলে না। 

তেওয়ারী বলিল, হুজুর দেবতারা রাগ করে ছিলেন, মোল্লাকি 
পথখথর বাঁচিয়ে দিয়েছে । 

মোট কথা ঘটনাঁটি সে সময়ে যেমন রহস্যময় ছিল শেষ পর্যস্ত 
তেমনি থাকিয়। গেল, সকলের বিশ্বামযোগ্য দিদ্ধান্ত আর হইল না। 


৩ 


তারপর ত্রিশ বছর চলিয়া গিয়াছে। মিঞ্াগঞ্জের বৃদ্ধের 
ভবিষ্দ্বানী সফল করিয়া তরুণ রবার্টম এখন হিন্দুস্থানের বৃদ্ধ 


ণ৫  চাপাটি ও পদ 


জঙ্গীলাট ৷ সেদিনের ঘটনা বিবূত করিতে বসিলে লর্ড রবার্টস ব্যাপার- 
টাকে মরীচিক বলিয়া! উড়াইয়। দেয়! 

কিন্তু সন্ধ্যাবেল। জঙ্গীলাটের অল্পবয়স্ক আরদালী চাপরাশী মহলে 
বৃদ্ধ অগ্জন তেওয়ারী যেদিন এই গল্পটা! বলে, সবাই জিজ্ঞাসা করে, 
চাঁচাজী ব্যাপার কি? 

তেওয়ারী কোন কথা ন1 বলিয়। অভ্যস্ত মতো ধীরে ধীরে উঠিয়। 
পুরাতন টেবিলের দেরাজ খুলিয়া একটি ছোট কালো পাথর বাহির 
করিয়া! প্রসারিত করতলের উপরে সযত্বে রক্ষা করিয়৷ বলিয়া উঠে-- 
মোল্লাকি পথ থর। 

যুবকের দল মুখ টিপিয়া হাসে, তেওয়ারীর চোখে তাহা পড়ে না, 
ঘরের আলো নিস্তেজ, আর তাহার চোখের আলোও ক্রমে নিস্তেজ 
হইয়! আসিতেছে। 


অড. 


মাদলিন, এই সময়ে চিঠটুকু সেরে নাও এখন ওরা কেউ নেই। 

চেষ্টাতো! করছি মিসেস অর। কিন্তু যে রকম কাগজ আর 
লেখনী-_ 

কেন, তোমার কাগজ তো মন্দ নয়, বাইবেলের শাদা পৃষ্ঠাটুকু তে! 
ভালই। 

কিন্ত লেখনী! কাঠি পুড়িয়ে কালো করে নেওয়া । কখনো 
অক্ষর পড়ে না, কখনো বা যুচ করে ভেঙে যায়। হাসিও পায় কান্নাও 
আমে। 

কিআর করবে? যেমন অবস্থা এর চেয়ে ভালে! পাবে কোথায়? 
এতদিন যে ওরা মেরে ফেলে নি এই কি যথেষ্ট নয় ? 

মেরে ফেললে এর চেয়ে কি খারাপ হত? তাছাড়া সে সময় তো 
যায় নি। 

বোধ হয় গিয়েছে, কাল রাতে বোধ করি কামানের শব শুনেছি। 

বর্ষাকাল, মেঘের ডাক মিসেস অর। 


কিযে বলো মাদলিন! এত বয়স হ'ল, মেঘের ডাক আর 
কামানের আওয়াজের তফাৎ বুঝবো না ! নিশ্যয় জেনে। ও কোম্পানীর 
কামান, আমাদের উদ্ধারের জন্ত ফৌজ আসছে। 

সেই আশা করতে করতেই তো! তিন মাস গেল। আমার আর 
আশ! করতে ভরস। হয় না। 

তবে ভগবানের উপরে ভরসা করো। 

তার চেয়ে চিিটুকু সেরে ফেলা যাক। 

মাদলিন চিঠি লিখিতে লাগিল, মিসেস অর চুপ করিল। 

কিছুক্ষণ পরে মিসেস অর আবার মুখ খুলিল--বলিল, মাদলিন 
ফরাসী ভাষায় লিখো, ইংরাজীতে লিখলে সিপাহীদের হাতে পড়লে 


বুঝতে পারবে। 


৭৭ চাপাটি ও পদ্ল 


সিপাহীদের হাতে ছাড়া পাঠাবে কি উপায়ে? 

সেকথা সত্যি; কিন্তু ওদের মধ্যেও তো ভালো লোক আছে, 
যেমন এ ওয়াজেদ আলি। 

ওয়াজেদ আলির নাম শুনিয়া মাঁদলিন হাপিল। 


কিছুক্ষণ পরেই আবার মিসেদ অর বলিয়। উঠিল, লুকোও, চিঠি 
লুকোও এ শোনো পায়ের শব্দ । 


মাদল্গিন কাঁন পাতিয়া। শুনিল, সত্যই পায়ের শব্ধ, খড়ের গাদার 
তলে কাগজের টুকরাখানা ও পোড়া কাট! সযত্বে রাখিয়া দিল । 


ওয়াজেদ আলি প্রবেশ করিল। মিসেস অর এক গাল হাসিয়! 
বলিল-_-কি দারোগ। সাহেব, শহরের খবর কি? 


ওয়াজেদ আলি মাদলিনের দিকে তাঁকাইয়া মিসেস অরের প্রশ্মের 
উত্তর দির্ল--খবর ভালো । বোধ করি কোম্পানীর ফৌজ কাছাকাছি 
এসে পড়েছে, শহরের অনেকে দক্ষিণ দিকে কামানের আওয়াজ শুনতে 
পেয়েছে । 

কেমন মাদলিন আমি বলি নি? 


ওয়াজেদ আলি, আমাদের এক টুকরো চিঠি কোম্পানীর ফৌজের 
হাতে পৌছে দেবে ? 

আদেশ ও অনুরোধের মাঝামাঝি স্বরে কথাগুলি বলিয়া! তাহার 
দিকে তাকাইয়! মাদলিন হাদিল, তেমন হাদি যোল বছরের নীচে ত্রিশ 
বছরের উপরে কোন সুন্দরী মেয়েতেও হাসিতে পারে না। 

তাহার কাছে আসিয়া স্বর নীচু করিয়া ওয়াজেদ আলি বলিল, 
আপনার কোন্‌ কথা রাখি নি, জান কবুল করে রেখেছি, এখন 
সিপাহীরা আমাকে সন্দেহ করতে শুরু করেছে। 

তোমার কোঁন বিপদ ঘটবে না তো ওয়াজেদ আলি ? 

আপনাদের বিপদ ঘটবার আগে নয়। 

এবার রক্ষা পেলে তোমাকে ভুলবো না। এই বলিয়া ছজগে 
হ1সিল। 


চাপাটি ও পদ্ম ৭৮ 


মিসেস অর সে হাসি লক্ষ্য করিল । সে প্রাচীন হইয়া পড়িলেও এ 
হাঁসির অর্থ যে না বোঝে, তাহা নয়। বয়সকালে মে এইরকম হাসি 
কত হাসিয়াছে। ইংরেজ তরুণ-তরুণীর মধ্যে এই রকম হাঁনি-বিনিময় 
হইতে সে দেখিয়াছে। কিন্তু একজন নেটিভের সঙ্গে এই রকম হাসি- 
বিনিময়? অন্য সময় হইলে রাগে তাহার গ। জ্বলিত | কিন্তু এখন 
হয়তো এ হামির ক্ষীণ স্ুত্রেই তাহাদের জীবন ঝুলিয়া আছে । সে 
ইতিমধ্যেই বুঝিতে পারিয়াছে ওয়াজেদ আলির তাহাদের প্রতি দয়ার 
কারণ জীবে প্রেম নয়, তাহার মতে। প্রাচীনাকে রক্ষাও নয়, অন্য 
কিছু। তাহার মনট। কেমন বিকল হইয়া গেল, খড়ের আটির উপাধান 
মাথার নীচে টানিয়া লইয় সে শুইয়। পড়িল। তাহার মন ত্রিশ-চল্লিশ 
বছর আগে চলিয়। গিয়াছে, লখনৌ শহর, কাইজারবাগের বন্দীশাল। 
কোথায় মিলাইয়া গেল। ইংলগু, কেণ্ট প্রদেশের ক্ষুদ্র এক গ্রাম, 
ঘাসে-ঢাকা মাঠের মধ্যে ফুল-ঝরা গাছের তলায় তরুণী প। ছড়াইয় 
উপবিষ্ট, পাশে তরুণ যুবক অর। 

যুবক বলিতেছে, আমার আশা কি সফল হবে না কেটি? 

তরুণী নীরবে হাসিল। 

হাসির মতে। এমন ভাষ। থাকিতে মানুষে কতকগুলে। বাজে কথা 
বলিতে যায় কেন ? 


সই, 


' তিনমাস আগে সিপাহী বিদ্রোহ বাধিয়। উঠিলে মাদলিন জ্যাকসন 
ও মিসেস অর আরও সাতজন নরনারীর সঙ্গে যখন সীতাপুর ত্যাগ 
করিয়াছিল, ভাবিয়াছিল ব্যাপারট। ছু-এক সপ্তাহেই মিটিয়া যা ইবে। 
অভ্যস্ত জীবনযাত্রার মধ্যে অনিরিষ্ট পথযাত্রাকে তাহাদের একপ্রকার 
পিকনিক বলিয়া মনে হইয়াছিল। বন্দিগড়ের রাজার আশ্রয় তাহারা 
গ্রহণ করিয়াছিল। রাজ! প্রথমে তাহাদের আদরযত্ব করিত ; কিন্তু 
কোম্পানীর শাসন যতই শিথিল হইয়া আমিতে লাগিল, তাহার ব্যব- 


৭৯ চাপাটি ও পঞ্স 


হারও কঠোর হইয়া উঠিল। অবশেষে একদিন রাজা জানাইল যে, 
এখানে আর তাহাদের থাক নিরাপদ নয়, এক প্রতিবেশী রাজার রাজ- 
ধানীতে যাত্রা! করিতে হইবে। খান ছুই গরুর গাড়ীতে চাপিয়া৷ মেই 
নয়জন ইংরেজ নরনারী যাত্রা করিল, সম্মুখে বন্দুকধারী দেড়শ সিপাই, 
একটা কামান, পিছনে বন্দুকধারী দেড়শ সিপাই, একটা কামান। সেই 
ক্ষুদ্র দলটি অচিরে বুঝিতে পারিল যে, তাহারা বন্দী। কিন্তু তাহাদের 
গন্তব্য স্থান কোথায়? অচিরে তাহাও প্রকাশ পাইল-লখ নৌ শহর । 
লখনৌ তখন বিদ্রোহীদের আয়ত্তে এবং এঁ অঞ্চলে সিপাহীদের প্রধান 
আড্ডা । অবশেষে অশেষ কষ্ট ও অপমান সহ্য করিয়! মাসখানেক পরে 
তাহারা লখনৌ শহরে আসিয়া উপস্থিত হইল, আর কাইজারবাগের 
অন্ধকার এই ঘরটিতে বন্দী-জীবন আরম্ত করিল । খড়ের গাদা শয্যা, 
সারাদিনে একমুঠা অন্নখাগ্ভ । এত কষ্ট, এত গ্লানি, এত অপমান, তবু 
কেহ মরিল না। মানুষের প্রাণ বড় কঠিন। ছুঃন্বপ্ের মতে। এসব 
মাদলিনের মনে পড়িয়া যায় তখন সে চোখ বুজিয়া, ছু হাতে মুখ ঢাকিয়। 
পড়িয়া থাকে । হঠাৎ পদশব্দ তাকাইয়। দেখিতে পায় রক্ষী ওয়াজেদ 
আলি তাহার কাছে দাঁড়াইয়া আছে। প্রথম প্রথম তাহার বিরক্তিবোধ 
হইত, এখন ভালোই লাগে । অভ্যাসে শয়তানকেও সন্ হইয়া যায়, 
ওয়াজেদ আলি সুপুরুষ, যুবক আর দয়াশীল। মাদলিন প্রথমে মনে 
করিত এই রক্ষী যুবকের সঙ্গে একটু হাসিয়া কথ! বলিতে ক্ষতি কি, 
তাহাতে সকলের বন্দীজীবন হয়তো একটু স্ুসহ হইবে; কিন্তু মন কি 
প্রয়োজনের অধীন? মন লইয়া খেলাইতে গেলে তাহার ছোবল 
কোথায় পড়িবে, কে বলিতে পারে? কিন্তু এসব তে। পরের কথা, 
আগের কথা আগে । 


৯১০০. 


মাদলিন চোখ বুজিয়! পড়িয়। থাকে, সক্কল্প করে যে হঃখণদিনের 
বিভীবিকা স্মরণ করিবে না, কিন্তু সাধ্য কি! অবাঞ্ছিত মাছিটা যেমন 


চাপাটি ও পল্প ৮৬ 


ঘুরিয়া ফিরিয়া মুখের উপরে আসিয়া বনে, তেমনি ছঃসময়ের স্বৃতি 
ঘ্ুরিয়! ঘুরিয়া মনের মধ্যে উদিত হইতে থাকে । 

মাদদিনের বাপ-ম! থাকিত মীরাটে, সে সীতাপুরে মিসেস অরের 
বাড়িতে কয়েকদিনের জন্য বেড়াইতে আসিয়াছিল, এমন সময়ে সিপাহীরা 
ক্ষেপিয়া ওঠে । হঠাৎ সীতাপুর পরিত্যাগ করিতে হইল, বাপ-মায়ের 

ংবাদ তারপরে আর সে পায় নাই। 

বন্দিগড়ের রাজবাড়ি প্রকাণ্ড, চারদিকে তার প্রশস্ত পরিখা । গরুর 
গাড়িতে চড়িয়া নিরুদ্দেশ যাত্রা, সামনে পিছনে সশস্ত্র িপাই, তাহাদের 
মুখে কি বিদ্বেষ! সেই সব মুখে সে নিজেদের বিরূপ ভাগ্যলিপি 
পড়িয়াছিল। মাঝে মাঝে গ্রাম, কৌতৃনলী জনতা, কোথাও বা উদাসীন 
কোথাও বা হিংত্র । বাত্রিবেলায় সে ভয়ে ভয়ে থাকিত, কিন্ত না অন্তত 
সে বিপদটা ঘটে নাই । দূরে লখনৌ শহরের সৌধচুড়া। ক্রমে সেখানে 
আসিয়। তাহার! পৌছিল। তারপরে কাইজারবাগের বন্দীশালা, অন্ধকার, 
বৃহং দরজায় সশস্ত্র পাহারা । খড়ের গাদায় শুইয়া বসিয়। দিন আর 
কাটে না, একটানা, একঘেয়ে ; অন্ধকার এবং অধিকতর অন্ধকারের 
দ্বারা বিশিষ্ট দ্িন-রাত্রির পালা । একদিন সকালে একদল সিপাহী 
আসিয়। তাহাদের সঙ্গী ও যথার্থ রক্ষক পুরুষ ছয়জনকে হাত বাঁধিয়া 
লইয়া গেল। কোথায়? কেহ জানে না। কেন? জেনারেলের হুকুম । 
লিপাহী জেনারেলের । কিছুক্ষণ পরে একসঙ্গে অনেকগুলো বন্দুকের 
আওয়াজ। তবে কি? নিশ্চয়ই। কিন্তু সিপাহীর৷ যে বলিয়াছিল 
সাহেবদের ক্ষতি হইবে না। সিপাহীদের কথায় বিশ্বামকি? বন্দীর! 
আর ফিরিল না । ওর পরে আর ফেরে কি উপায়ে? মাদলিনের বুকের 
মধ্যে নিশ্বাস ঠেলিয়। ওঠে । কিন্তু এ কচি মেয়ে সোফিটাকে বাঁচাইবার 
উপায় কি? ও যেখাগ্ঠ বিনা মারা পড়িবে, শুকনো রুটি আর ভাত 
কি ওর সয়? তখনি আর একখান। মুখ ওর মনে পড়ে, সে মুখে বিদ্বেষ 
বা বিশ্বাসঘাতকতার চিহু নাই, বরঞ্চ যেন-*****ওয়াজেদ আলির মুখ । 
লোকট। এক সময়ে নবাব সরকারে দারোগ। ছিল, সিপাহীদের বিশ্বাস- 
ভাজন। মাদলিনের কেমন যেন বিশ্বাস হইয়াছিল এর উপরে আস্থ। 


৮১ চা1গটি ও পঙ্প 


স্থাপন কর! যায়। বুড়ি মিসেস অর কতই ন! নিষেধ করিয়াছিল । 
বুড়ির গেখ কি তরুণীর চোখের মতো! সব কিছু দেখিতে পায় ? মাদ।লন 
নিজেই প্রস্তাব করিয়াছিল, সোফিকে বাঁচানো যায় কিনা? 
ওয়াজেদ আলি বলিয়াছিল, কেন এখানে থাকলে ক্ষতি কি? 
আমাদের যদি মেরে ফেলে ? 
কে মারবে? 
সিপাহীর!। 
আমি নিজেও তো! একজন সিপাহী । 
পার ঠোঁট ছুখানিতে রাঁঙ। একটি দাঁড়িম্বের বীজ বিকশিত করিয়া 
মাদলিন বলিল-_দারোগ। সাহেব, হুকুম হলে তুমিই মারবে। 
এখন আর সে দারোগ। সাহেব বলে না) নাম ধরিয়া ডাকে। 
ওয়াজেদ আলি বলে, বেমাইনী হুকুম মানবো কেন! 
নইলে গর্দান যাবে যে! 
একবার নোকরি গিয়েছে, এবারে না হয় গর্দান যাবে। 
নোকরি গেল কেন? 
সে অনেক কথা, আর একদিন বলবো । 
ক্রমে এই ছুই জনের ঘনিষ্ঠতা বাড়ে, মিসেস অর ব্যাপারটা 
একেবারে বরদাস্ত করিতে পারে না, বলে--মাদলিনঃ এ কি রকম 
আচরণ? একজন “বৃটিশার' হয়ে একজন নেটিভের সঙ্গে মেলামেশা । 
ছিঃ! 
মাদলিন বলে ওকে একটু খুশী রাখলে ক্ষতি কি? তাছাড়া 
লোকট? তে। মন্দ নয়। 
সিপাহী আবার ভালো । 
সব ইংরেজ কি ভালো? 
আবার আর এক সময়ে গল্পের ছিন্নসুত্র জোড়া লাগে। লখনৌর 
নবাবদের কথা ওয়াজেদ আলির মুখে শোনে মাদলিন। শেষ নবাবের 
নাম ওয়াজেদ আলি শুনিবার পরে মাদলিন মাঝে মাঝে ঠাট্টা করিয়। 
তাহাকে নবাব সাহেব বলিয়। ভাকিত। 
৬ 


চাপাটি ও পঞ্প ৫ 


ওয়াজেদ আলি বঙ্গিত, মেম সাহেবের মরজি হ'লে কি না সম্ভব 
হয়, একেবারে দারোগ। সাহেব থেকে নবাব সাহেব। 


ওয়াজেদ আলির কাছে সে নবাবের চিড়িয়াখানার কথ। শুনিত, 
জন্ত জানোয়ারের লড়াইয়ের কথা শুনিত, নবাবদের অত্যাচার ও 
বদান্ততার কথা৷ শুনিত, একজন ইংরেঞ্জ ক্ষৌরকার কিভাবে নবাবদের 
দক্ষিণহস্ত হইয়া লক্ষ লক্ষ টাক! উপার্জন করিয়া দেশে ফিরিয়৷ 
গিয়াছিল শুনিত, মাদলিনের বিস্ময়ের অন্ত থাকিত না। পাশে 
বসিয়া! মিসেস অরও শুনিত কিন্তু মাদলিন কখনো তাহার চোখে 
সমর্থন খু'জিয় পায় নাই। 


ওয়াজেদ আলি রাজী হইল, বলিল, সোফিকে লুকিয়ে নিয়ে গিয়ে 
এক দোস্তর বাড়ীতে রেখে দেবো। 

তারপরে? 

কোম্পানীর ফৌজ এসে লখনৌ অধিকার করলে তাকে বের 
করলে হবে । 

আমাদের জয় সম্বন্ধে তোমার দেখছি কোন সন্দেহ নেই। 


কারই ব৷ সন্দেহ আছে? প্রতিদিন দলে দলে সিপাহীর! শহর 
ছেড়ে নিজ নিজ গ্রামে চলে যাচ্ছে । 

কেন? 

_ গুজব এই যে জেনারেল হ্যাভলক কানপুরে এসে পৌছেছে। 

বটে। 

তারপরে একদিন সোফির মুখ হাত প৷ ভূষে মাখাইয়া কালে! 
রঙ করিয়॥ ফেল! হয়। একজন মুসলমান স্ত্রীলোক সোফিকে কাপড়ে 
জড়াইয়া তারম্বরে কাদিতে কাদিতে রওন। হইয়। যায়--মেয়ে মরিয়াছে 
কবর দিতে লইয়। যাওয়। হইতেছে । 

মিসেস অরের সন্দেহ কিছুতেই যায় না» বলে মেয়েটারও পুরুষ- 
গুলোর দশ। হবে। 

এখানে থাকলেও ত্রমে তাই হতো । 


৮৩ চাপাটি ও পদ্ম 


কেন আমরা কি বেঁচে নেই? 

কদিন আছি কে জানে । 

কেন? ও 

হয়তো পুরুষগুলোর দশ! হবে 

হোক এমন কি মন্দ। 

মিসেস অর বদমেজাজী কিন্তু ভীরু নয়। 


শু 


হঠাৎ ওয়াজেদ আলি ছুটিয়া আসিয়া বলে, মেম সাহেব চিঠিখানা 
দাও । 

কেন? 

কেন আর কি? স্ুসংবাদ। কোম্পানীর ফৌজ আলমবাগে 
এসে পৌছেছে। 

আলমবাগ কতদুরে ? 

কোম্পানীর ফৌজ ঠিক জানো তো? 

সব ঠিক, এখন চিঠিখান। দাও বেহাত যেন না হয়। 

মিসেস অরের সন্দেহ কিছুতেই যায় না। 

ওয়াজেদ আলি সেই চিঠিখানা লইয়! প্রস্থান করে। মিসেস অর 
বলে- দেখো কার চিঠি কোথায় পৌছয়। মরে গেলেও সিপাইকে 
বিশ্বাস করতে নেই। 

ভাঙা নৌকায় করে কেউ কি কখনে! নদী পার হয় নি? 

ঘণ্টা ছুয়েকের মধ্যেই ভারী বুট জুতার শব্দ ওঠে, সঙ্গে সঙ্গে 
প্রবেশ করে কান্তেন মেনিল আর লেঃ বগ.ল, সঙ্গে একদল গর্থা। 
ওয়াজেদ আলির পত্রবাহকের আলমবাগ পধন্ত যাওয়ার প্রয়োজন 
হয় নাই, মাঝপথে এদের সাক্ষাৎ পাইয়াছিল। 

মেনিল আর বগল একযোগে বলিয়া ওঠে, গভ্‌ সেভ দি কুইন। 
আশ করি সমস্ত কুশল । 


চাপাটি ও পদ্ম ৮৪ 


ধন্যবাদ । 
মেনিল শুধায়, এ লোৌকট। কে? 
মাদলিন বলে, ওয়াজেদ আলি আমাদের রক্ষক, বড় ভালে। লোক । 


মেনিল ওয়াজেদ আলিকে বলে, একখান পাঙ্ধী জোগাড় করে 
আনো । 


পান্ী পাওয়। যাবে কিন্তু বেহার! ? 

বেহারার কোন প্রয়োজন নেই, আমাদের গুর্খ। সৈন্যরা আছে। 

অল্পক্ষণের মধ্যেই ওয়াজেদ আলি পাক্কী সংগ্রহ করিয়া আনে। 
মেনিলের নির্দেশে মাদলিন ও মিসেস অর পান্ধীতে চাপে । মেনিল 
গুর্থাদের নির্দেশ দেয় আলমবাগ, জেনারেল উট্রামের ক্যাম্প। 

পান্কীতে উঠিবার আগে মিনেস অর বিদ্বেষপূর্ণ দৃষ্টিতে ওয়াজেদ 
আলিকে দগ্ধ করিয়া দেয়, কুলে উঠিয়াছে এখন আর কৃতজ্ঞতার 
অভিনয় করিয়া কি ফল। 

পান্ধীর ভিতর হইতে মাদলিন হাত বাড়াইয়া ওয়াজেদ আলির 
হাতখান। গ্রহণ করে, একটু চাপ দেয়, বিদায়-বেদনাকে পরিহাসের 
তির্ধক পথে চালন। করিয়। দিয়া বলে, আবার কবে দেখ হবে নবাব 
সাহেব, কি দেখ করবে তো, অবশ্য দেখা ক'রো। 


হাতের এ চাপটুকু মিসের অরের নজর এড়ায় না, চাপা স্বরে 
বলে-- শেম। 

মার্চ অন্‌। 

পাক্কী রওন! হয় । 


ওয়াজেদ আলি মুট়ের মতে। দীাড়াইয়া থাকে, পান্ধীর দিকে 
তাঁকাইতেও ভুলিয়া যায়। সে দিকে তাকাইলে দেখিতে পাইত ছুই 
জোড়া চোখ তাহার প্রতি নিবদ্ধ, এক জোড়। ঘ্বণায় জ্বল-জ্বল, আর 
এক জোড়া বেদনায় ছল্-ছল্‌। 


ডে 


লাঙলে জমি চষিলে যেমন নীচের মাটি উপরে উঠিয়া পড়ে সিপাহী 
বিদ্রোহের ফলে উত্তর ভারতের অবস্থার তেমনি সব ওলট পালট হইয়া 


৮৫ চাপাটি ও পদ্প 


গেল। বিদ্রোহের আগে যেমনটি সাজানো ছিল বিদ্রোহের পরে 
পরিবর্তন ঘটিল। মানুষ যে কে কোথায় গেল তাহার ঠিক ঠিকানা 
নাই। দলত্যাগী সিপাহীরা অনেকে তরাই ও নেপালে চলিয়া গেল, 
অনেকে নিজের জেল ছাড়িয়। অন্য নামে অন্ত জেলায় আশ্রয় গ্রহণ 
করিল। গ্রামের চেয়ে শহরগুলিতেই বিপর্যয় বেশি ঘটিল। 
ইংরেজদের মধ্যে যাহারা জীবিত ছিল চারিদিকে নানা অসম্ভব স্থানে 
ছড়াইয়া পড়িল। সিপাহী ও কোম্পানী ছুই পক্ষই চরম বর্বরত। 
করিল। মানবচরিত্র সম্বন্ধে ধাহারা কিছু আশ পোষণ করেন তাহার 
সে বিষয়ে যত কম আলোচন। করেন ততই মঙগল। 

প্রচণ্ড কালবৈশাখীর ঝড় থানিয়া গেলে গৃহস্থ যেমন বিক্ষিপ্ত 
জিনিষপত্র ও আতীয়-স্বজনকে খুঁজিতে বাহির হয় উভয় পক্ষেরই সেই 
অবস্থা হইল। অনেকেরই সন্ধান মিলিল না, আবার অনেককে 
সব স্থান হইতে পাওয়া গেল। 

ওয়াজেদ আলি মিস মাদলিন জ্যাকসনকে খু'ঁজিতে বাহির 
হইয়াছে । মাদলিন বিদায় হইবার পরে ওয়াজেদ আলি তাহার আর 
কোন সংবাদ পায় নাই । ছায়া যেমন কখনে। সঙ্গ ছাড়ে না, অন্ধকারে 
দেহের সঙ্গে মিশিয়া থাকে, আলোতে এদিকে ওদিকে সঞ্চরণ করে 
মাদলিনের স্মৃতি দিনে রাত্রে তেমনি তাহার মনে লাগিয়াই রহিল । 
প্রথমে সে স্মৃতিকে গ্রাহ্থ করিত না, পরে হাসিয়া উড়াইয়া দিবার চেষ্টা 
করিল, কিন্তু কিছুতেই কিছু হইবার নয়। ওয়াজেদ আলি বুঝিল 
মানুষের চেয়ে তাহার স্মৃতি প্রবলতর ; মানুষকে এড়াইয়। চলা যায়, 
কিন্ত তাহার স্মৃতিকে ? মাদলিনের প্রত্যেকটি কথাকে, ব্যবহারকে শত 
সহশ্রবার সে এপিঠ-ওপিঠ করিয়! ঝাড়িয়! পিটিয়। দিয়াছে, প্রত্যেক- 
বার আশার আশ্বাসের প্রেমের নৃতন নৃতন শস্তকণ! বাহির হইয়! 
পড়িয়াছে। তাহার রোগখিক্ন, ভয়পার্ুর মুখের সেই হাসি। 
সে হাসি ক্রমে উজ্জ্লতর হইয়া উঠে আর সেই যে বিদায়- 
কালে হাতের উপরে সে একটুখানি চাপ দিয়াছিল সেই স্থানে মুগ্ধ 
পুরুষ কতবারই না চুম্বন করিয়াছে। কিন্তু তাহাতে কি জাল! 


চাপাটি ও পদ্স ৮৬ 


কমিয়াছে? কিছু মাত্র না। বরঞ্চ ঘৃতনিধিক্ত বহর মতো তাহ! 
অধিকতর তীব্র হইয়া উঠিয়াছে, সেই বহ্ছির দাহ তাহার সমগ্র 
শরীরের শিরা উপশিরায় সঞ্চালিত হইয়া গিয়। অন্ুক্ষণ রী-রী করিতে 
থাকে। তাহার আত্মীয়স্বজন তাহার ভাবগতিক লক্ষ্য করিয়া বলে, 
ওয়াজেদ আলি বাউরা হইয়। গিয়াছে, ঘনিষ্ঠ ছুই-চারজন দোস্ত যাহার! 
প্রকৃত ইতিহাস জানে তাহারা বলে মিসি বাবার শোকে ওয়াজেদ আলি 
মস্তানা হইয়া গিয়াছে । ওয়াজেদ আলি কিছুই বলে নাঃ চুপ করিয়া 
থাকে, তাহার সমস্ত অস্তিত্ব অস্তঃসলিল হইয়া প্রবাহিত হইতেছে, 
বাহিরে কেবল বালুর সপ, ভিতরে অনস্ত রসপ্রবাহ। অবশেষে একদিন 
রাত্রে কাহাকেও কিছু না বলিয়া মিস মাদলিনের সন্ধানে সে বাহির 
হইয়া পড়িল। 


৬ 


কাজটি সহজ নয়। প্রকাণ্ড দেশের মধ্যে মুষ্িমেয় ইংরেজ নরনারী 
কোথায় কে আছে কে বলিবে। তার উপরে মিস মাদলিনের এ 
নামটি ছাড়া আর কোন পরিচয় তাহার জানা নাই। তা ছাড়া একজন 
নগণ্য নেটিভের পক্ষে ইংরেজ মহিলার সন্ধানে বিপদও আছে। তখন 
জোর ধর-পাকড় চলিতেছে । সিপাহীপক্ষ-তুক্ত হুইয়াও ওয়াজেদ 
আলি যে কিভাবে বাঁচিয়া গেল সে এক রহস্ত । আবার মাদলিনের 
সন্ধানে বাহির হইয়। অনেক স্থানে সরকারী লোকের হাতে সে ধর! 
পড়িয়াছে, কিন্তু শেষ পর্যস্ত নিরীহ বাউর1 বলিয়। ছাড়িয়৷ দিয়াছে । 
প্রকৃতিস্থ থাকিলে সে বুঝিতে পাঁরিত কাজটি কত কঠিন। এক এক 
সময়ে তাহার মন ভাঙিয়। পড়িত, মনে হয়ত মাঁদলিনকে খুঁজিয়া পাই- 
বার সম্ভাবনা বুঝি নাই। কিন্তু অপ্রকৃতিস্থ পুরুষের কখনো মনে 
হইত না যে আরও একট' সম্ভাবনা থাকিতে পারে। যদ্দিই ব! তাহার 
সাক্ষাৎ পাওয়া যায়! মুখ স্থাচ্ছন্দ্যপুর্ণ ইংরাজ নরনারীর গৃহ যে 
কাইজারবাগের বন্দীশালা নয়, এ আশঙ্কা তাহার মনে একবারও 


৮৭ চাপাটি ও পদ্ম 


উদ্দিত হইত না, সে ভাবিত মিস মাদলিন ঠিক তেমনিভাবে তাহাকে 
গ্রহণ করিবে বন্দীশালায় যেমন করিত। হাতের সেই স্থানটায় 
একবার চুম্বন করিয়া দ্বিগুণ উৎসাহে চলিতে আরম্ভ করিত। নখ 
প্রকৃতিস্থের জন্য নয়, এ সংসারে অপ্রকৃতিস্থ্রাই কিব্চিং সুখী । 


ওয়াজেদ আলি প্রথমে কানপুরে গেল, সে জানিত যে ইংরেজ 
বাহিনীর সঙ্গে ইংরেজ নরনারী কানপুরে চলিয়া! গিয়াছে । কানপুরে 
আসিয়! সন্ধান করিয়! জানিতে পারিল যে লখনৌ শহর হইতে আনীত 
সমস্ত অসামরিক ইংরেজ নরনারী এলাহাবাদে গিয়াছে, কিন্তু সে 
অনেক দিনের কথ!। ওয়াজেদ আলি এলাহাবাদে 'আসিল। 
সেখানে চার পাঁচ মাস কাটাইল, হোটেলে ক্যান্টনমেন্টে কত স্থানেই 
না সন্ধান হইল, কখনো কখনো ছু' একজন ইংরেজ তরুণীকে দূর হইতে 
দেখিয়া মুহূর্তের জন্য চমকিয়া উঠিয়াছে, কিন্তু কোথায় মাদলিন! 
মরীচিকারও একট। অস্তিত্ব আছে, মাদলিন বুঝি তাহার চেয়েও 
হম্প্রাপ্য। 


সেখানে এক হোটেলে খানসামার কাজ সে লইয়াছিল, খাওয়! 
পর চলিবে, আর মাদলিনের সন্ধান যে গ্র সৃত্রেই করিতে হইবে, 
তাহাও সে জানিত। সেখানে অন্য এক খানসামার কাছে গল্পে গল্পে 
শুনিল যে কাঁনপুর হইতে ইংরেজ নরনারীর দল এলাহাবাদে তিন চার 
মাস থাকিয়া দেশের অবস্থা একটু শান্ত হইলে কলিকাতার দিকে যাত্রা 
করে। সেই দিন সন্ধ্যাতেই কলিকাতাগামী ডাকের গাড়ীতে সে স্থান 
করিয়া লইল। মাদলিনের সঙ্গে দেখা হইলে তাহাকে উপহার দিবার 
উদ্দেশ্যে সে একটি সোনার আংটি তৈয়ারি করিয়া লইয়াছিল, ডাক 
গাড়ীর মাশুল জোগাইতে সেটি বিক্রয় করিয়া ফেলিল। ওয়াজেদ 
আলি ভাবিল ন! হয় তাহার সন্ধান পাইবার জন্যই দিলাম, তাহাকেই 
দেওয়া হইল। প্রেমিকের বিচিত্র যুক্তি। যথাসময়ে সে কলিকাতায় 
পৌছিল। 


সেদিন শনিবার । কিছুকাল সাহে্বস্থুবোর সন্ধানে থাকিয়া 
ওয়াজেদ আলি বুঝিয়াছে যুদ্ধকাল ছাড়া অন্য সময়ে ইংরাঁজকে হয় 
তাড়িখানায় নয় ঘোড়দৌড়ের মাঠে পাওয়া যায়। সে সরাসরি ঘোড়- 
দৌড়ের মাঠের দিকে চলিল। রেস কোর্সে পৌছিয়া সে দেখিল যে 
ঘোড়দৌড় শেষ হইয়! গিয়াছে,কিন্ত জনতা তখনো অপস্যত হয় নাই। 
প্রথমেই তাহার চোখে পড়িল বিশালবপু জেনারেল উন্রাম খুব দর 
কষাকষি করিয়া এক জেলের কাছে তপদি মাছ কিনিতেছেন । লখনৌ 
শহরে সে উদ্টামকে দেখিয়াছিল। তাহার আশেপাশে গুচ্ছে গুচ্ছে 
অনেক ইংরেজ নরনারী মুগ্ধ দৃষ্টিতে জেনাত্লে সাহেবের দর কযাকষি 
দেখিতেছিল। ওয়াজেদ আলির দৃষ্টি এক গুচ্ছ হইতে গুচ্ছাস্তরে 
ফিরিতেছিল মাদলিনের সন্ধানে । এমন সময়ে হঠাৎ তাহার বনিয়াদের 
মূল অবধি কীপিয়া উঠিল, সে দেখিল অদূরে একটি গুচ্ছের মধ্যে 
মাদলিন। কাইজারবাগের বন্দীশালার সেই রোগপাণ্ডরর ভীতিবিহ্বল 
তরুণী নয়, স্বাস্থাসৌভাগ্যে সমুজ্জল কান্তিময়ী যুবতী। আর কেহ 
হইলে এ ছুই যে এক বুঝিতে পারিত না । কিন্তু প্রেমের দৃষ্টির অসাধ্য 
কি? ওয়াজেদ আলির মনে হইল লক্ষ নরনারীর মধ্যেও প্রথম 
দৃষ্টিতেই মাদলিনকে সে চিনিতে পারিত। তারপরে তাহার মনে হইল 
এখন কর্তব্য কি? সরাসরি তাহার সম্মুখে গিয়া উপস্থিত হইবে ? 
না, না, তাহ সম্ভব নয়। নিজের চেহারা ও পোশাকের দিকে 
তাকাইয়া সে লজ্জায় এতটুকু হইয়া গেল। এভাবে কেহ প্রেমপাত্রীর 
কাছে যায় না। লখনৌ পরিত্যাগের পর এই প্রথম সে নিজের দিকে 
দৃষ্টি দিল। কি হইয়াছে ! মুখ শুক্ষ, চুল দাড়ি এলোমেলো, জাম! 
ও পায়জামা ছিন্ন আর মলিন। সে স্থির করিল আজ গোপনে 
মাদলিনকে অনুসরণ করিয়া তাহার বাসস্থান দেখিয়া লইবে, আর 
আগামীকল্য সুপ্রভাতে সুসজ্জিত ও পরিচ্ছন্ন হইয়া প্রণয়িনীর সম্মুখে 


৮৯ চাপাটি ও পদ্গ 


নিজেকে উপস্থিত করিবে, প্রেমনিষ্ঠার চরম পুরস্কার দাবী করিবে। 
গোপনীয়তার দূরত্ব রক্ষা করিয়।৷ সে মাদলিনকে অন্ভুসরণ করিল এবং 
পার্ক দ্বীটের যে বাড়ীতে সে প্রবেশ করিল তাহ! মনে মনে ট্ুকিয়' 
লইয়! স্বস্থানে ফিরিয়া আসিল । 


দীর্ঘ ভরমণপথে ওয়াজেদ আলি একটি ছোট ব্যাগ কখনো হস্তচ্যুত 
করে নাই, করিবার কথা মনেও ভাবে নাই ৷ শুভলগ্নের জন্য এ 
ব্যাগটিতে কয়েকটি কাপড় সঞ্চিত ছিল, একটি চুড়িদার পায়জামা 
একটি পিরান, একটি রেশমের আচকান, শাদা কাপড়ের উপরে কাজ 
করা একটি লখনৌ ট্রপি, জরির ফুল তোলা এক জোড়া নাগরা জুতা, 
একটু আতর, আয়না আর চিরুনি। এই পোশাকে সাজিলে তাহাকে 
খুব সুন্দর দেখায়, কল্পনা নয়, স্বয়ং মাদলিন তাহাকে এইরূপ বলিয়া! 
ছিল। একদিন এই পোশাকে সজ্জিত হইয়। বন্দীশালায় ঢুকিলে 
মাদলিন দ্াড়াইয়া উঠিয়া তাহাকে অভ্যর্থনা করিয়া পরিহাস-মি শ্রিত 
উল্লাসে বলিয়াছিল, কুনিশ নবাব। ওয়াজেদ আলি মাদলিনের চোখে 
চকিতের জন্ত সেই আভা লক্ষ্য করিয়াছিল, গুপুরুষ দর্শনে সুন্দরী 
রমনীর মনে অজ্ঞাতসারে যে-ভাব উপজাত হইয়া থাকে। সেদিনের 
কথা সে কখনে। ভুলিতে পারিবে কি? তাই মাদলিনের সঙ্ধানে বাহির 
হইবার সময় পোশাকটি সে সঙ্গে লইতে ভোলে নাই। একদিন 
ঞ& পোশাক পরিবার অবকাশ আপিবে, আবার মাদলিনকে চমকিত 
করিয়। দিয়া সৌন্দর্ষের অভিবাদন সে আদায় করিয়া লইবে__ইহাই 
ছিল তাহার বিশ্বাস, তাহার সঙ্থল্প। সে ভাবিল আজ সেই শুভদিন 
সমাগত অথবা আগামীকল্য প্রভাতে সেই শুভদিন । 

প্রতীক্ষায় দীর্ঘ রাত্রি আর শেষ হয় না । অনেকক্ষণ সে পোশাঁক- 
গুলি ঝাড়িয়া বুড়িয়া সংস্কৃত করিয়া রাখিয়াছে, চুল দাড়ি ছাঁটিয়া 


চাঁপাটি ও পদ্ ৯৩ 


স্ববিহ্ততস্ত করিয়াছে, এখন রাত্রি শেষ হইলে হয়। কিন্তু রাত্রি আর 
কিছুতেই নড়িতে চায় না । অবশেষে সে-রাত্রিও শেষ হইল। পূর্ব 
দিক একটুখানি ফিকা হইবামাত্র সে শষ্যাত্যাগ করিয়া স্নান করিয়! 
লইল, পোশাক পরিল, চুল দাড়ি সুসংস্কৃত ও সুবিহ্যস্ত করিল, একটু 
খানি আতর মাখিল, তারপরে আয়ন হাতে করিয়া ভোরের আলোয় 
নিজেকে একবার দেখিয়া! লইল। মাদলিনের সেদিনের বিস্মিত উল্লাসের 
স্মৃতি মনে পড়িয়া তাহার ওষ্ঠাধরে পৌরুষের গর্বমিশ্রিত হাসির রেখা 
ফুটিল। জগতের সেই আলো-আধারির মুহূর্তে তাহার মনে হইল 
সুন্দরী মাদলিন যে সুপুরুষ ওয়াজেদ আলিকে ভালোবাসিবে তাহার 
চেয়ে সহজ ও সম্ভব আর কি হইতে পারে ? 
স্বস্তির একটি দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলিয়া সে সগর্বেপরম নিশ্চিন্তভাবে 
মাদলিনের আবাসের দিকে পার্ক ছ্ীট ধরিয়া রওনা হইল। 
বেশিদুর যাইতে হইল না, পার্ক ষ্টীট ও চৌরঙগীর মোড় পর্যস্ত 
পৌছিতেই সে দেখিতে পাইল যে শুত্র বস্ত্র পরিহিতা৷ মাঁদলিন শারদীয় 
উষার মতো প্রতি পদ সঞ্চারে লাবণ্যবিক্ষেপ করিতে করিতে ময়দানের 
দিকে চলিতেছে। তাহার অপরূপ সৌন্দর্য দেখিয়া বিস্ময়ে উল্লাসে 
গর্বে ওয়াজেদ আলির মন ভরিয়া উঠিল, সে দ্রেতপদে তাহার কাছে 
গিয়। ধাঁড়াইল, তাহার প্রতি ভ্রক্ষেপ না করিয়। মাদলিন চলিয়া! গেল। 
ওয়াজেদ বুঝিল এতদিন পরে দেখিয়া মাদলিন তাহাকে চিনিতে পারে 
নাই। মাদলিনের প্রত্যাবর্তনের আশায় সে ঠাড়াইয় রহিল। কিছু 
ক্ষণ পরে মাদলিন যখন ফিরিল মে আর দ্বিধা না করিয়৷ তাহার 
সম্মুখে গিয়া দঁড়াইল এবং চোখে পরিচয়ের ছ্যতি প্রকাশ করিয়া 
অভিবাদন করিল। মাদলিন তাহার দিকে তাকাইল কিন্তু তাহার 
চোখে পুর্ব পরিচয়ের কোন স্মৃতি চমক মারিয়া গেল না, বিস্ময়ও 
কৌতৃহলের মাঝামাঝি সুরে সে শুধাইল, কেয়া মাঙতা ? 
“কেয়। মাও.তা? এ প্রশ্নের কি উত্তর সম্ভব ! কি উত্তর দিবে, আদৌ 
দিবে কি দিবে ন। ভাবিতে ভাবিতে মাদলিন অনেক দূর চলিয়। গেল । 
ওয়াজেদ আলি মুড়ের মতো। হতচৈতন্ অবস্থায় ঠাড়াইয়া রহিল। যখন 


৯১ চাপাটি ও পদ্ম 


সন্বিং তাহার কিছু ফিরিল কানে শুনিতে পাইল--ও মড১ সো! লেট 
টুডে। 

উল্লসিত মাদলিনের কণ্ঠে ধ্বনিত হুইল, বেটার লেট গ্যান নেভার। 

কাম টু মাই প্লেস রব! 

মাষ্ট আই? 

ইউ মাস্ট, ইউ নটি বয়। 

পূর্ব মুহুতে'র ঘটনায় ওয়াজেদ আলির মন এমনি অসাড় হইয়া 
গিয়াছিল যে হুঃখবোধ করিবার মতো। শক্তিও তাহার রহিল না । 

অদৃরবর্তাঁ একটি গাছের দিকে তাহার চোখ পড়িল, দেখিল তাহার 
তলায় অনেকগুলি শালিখ জটলা! করিয়। মারামারি ও কলরব করি- 
তেছে, সেই দৃশ্ঠ দেখিয়া সে এমন এক প্রকার কৌতুক অনুভব করিল 
যে, আর সব ভুলিয়া গিয়া সেই দিকেই অনম্তমন হইয়া তাকাইয়া 
রহিল। 


কথ 


লেফটেন্যাণ্ট রবার্ট, প্রবিন ও ওয়াটসন ব্রেকফাস্টে বসিয়াছিল, 
এমন সময়ে রবার্টমের আরদালি অগ্তন তেওয়ারী আপিয়া সেলাম 
করিয়া দাড়াইল। বলিল, “সাহেব, পরশুদিন যে গোয়েন্দা এসেছিল 
আজ আবার সে এসেছে |» 

রবাটস একখান! ন্যাপকিনে মুখ মুছিতে মুছিতে বলিল, “উত্তম, 
তাকে নিয়ে এসো।” ূ 

অল্পক্ষণ পরেই একটা ছোকরাকে সঙ্গে করিয়া! অঞ্জন তেওয়ারী 
ঢুকিল। লোকটা তিন গজী এক সেলামে সাহেরত্রয়কে অভিবাদন 
করিয়। রবার্টসের হাতে ছোট এক টুকরা কাগজ দিল। রবার্টস পড়িল 
কাগজে ইংরাজিতে লিখিত আছে, মিস মাঁটিনডেল। 

রবার্টস বলিল, “আশা করি, আমাদের ফাদে ফেলবার জন্য 
কৌশল নয়” 

গ্রবিন বলিল, “হস্তাক্ষর ইংরাজি ছণদের |” 

ওয়াটসন বলিল, “তাহলে আরও কিছু লিখিত থাকত, যেমন 
অত্যাচারের কথা, যাতে আমাদের বিশ্বাস দৃঢ়তর হয়। 

রবার্টস বলিল, “ওয়াটসন, তোমার কথাই ঠিক 1» 

তিনজনে এবারে হিন্ুস্থানীতে লোকটাকে জেরা আরম্ভ করিল, 
অঞ্জন তেওয়ারী মাঝে মাঝে সাহায্য করিতে লাগিল। 

*গ্রামটা কত দূরে?” 

“তা সাহেব আট দশ ক্রোশ হবে|” 

"তুমি কখন রওনা হয়েছিলে 

“কাল খুব ভোরে ।” 

“এত বেশী সময় লাগল কেন?” 

“লুকিয়ে চুরিয়ে আসতে হয়। সিপাহীদের হাতে পড়লে কি 
আর রক্ষা থাকত 1” 


৯৩ চাপাটি ও পদ্ম 
“কেন ?” 


“এ কাগজের টুকরো খুঁজে পেলে আমাকে আস্ত রাখত ন1। 
সাহেব, সিপাহীদের তো! চেন না।” 


তাহার শেষ কথাটিতে তিনজনে হাপিয়া উঠিল, ভাবটা হাড়ে হাড়ে 
চেনে । 

“তবে তুমি কোন্‌ সাহসে কাগজটা আনলে ??। 

“এই সাহসে,” বলিয়া সে কাপড়ের থলির মধ্য হুইত্ে একটা 
বাশের বাঁশি বাহির করিল। বাঁশিটার গায়ে ছোট একটি ফাটল 
দেখাইয়া! বলিল, “মেম সাহেব কাগজটাকে এর মধ্যে ঢুকিয়ে দিয়ে- 
ছিল। তার পরে আমি এইভাবে বাশি বাজাতে বাজাতে চলে এলাম 1৮ 
তার পরে পাছে সাহেবগণ ভাবে যে, সে বাঁশি বাজাইতে জানে না 
তাই সে সোৎসাহে বাঁশিতে ফু দিল। 

কঞ্জন তেওয়ারী ভাড়। দিয়া বলিল, “এই উল্লু থাম্‌।” 

লোকট। ভ্রক্ষেপমাত্র না করিয়া বলিল, “সাহেব, আমি নাচতেও 
জানি 1৮ 

প্রবিন হাসিয়া যাহা! বলিল তাহার বাংলা করিলে দাড়ায়, খুব 
দীপ্তিমান বালক। 

“তুমি আমাদের সঙ্গে যাবে ?” 

“হেঁটে গেলে যাব |» 

»আমরা ঘোড়ায় যাব ।? 

“তবে কি করে যাব? ঘোড়ার সঙ্গে দৌড়ে পারন কেন ?” 

“তোমাকে ঘোড়া দেব, চড়তে জানে। ?? 

“ঘোড়ায় চড়তে জানি, হাঁতিতে চড়তে জানি, এমন কি গাছে 
চড়তেও জানি ।” 

সাহেব তিনজন হাসিয়া উঠিল। 

অঞ্জন তেওয়ারী ধমক দিয়! বলিল, “চুপ রও উল্লু।” 

রবার্টস ইংরাজিতে বলিল, “ওকে আগের দিনে যে-সব জেরা করে" 


চাপাটি ও পদ্ম ৯৪ 


ছিলাম, আর একবার ক'রে দেখি সেদিনের উত্তরের সঙ্গে মেলে কি 
না।৮ এই বলিয়া আরম্ত করিল, পায়ের কি নাম ?” 

“ছোট রামপুর ।* 

«সেদিন কি বলেছিলে ?” 


“সেদিনও ছোট রামপুর বলেছিলাম, ও-গ্রাম আজ পাঁচ শো বছর 
হল ছোট রামপুর 1” 

“ও মুসলমানদের গ্রামে তুমি কেন? তুমি তো হিন্দু” 

«কেন, গাঁয়ে কি গোরু নেই ?” 

«গোরুর সঙ্গে তোমার কি সম্বন্ধ ?” 

“গোর বা মুসলমানের সঙ্গে আমার কোন সম্বন্ধ নেই। আমি 
গোরু চরাই 1 

“কেন মুনলমানে কি গোরু চরাতে জানে না ?” 

“ন। ওরা গোরু চরায় না, ওরা গোরু খায় ।% 

তিনজনে একসঙ্গে হীসিয়া উঠিল। ওয়াটসন বলিল, “বাচ্চা 
ফলস্টাফ |” 

“মিস মাটিনডেল তোমাকে কি করে দেখল ?” 

“চোখ দিয়ে” 

*প্রবিন, সাবধানে জেরা কর, ও তোমার চেয়ে পাকা 1৮ 

“মেমসাহেব মুসলমানকে বিশ্বাস না করে তোমাকে বিশ্বাস করল 
কেন?” 

«এতে! অতি সহজ কথা। মেমসাহেব জানে কোন হিন্দু তাকে 
সাদি করবে না, তাই আমি খবরটা পৌছে দেব বলে তার মনে 
হয়েছিল ।” 

“যে মুসলমান ওকে নিয়ে গিয়েছিল, সে ছাড়াও তো৷ গায়ে অন্য 
মুলমান ছিল ।” 

“সাহেব, দরকার হলে ওরা গী' সুদ্ধ. একজনকে সাদি করে। 
সকলেরই মনে আশ! আছে, তাই কে আর খবর দেবে ।» 


৯৫ চাপাটি ও পদ্ম 


“তুমি যখন পরশু এখাঁন থেকে ফিরে গেলে, মেমসাহেব কি 
বলল ? 

“আগে আমি কি বললাম শোন। বললাম, “মেমসাহেব তোমার 
হাতের লেখ। না৷ পেলে সাহেবেরা আসবে না । তারপরে অনেকক্ষণ 
কি ভেবে কোথেকে এই লেখা কাগজটুকু এনে আমার হাতে দিল।” 

প্রবিন বলিল, “তুমি আমার কাছে নোকরি করবে ?” 

“কি, লড়াই ?” 

»না, আমার ছেলেমেয়েদের তদারক ৮ 

*খুব পারব, গোরু চরিয়ে হাত পেকেছে।” 

«তোমার নাম কি 7৮ 

পন্যাড়া গোপাল।” 

“কাল যে শুধু গোপাল বললে?” 

“ভেবেছিলাম মাথা দেখেই বুঝতে পারবে, ওট। আর বলতে হবে 
না।” 

সকলে আবার হাসিল। রবাটস বলিল, “এখন তুমি অঞ্জন 
তেওয়ারীর কাছে থাকে। গে, ঠিক সময়ে খবর দেব 1৮ 

অঞ্জন তেওয়ারীর সঙ্গে শ্টাড়া গোপাল বাহির হইয়া গেল। 

রবার্টস বলিল, “খবর ঠিক বলেই মনে হয় ।৮ 

প্রবিন বলিল, “কোন সন্দেহ নেই” 

ওয়াটসন বলিল, “ছেলেটি খুব স্মার্ট |” তখন তাহার! স্থির করিল 
যে, রাত্রে এমন সময়ে রওনা হইতে হইবে যে, একেবারে ভোর রাত্রে 
গিয়। গ্রাম ঘেরাও করিতে পারে ; কেহ সন্ধান পাইবে না, কেহ গ্রাম 
পরিত্যাগ করিতে পারিবে না। আরও স্থির হইল যে, তাহাদের তিন 


জনের সঙ্গে একদল অশ্বারোহী থাকিবে, আর সঙ্গে থাকিবে অঞ্জন 
তেওয়ারী ও গোপাল । 


হু 


কাগজের টুকরা পাঠাইয়। দিয়া অবধি মিস মাটিনডেলের উদ্বেগের 
অন্ত ছিল না। সে ভাবিল গোপাল ইংরেজ সৈম্বাহিনী পর্যন্ত 
পৌছিতে পারিবে তো, না তার আগেই সিপাহীদের হাতে পড়িবে। 
আবার কখনো ভাবে, গোপাল সিপাহীদের চর নয় তো? তাহাকে 
আপন ফাঁসে জড়াইবার উদ্দেশ্যেই লিখিত প্রমাণের দাবি করে নাই 
তো? তারপরে মনে হয়, না গোপালকে তো তেমন বলিয়া বোধ 
হয় না, ছোকরা যেমন সরল, তেমনি মজার, এমন লোক কি গোয়েন্ৰ! 
হইতে পারে ! 

তখন তাহার মনে পড়ে অনেক কয়দিন হইল সে ছোকরার 
গতিবিধি লঙ্গ্য করিতেছে, সন্দেহের কিছু দেখে নাই । কয়েকদিন আগে 
গায়ের লোকের কানাঘুষায় সে জানিতে পারিয়াছিল যে ইংরেজ সৈন্ত 
কানপুর হইতে লখানৌ চলিয়াছে। পাছে তাহার! এই গায়ে আসিয়া 
পড়ে, একবার সকলের গ্রাম ত্যাগের প্রস্তাব উঠিয়াছিল। পরে সকলে 
গ্রামেই থাকিয়। যায়। ইংরেজ সৈন্য পৃব দিক দিয়া চলিয়া যাইবে, 
গ্রামে আসিবে না । তখন হুইতে তাহার মাথায় গোপনে খবর দিবার 
বুদ্ধি আসে, কিন্তু উপায় কি? তখন গোপালের কথা মনে হয়ঃ 
গোপালকে আগেই সে লক্ষ্য করিয়াছিল। এবারে সে গোপালকে 
ডাকিয়া ভাঙ! ভাঙ। হিন্বস্থানীতে আলাপ জমাইল। 

"গোপাল, কত বেতন পাও ?” 

«মেমসাহেব, আবার বেতন ? আমার ন্যাড়া মাথা আস্ত থাকলেই 

৮ 

“তোমাকে এরা বুঝি মারে ?” 

“মারে না ! এরা আমাকে মারে, আমি এদের গোরুগুলোকে মেরে 
ভার শোধ নিই ।” 

“আন্যাত্র চাকুরি নাও না কেন?” 


৯৭ চাপাটি ও পন্তর 


“কে আর চাকুরি দিচ্ছে?” 

“কেন, কোম্পানীর কাছে?” 

“কোম্পানী কি গোরু পোষে ? 

“অন্য কাজ দিতে পারে।” 

“তবে জোগাড় করে দাও না।" 

'“লিপাহীরা তোমাকে খুন ক'রে ফেলবে না?” 

'দিপাহীর রাজত্ব আর কয়দিন? কোম্পানীর সিপাহী এলো। 
বলে।” তারপরে গলার স্বর নিচু করিয়া বলে__“কাছে এসে পড়েছে, 
লখনৌ যাচ্ছে।” 

"যাও না, একবার দেখে এসো |” 

“অমনি জানিয়ে আসব যে, তোমাকে আটক করে রেখেছে, কি 
বলো মেমসাহেব 1?” 

“সিপাহীর! যদি জানতে পারে, তোমাকে আমাকে ছজনকেই মেরে 
ফেলবে ।” 

“ন্যাড়া গোপালের পেট থেকে কথা আদায় করা বড় শক্ত, যমে 
পারে না।? 

“তবে যাও না।” 

অতঃপর গোপাল ইংরাজ সৈন্তবাহিনীর উদ্দেশে চলিয়। যায়--আর 
ফিরিয়। আসিয়া লিখিত প্রমাণ দাবি করে। 

মিস মাটিনডেল ভাবিতেছিল ন্যাড়া গোপালের পেট হইতে যমে 
কথ। আদায় না করিতে পারিলেও হাতের কাগজের টুকরা, তার জন্ত 
যমের দরকার হইবে না, সিপাহীরাই যথেষ্ট । তারপরে ভাবিল, না. 
ছোকরা চালাক-চতুর আছে, ভয় নাই। তারপর আবার ভাবিল যা! 
হইবার হইয়। গিয়াছে এখন আর ছুশ্চিন্ত। করিয়া কি ফল। 

এমন সময়ে মনসুর প্রবেশ করিল । এই লোকটাই তাহাকে ধরিয়া 
আনিয়। আটক করিয়। রাখিয়াছে। দিনে রাতে ছু'তিনবার দে দেখ 
দেয়, কখনো হাতে খাছ্য, কখনো চাবুক, অবাধ্য বশ করিবার উপায় 


মনন্ুর জানে বটে। 
নি 


ভাপাটি'ও পঞ্প ৯৮ 


মনস্থুরের হাতে খানকতক রুটি ছিল, মনসুর বলিল, “কি বিবি, 
মত বদঙ্গেছে ?” 

“মত আবার কিসের 7 

“সাদি করবে না চাবুক খাবে?” 

“তুমি বে-ইমান।” 

«মারহাবব।। বিবির তাগদ এখনো কমে নি দেখছি, রুটি ক'খান। 
ফিরিয়ে নিয়ে যাই |" 

“তোমার রুটির চেয়ে তোমার চাবুক ভালো । শয়তান !” 

“এবারে ভূল হাল বিবি! শয়তানে বশ করে রুটি দিয়ে। মানুষ 
তা পারে ন। বলেই চাবুক মারে |” 

“তাই মারে। না” 

“কন্মুর তো৷ করি না।” 

“ইউ স্কাউগ্ডেল 1 

মনসুর ম্যাঞ্স্টেটের ঘোড়সোয়ার ছিল, ইংরাজি গালাগালির মম 
জানিত, বলিল, “খাব্নুরত বিবির মুখের গালও খাব্মুরত।£' 

মিস মাটিনডেল তাহাকে পদাঘাতের আভনয় করিল। 

মনন্ুর রাগিল না, বলিল, “শোভানাল্লা ! বিবির খাব্মুরত পা 
হুখানার জন্যই তো সাদি করতে ইচ্ছা৷ ।” 

মিস মাটিনডেল আর কিছু বলিবার না পাইয়া বলিল, “প। দুখানা ।* 

মনসুর দ[মবার পাত্র নয়, বলিল, “আরও কিছু 1৮ 

“বে-ইমান |” 

“আবার বে-ইমান কেন ?” 

*একশবার বে-ইমান। তুমি চুরি করে আমাকে এনেছ।” 

“ভালো জিনিষই লোকে চুরি করে।” 

“তুমি তখন কেন বলেছিলে যে নিরাপদ জায়গায় আমাকে নিয়ে 
যাবে? 

“তাই তে! নিয়ে এসেছি । কানপুরের বিবিদের কি হয়েছে শুনেছ 
তে?” 


টি চাপাটি ও পদ্ম 


তোমার মতে। ছুশমনের সঙ্গে সাদি হওয়ার চেয়ে সে অনেক 
ভালো |” 

“সেই কথাটাই ভালে ক'রে জেনে যাই, এবারে কী নিয়ে আসব, 
তলোয়ার না মোল্লা 1” 

মিস মাটিনডেলের ধৈর্য ও শক্তি সাময়িকভাবে নিঃশেষ হইয়া 
গিয়াছিল, সে আর ফাড়াইয়া থাকিতে পারিল না, মাহুরখানার উপরে 
পড়িয়! চাপ! কান্নায় কাপিতে লাগিল। 

মনন্তুর প্রস্থান করিল। 


৯ 


স্বপ্নের মতে। হছুঃস্বপ্নের মতো! কত স্মৃতিই না মিস মাটিনডেলের 
মনে শোভাযাত্রায় চলিতে লাগিল । 

সিপাহী ম্যাজিস্ট্রেটের বাংলো ও সমুদ্রয় সিভিল লাইন লুট 
+রিয়! লইয় জ্বালাইয়া দিয়াছে। সিভিল লাইনের একপ্রান্তে 
ম্যাজিস্টেটের পাসেন্যাল আযাসিস্ট্যান্টের বাংলো । ঠিক সেই সময় 
টাতে মিস মাটিনডেল প্রাতভ্র'মণে বাহির হইয়াছিল। অন্তদিন আনক 
আগে ফেরে, সেদিন হঠাৎ তাহার কুকুর “পেট+ ছুটিয়া গিয়া একটা! দেশী 
কুকুরকে তাড়া করে। ছুই কুকুরে অনেকক্ষণ ছুটোছুটি, কামড়াকামড়ি 
চলে। 'পেট' ফিরিয়া আমিলে, নিয়মিত সময়ের প্রায় এক ঘণ্টা পরে 
নদীগর্ভের বালুশষ্য। "ছাড়িয়। যখন সে উপরে উঠিল, দেখিল সিভিল 
লাইন জ্বলিতেছে। এক মুহূর্ত বিমূঢ় থাকিয়া সে ছুটিল। 

“মেমসাহেব দাড়াও, দাড়াও ।? 

সে ফিরিয়া দেখে মনন্ুর। মনন্ুর ম্যাজিস্টেটের ঘোড়সোয়ার। 
সুপুরুষ যুবক, তাহাকে সে চিনিত। প্রয়োজনকালে ছুৃ'চার দিন কথাও 
বলিয়াছে। 

“এ সব কি মনসুর ?” 


চাপাটি ও পদ্ম ১৩৩ 


“সিপাহীদের কাগু !” 

“ড় করালে কেন? বাড়িতে ষাই।” 
“ন। যাওয়াই ভালো ।৮ 

“কেন?” 

খানে গেলে তোমাকে আস্ত রাখত না।” 
«কেন, আর সকলে? বাবা, মা, ভাই ?” 
“কেউ নেই ।” 

“কোথায় গেছে ?” 


মননুর কথ! না বলিয়া হাত তুলিয়া! দেখাইল। 

অবিশ্বাসের কারণ ছিল না, অনেক শহরে সিপাহীরা যে এমন কাণ্ড 
করিতেছে, মিল মাটিনডেল শুনিয়াহিল 7 সে মুছিত হইয়া পড়িতেছিল, 
মনন্ুর ধরিয়া ফেলিল। 


মনন্থুর তাহাকে এক আত্মীয়ের বাঁড়িতে লুকাইয়। রাখিল। তাহার 
অন্থুরোধে সে ইউরোগীয় পোষাক পরিচ্ছদ ছাড়িয়া ঘাগর] ও বোরখ। 
ধারণ কগিল। মনম্থর বলিফাছিল ষে, হাঙ্গাম! থামিয়। গেলে তাহাকে 
নিরাপদ স্থানে পৌছাইয়া দিবে। কয়েকদিন পরে সীতাঁপুর শহর 
লুটপাট করিয়৷ সিপাহী দিল্লী চলিয়া গেলে মিন মাটিনডেল বলিল, 
“মনন্থুর, এবার আমাকে নিরাপদ স্থানে পৌছে দাও 1৮ 

“নিরাপদ কোথায় ?” 

“কেন, লখনৌ ?” 

“সিপাহীরা লখনৌ ঘেরাও করেছে ।” 

“তবে কানপুর ?” 

“সেখানকার অবস্থা আরও খারাপ ।” 


“তবে--"পর্যস্ত বলিয়া সে আর দিশ। পাইল না, চুপ করিয়া রহিল। 


মনসুর বলিল, “শহর জায়গা ভালো নয়, আমাদের গায়ে গিয়ে 
কিছুকাল থাকো, দেশের অবস্থা শাস্ত হলে যেখানে বলবে পৌছে 
দেব।” 


১০১ চাপাটি ও পঙ্স 


মিম মাটিনডেল সহজে রাজি হইল। সম্পদকালে যাহার সহিত 
বাক্য বিনিময় করিতেও দ্বিধাবোধ করিত, বিপদকালে আজ তাহাকেই 
ঘনিষ্ঠ আত্মীয় ঝলিয়! মনে হইল । মজ্জমান ব্যক্তির কাছে শ্মশানের 
পোড়া কাঠও পরম আশ্রয় । 


ঘা, 
4 


এই বিচিত্র চরাচরে মানুষের মন সব চেয়ে বিস্ময়কর পদার্থ । 
মনের অক্কিত্বই ভগবানের অস্তিত্বের প্রধান প্রমাণ । আর সব পদার্থের 
অস্তিত্ব প্রাকৃতিক নিয়মের অন্তর্গত হইতে পারে কিন্ত সুক্ষ, বিচিত্র ও 
অভাবিতগতি মানুষের মন এমন একজন আটার অপেক্ষা রাখে যিনি 
সুক্ষ্মতর, বিচিত্রতর এবং ষাহার গতি অধিকতর অভাবিত। এমন 
যিনি তাহাকে জগবক্রষ্টা ভগবান বলিলে ক্ষতি কি? 
নৌকার মান্ত্রলে পাল খাটাইলে বাতাস লাগে, তার উপরে আর 
একখানা পাল খাটাইলে আরো! খানিকটা বাতাস লাগে, আরো উচুতে 
আরো একখান] পাল খাটাইলে আরো একটু বাতাস লাগেঃ যত বেশি 
খাটাইবে তত বেশি বাতাস লাগিবে। মানুষের মন নৌকার মাস্তঙ্গের 
মতো, কিন্তু সব মনের পালের সংখ্যা সমান নয়। যাহার পালের 
খ্যা যত বেশি সে-মন তত সুক্ষ, তত িচিত্র, ত'হার গতি তত 
অভাবিত। ইহাতেই সাধারণ মানুষ ও অসাধারণ মান্ুষে ভেদ । তবে 
সাধারণ মানুষের পালের সংখ্যাও মন্দ নয়। নিয়মিত চালে চপপিবার 
সময়ে মানুষে মনের পালের সংখ্যা সম্বন্ধে নিশ্চয় থাকে না, কিন্ত 
অনেক সময়েই দেখিতে পাওয়া যায় যে অভাবিত অবস্থার মধ্যে 
পড়িবামাত্র মনের নৃতন নৃত্তন পাল সম্বন্ধে সে সচেতন হইয়া ওঠে, সেই 
সঙ্গে তাহার গতিবিধিও বিচিত্র হইয়া! ওঠে । 
মনম্ুর নিঃসন্দেহে সাধারণ মানুষ । যখন সে বিপন্ন মিস মাটিন- 
ডেলকে রক্ষা করিয়াছিল, প্রাথমিক পালের হাওয়ার চালেই করিয়া- 


গাপাটি ও পদ্ম ৯০১ 


ছিল। আবার যখন সে তাহাকে তাহার স্বগ্রামে লইয়া যাইবার 
প্রস্তাব করিল, তখনও খুব সম্ভব সেই পালের ইঙ্গিতেই কাজ করিয়া- 
ছিল। কিন্তু তারপরে গাঁয়ে আসিয়া পড়িয়া তাহার মন ষত নৃতন 
নূতন পাল খাটাইতে লাগিল তাহার চরিত্র তত বিচিত্রবূপে দেখা 
দিতে থাকিল। 

মিস মাটিনডেলকে গ্রামে আনিবার পরে বুঝিল যে কোম্পানীর 
রাজত্ব সত্যই যাইবার মুখে, আর পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হইবার আশা নাই । 
তারপর মনে হইল পিতৃ-মাতৃহীন আত্মীয় জনধিরহিত এই তরুণীটির 
কি হইবে, কোম্পানীর রাজত্ব থাকিলে ন হয় তাহাকে গোরালোকদের 
সমাজে পৌছাইয়া দিলেই চলিত। প্রথমে তাহার মনে হইল মেয়েটি 
তাহার গলগ্রহ হইল। তারপরে আর একখানি অভাবিত পাল খাটা- 
ইয়া মন বলিল, গলগ্রহকে গলার মালা করিয়া লও না কেন? কথাটি 
মনে হইবামাত্র সে কেবল যে উল্লাস অনুভব করিল তাহ। নয়, সামাজিক 
মর্যাদার উচ্চতর মানে নিজেকে প্রতিষিত দ্রেখিল। যদিচ কোম্পানীর 
রাজত্ব শয়তানি, তাই বলিয়। ইংরাজের মেয়ে তো মন্দ নয়। 
কোম্পানীর চাকুন্ধী করিলে মর্যাদা বাড়ে, মেম বিবাহ করিলেই ঝা 
বাড়িবে না কেন? তখন সে গ্রামে প্রচার করিয়। দিল ষে, মেয়েটির 
সঙ্গে তাহার সাদি হইবে, দেশের অবস্থ। একটু শান্ত হইলেই হয়। 
ক্রমে নিজের কল্পনার সুরায় নিজে উন্মত্ত হইয়া উঠিল। তখন আর 
তাহার তর সহে না। একদিন মিস মাটিনডেলের কাছে প্রস্তাবটা 
করিয়া ফেলিল। 

কোম্পানী-রাজ বুঝি যায়। মিস মাটিনডেল ইংরাজের মেয়ে ; 
ভাঙে তবু মচকায় না। বলিল, “এমন আমাদের দেশের ইতিহাসে 
অনেকবার হয়েছে, কোম্পানী-রাজ টলবে না 1” 

«কোম্পানী-রাজ কায়েম হলেই বা! কি? তৃমি যাবে কোথায় 1” 

«আমাকে কোন ক্যান্টনমেন্টে পৌছে দিয়ো, সব ব্যবস্থা হয়ে 


«তোমার জদ্ত সর্বদাই আমি চিন্তায় আছি।” 


ঠিউছি চাপাটি ও পক্প 


“মনসুর, তুমি সত্যই আমার খুব উপকার করেছ, তোমাকে 
কিভাষে ধন্যবাদ দেব জানি ন11” 

“ওটা তোমার মুখের কথা, মনের কথা নয় ।” 

“কেন, কেন ?” 

“রক্ষাকত্তাকে কেউ ধন্যবাদ দেয়? আরও বেশি কিছু দেয়” 

“আমি ম্ব-সমাজ ফিরে গেলে তোমার যাতে বড় নোকরি হয় তা 
দেখব |” 

«কেটি, আমি তোমার নোকরি করতে চাই |» 

মিস মাটিনডেল বিছ্যুৎস্পষ্টবং চমকিয়া উঠিল। “তোমার নোকরি 
করতে চাই” ইহার একটা সাধারণ অর্থ আছে সত্য, কিন্তু তৎসঙ্গে 
নিজের আদরের ডাকনাম ও কণ্ঠের বিশেষ স্বর যুক্ত ভষ্টলে একটাই অর্থ 
হয়। বিস্ময়ে, ভয়ে, অপমানে, ক্ষোভে মিস মাটিনডেস চাপা 
আক্রোশে গঙ্জিয়। উঠিল, “মন স্বর !” 

ইহাই মনন্্রের প্রণয় নিবেদনের প্রথম অধায়। মনম্বর বুঝিল 
বাদশাহীর ভগ্নস্ুপের উপরে উপবিষ্টা বলিয়া যাহাকে করায়ত্ত মনে 
হইয়াছিল মে তেমনি ছুর্ভ হইয়া! রহিল। স্তুপ ভগ্ন বলিয়া! তাহার 
সোপানও ভগ্ন, আরোহণের উপায় নাই । টানিয়া নামানো যাইতে 
পারে বটে। মনম্বরের মন আর একখানি প্রত্যাশিত পাল তুলিয়া! 
দ্বিল। এবারে সে তজ'ন গজ'ন ভীতি প্রদর্শন উতগীড়ন “বং অবশেষে 
প্রহার শুর করিল। কিন্তু না নামিল ভগ্নস্তূপের সুন্দরী, না কমিল 
ভগ্নভৃপের উচ্চতা । মনম্থরের মনে যদি আরও ছু'চারখানি পাল 
থাকিত, বুঝিতে পারিত যে, কেট ভগ্নস্তুপের প্রান্তে লগ্ন সন্ধ্যাতারা» 
স্তুপ সমূলে ধনিয়া পড়িলেও সে এক তিলও কাছে আপিবে না। 


"আরে শয়তানী, তৃুই গোপনে কোম্পানীর ফৌজকে খবর 
পাঠিয়েছিলি ? 


চাপাটি ও পদ্লপ ১০৪ 


মনম্্রের অভিযোগ শুনিয়া মিস মাটিনডেল ছেড়া মারের উপরে 
উঠিয়া বপসিল, মনে মনে উল্লাস অনুভব করিল, অথচ কিছুই বোঝে নাই 
ভান করিয়া বলিল, “কি হয়েছে? আমি বুঝতে পারছি না ।” 

“এইবার বুনবে-_* সপাং সপাৎ ছুই ঘা চাবুক তাহার শুভ্রদেহে 
নীলদাগ তৃলিল। 

“তোকে এখানে রেখে যাচ্ছি না শয়তানী” বলিয়া মনসুর তাহার 
চুলের মুঠি চাপিয়া। ধরিল। বলে পারা যাইবে না বুঝিতে পারিয়। 
মিস মাটি নডেল তাহার সঙ্গে বাহির হইল, দেখিতে পাইল রাত্রিশেষের 
আবছায়া অন্ধকারের মধ্যে লোকজন গ্রাম পরিত্যাগ করিয়। ভুটা 
ক্ষেতের দিকে চলিয়াছে, মনন্তুরের দ্বারা চালিত হইয়া সেও সেইদিকে 
চলিল। 


কোম্পানীর ফৌজ গ্রাম ঘেরাও করিয়া ফেলিয়াছে ! রবার্টস, 
প্রবিন ও ওয়াটসনের নেতৃত্ত্ব একদল সিপাহী গ্রামে প্রবেশ করিল। 
সঙ্গে অঞ্জন তেওয়ারী, পথপ্রদর্শক ন্যাড়া গোপাল। তাহার গ্রামে 
ঢুকিয়! দেখিল কোথাও জনপ্রাণী নাই, ঘর খালি, দরজা! খোলা, ভিতরে 
ন1 ঢুকিয়াই সব দেখিতে পাওয়া যায় । 

রবার্টস শুধাইল, “একি লোক সব গেল কোথায় ?” 

হ্যাড়া গোপাল বলিল “মানুষ তো৷ পাখী নয় যে উড়ে পালাবে, 
কাজেই কোথাও আছে ।” 

“কিন্তু কোথায় ?” 

অন্ধুসন্ধান চলিতে লাগিল। হঠাৎ গোপাল বলিয়া উঠিল, “ঘরে 
না থাকলে ভাড়ার ঘরে আছে?” 

“সে আবার কোথায় ? 


গায়ের চারদিকে ভূট্রাক্ষেত। গোপালের পৎথপ্রদর্শকতায় সকলে 
শস্তক্ষেত্রে ঢুকিয়া পড়িল, আর অচির মধ্যে তাহার কথার সত্যত। 
প্রমাণিত হইল। ইতস্তত সবাই আত্মগোপন করিয়া বসিয়। আছে । 

সাহেব দেখিয়। তাহাদের কেহ পলাইল, কেহ হাতজোড় করিল, 
কেহ বলিল, “হুজুর আমরা কিছু জানি নে ।” 


১০৫ চাপাঁটি ও পদ্ম 


“মেমসাহেব কোথায় ?” 

“আমরা জানি নে হুজুর” 

একজন বলিল, “মনসুর জানে ।” 

গোপাল বলিল, “মনসুর মেমসাহেবকে আটক রেখেছে ।।” 

আবার সন্ধান চশিতে লাগিল, কিন্তু না পাওয়! গেল মিস মাটিন- 
ডেলকে, না পাগুয়া গেল মনস্তরকে। সবাই ভাবিল তাহাদের 
আগমন আশঙ্কায় মিস মাটিনডেলকে লইয়া মনসুর গ্রামাস্তর়ে 
পলাইয়াছে । 


তখন সকলে হতাশ হইয়া ফিরিবে ফিরিবে ভাবিভোছে এমন সময়ে 
একজন পিপাহী চীৎকার করিয়া উঠিল, “এহি মেমসাহেব হ্যায় * 

লকলে দেখিতে পাইল অদূরে ভুট্রাক্ষেতের মধ্যে আবক্ষনিমগ্ন এক 
জন ইংরেজ তরুণী ছে'ড়া মেঘে প্রাতঃহূর্যা-কিরণের মতো তাহার 
গাত্রের হিন্নসন্ত্রের অবকাশে লাবণ্য ছড়াইয়া পড়িতেছে। তাহার 
বিত্রস্ত ব্বর্ণকুম্তলে ছু'এক গাছি কচি শস্তকিশলয়, পাণ্ুর তাহার কপোল, 
অধারে কচি অশোক পাতার বর্ণ, চক্ষু ছু'টি ভীত বিস্মিত চঞ্চল। 
উবার অধস্ফুট আলোকে ঈষপ্তিন্ন ম্যাগনোলিয়ার কুঁড়ির মতো! 
অস্ফুট শ্ুন্দরী। ঘরের আলোতে অনেককেই স্ন্দর দেখায়, আকাশের 
আলোতে কেবল যথার্থ সুন্দপীকেই নুন্দর মনে হয়। 

লৌহবক্ষ সৈনিক তিনজন স্থানকালপাত্র ভুলিয়া খিক্মিয়ে তাহার 
দিকে চাহিয়া! রহিল । 

প্রবিন আপনমনে বলিয়া উঠিল, 


“২1501 102 51000 101 1001700, 
9172 50000 11 62915 217010 0)6 91121) 0011৮ 


কিছুক্ষণ পরে সম্থিৎ ফিরিলে রবার্ট শুধাইল, “আশ করি তুমি 
মিস মাটিনডেল ?” 

তরুণী বলিল, “তোমার কথ! সত্য ।৮ 

“তোমাকে উদ্ধার করতে এসেছি” 

“তোমাদের অনেক ধন্যবাদ ।” 


চাপাটি ও পন ১০৬ 


“আশা করি তুমি যাবার জন্য প্রস্তুত ।” 

“এখনি ।» 

এমন সময়ে শ্যাড়া গোপাল চীংকার করিয়া উঠিল, “সাহেব, এ ষে 
মনস্থুরকে নিয়ে আসছে 1” 

সকলে দেখিল কয়েকজন সিপাহী একটি যুবককে আষ্টেপৃষ্ঠে 
বীধিয়া টানিতে টানিতে লইয়া আসিতেছে । 

মিস মাটিমডেল আত্মপ্রকাশ করিবামাত্র মনসুর বুঝিয়াছিল ষে, 
তাহার মেম সাহেবের স্বপ্ন এবারের মত শেষ, সে পালাইতেছিল। 
গ্রামবাসীরা সাহেবের করুণ! পাইবে আশায় তাহাকে ধরাইয়া দিয়াছে । 

মনস্ুরের সুন্দর, সুগঠিত, সবল দেহ বাঁধনের চাপে বিকল হইয়া 
বীভৎস দেখাইতেছিল। টানাটানিতে তাহার গায়ের কাপড় ছি'ড়িয়। 
খু'ড়িয়া গিয়াছে, পিঠের ফমণ রঙের উপরে মোটা মোটা কালশিরা 
দেখা যাইতেছে অথচ তাহার মুখের কমনীয়তা এতটুকু কমে নাই, 
চিবুকের সুডৌল দৃঢ়তা তেমনি অটুট । 

পুরুষের বীরবপুর এই বাঁভৎস অপমানে হঠাৎ মিস মাটিনাডলের 
অন্তরতম নারীপ্রকৃতি মোচড় খাইয়া আর্তনাদ করিয়া উঠিল। 
মানুষের গোপনতম সত্যতম যে পরিচয়, যেখানে পুরুষ আছে আর 
নারী আছে, পুরুষের দেন্তের বীভৎস ব্যঙ্গ নারীমনের সেখানে পৌছিয়া 
মিম মাটিনডেলকে একেবারে বিপ্রোহিনী করিয়া তুলিল। সে কেবলি 
মনে মনে বলিতে লাগিল, “এ অন্যায়, অন্যায় !” ূ 

মনস্তাত্বক হইলে সে বুঝিতে পারিত তাহার মনরূপ মাস্তলের 
চুড়ায় একখান। অতিরিক্ত অপ্রত্য শিত পাল খাটানে হইল । 

রবাটণস শুধাইল, “এই লোকটা তোমাকে কয়েদ করে রেখেছিল ?” 

«সিপাহীদের হাত থেকে উদ্ধার করেছিল ।” 

“ভারপর আটকে রেখেছিল ?” 

“কোম্প'শীর ফৌজ কাছে ছিল না কাজেই।” 


*এখন তো! ফৌজ এসেছে, চলো ।৮ 
“না 15 


১০৭ চাপাটি ও পদ্গপু 


“তার অর্থ?” 

“আমি এখানেই থাঁকব।” 

তিনজনে চমকিয়া৷ উঠিল, “তুমি কি বলছ? আমাদের বিশ্বাস 
তোমার মাথার ঠিক নেই ।৮ 


“মাথা ঠিক আছে ।” 
“তবে খবর পাঠিয়েছিলে কেন ?” 


সত্য কথা বলিতে হইলে অনেক বগিতে হয়, তত বলিবার শক্তি 
বা ইচ্ছা মিস মাটিনডেলের ছিল না। আর থাকিলেও কেন খবর 
পাঠাইয়াছিল, তারপরে কেনই বা হঠাৎ মতি পরিবর্তন করিল, সে-সব 
রহস্য সে জানিবে কি প্রকারে । শুধু বলিল, “একবার দেশের লোক 
দেখবার ইচ্ছা! হয়েছিল ।” 

“আর এখন এই বিদেশী লোকের মধ্যেই থাকবে স্থির করেছ ?” 

«নিশ্চয় ।” 

“আশা করি, মতি পরিবর্তন হবে ।» 

“আশা করি, হবে না।” 

«তোমার জন্য কি করতে পারি ?” 

“এ লোকটার বাধন খুলে দিতে হুকুম করো” 

মনসুর বন্ধনমুক্ত হইল। তাহার বিস্ময় সকলের চাইতে অধিক। 
প্রথমে বিপদ, পরে খিস্ময়, দুই ধাক্কায় সে বিষূঢ় হহয়। গিয়াছিল ; 
কথা বলিবার, ভাখিবার, কি হইতেছে সম্যক্রপে বুঝিবার শক্ত 
তাহার লোপ পাইয়াছিল। 

একজন ইংরাজ-রমণীর বিকৃত রুচি ও অধঃপাত দর্শনে ইংরাজ 
সৈনিকত্রয় ভারতে ইংরার্জ সাম্রাজ্যের পরিণাম সম্বন্ধে বিশেষ উদ্বিগ্ন 
হইয়া উঠিল, কিন্তু তাহাদের কিছু আর করিবারও ছিল না। তাহার! 
আর একবার মিস্‌ মাটিনডেলকে অন্থুরোধ করিয়। ফিরিবার জন্ প্রস্তত 
হইল। 

তাহারা একটু দূরে যাইবামাত্র মনন্ুর মিস্‌ মাটিনডেলের কাছে 
গেল, অঙ্থরোধের সুরে বলিল, “এবার ঘরে ফিরে চলো ।” 


চাপাঁটি ও পদ ১৩৮” 


মিস্‌ মাটিনডেল মুখ ফিরাইয়া লইয়া বলিল, “চুপ করো নির্বোধ 

মনন্ুর ভাবিল, এ আবার কি বিপদ। 

ন্যাড়া গোপাল স্থির করিয়াছিল, সে আর এ গ্রামে থাকিবে না, 
সাহেবদের সঙ্গে যাইবে। সে মনম্ুরকে উদ্দেশ করিয়া বলিল, “ফিরিঙি 
মেয়েদের মনের কথ! বোঝে কোন্‌ শালা ! যেমন ইদ্্রি মিদ্রি ভাষা; 
তেমনি ইদ্রি মিদ্রি ভাব। ঠ্যালা! বুঝবে ভাই মনসুর ।৮ 

মনসুর ইতিমধোই বুঝিতে আরম্ভ করিয়াছে । 

সকলে গ্রামে ফিরিয়া গেল। কেবল মিস্‌ মাটিনডেল সেই 
অর্ধপক্ক শস্যক্ষেত্রের মধ্যে তেমনি আবক্ষ নিমগ্ন থাকিয়া দেখিল, তাহার 
স্বজাতি পুরুষত্রয় ত্রমেই ক্ষুদ্রতর হইয়া অস্পষ্টতর হইয়৷ মিলাইয়! 
যাইতেছে, আর মনের ক্রিয়া সম্বন্ধ সচেতন থাকিলে বুঝিতে পারিত 
বে, মাস্তুল ক্রমে নূতন নৃতন পাল তুলিয়া দিতেছে । অপরিচিত 
আকাশের অভাবি- হাওয়ায় এই তরুণ-তরুণী কোথায় গিয়া পৌছিবে, 
কোন্‌ বন্দরে, কোন্‌ আঘাটায়, কোন অতলে | 


নানাসাহেব 


দিপাহী বিদ্রোহ নিটিয়৷ গিয়াছে কিন্তু এখনো তাহার জের 
চলিতেছে । বিদ্রোহের নেতাদের মধ্যে এখনে। অনেকে ধরা পড়ে নাই, 
ভারতময় তাহাদের সন্ধান চলিতেছে, জের বলিতে ইহাই । দিল্লীর 
বাদশাহ শির্বাসিতঃ ঝান্সীর রাণী লক্ষ্মীবাঈ সন্মুখ-সমরে নিহত, তাতিয়। 
(টাপির ফাসি হইয়া গিয়াছে, ফৈজাবাদের মৌলবিও নিহত | নানাসাহেৰ 
ও তাহার দক্ষিণহস্ত আগ্রিমুল্লা খা এখনো ধরা পড়ে নাই। আরও 
একজন ধর! পড়ে নাই, সে বিখ্যাত নয়, কিন্তু বিবিঘরের হত্যাকাণ্ডের 
প্রধান দায়িত্ব নাকি তাহারই, মে নানাসাহেবের হারেমের একজন 
ক্রীতদ্রাসী, নাম জুবেদি বিবি 


নানামাহেবকে গ্রেপ্তার করিবার জন্য দিকে দিকে প্রদেশে প্রদেশে 
গ্রেপ্তারি প/রায়ান। প্রেরিত হইয়াছে, প্রচুর অর্থমূল্যও ঘোষিত হই- 
য়াছে, কিন্ত এখনে। তাহাকে পাওয়া যায় নাই। তবে পুরাদমে সন্ধান 
এখনো চলিতেছে, দক্ষিণে মাদ্রাজ, উত্তরে নেপাল, পূর্বে আসাম আর 
পশ্চিমে সীমান্ত প্রদেশ চযিয়া৷ ফেলা হইতেছে, নানাসাহেবকে ধরিতেই 
হইবে। 


মাঝে মাঝে রব ওঠে নানাসাহেব ধর। পড়িল। ধৃত ব্যক্তিকে 
কানপুরে আন! হইলে পরীক্ষা ও প্রশ্ন করিয়া দেখা যায় যে, সে নিরীহ 
সন্ন্যাসী বা ফকির মাত্র। নানা দেশ হইতে গুগুচরেরা আলিয়া বলে 
যে, নানাসাহেবকে দেখ। গিয়াছে, কখনে। মন্দিরে, কখনো মসজিদে, 
কখনে। হাটে-বাজারে গঞ্জে গ্রামে ব কোন রেলফ্টেশনে । কিন্তু “এ 
বাঘ, এ বাঘ' রব এতবার উঠিয়াছে যে এরূপ সংবাদে এখন আর কে 
বিচলিত হয় না। বস্তুতঃ এখন অনেকেই বিশ্বাস করিতে শুরু করিয়াছে, 
যে, নানাসাহেব মারা গিয়াছে । নানাসাহেবের অস্তিত্ব সম্বন্ধে তিনটি 


চাপাটি ও পঞ্ ১১০ 


মত ফ্রাড়াইয়াছে। কয়েকজন অভিজ্ঞ ব্যক্তির ধারণা যে নানাসাহেৰ 
১৮৬০ সালে নেপাল বা! নেপালের তরাই অঞ্চলে মার! গিয়াছে । 
তাহারা বলে যে, এ সময়ে নানার যে সঙ্গিগণ নেপাল হইতে ফিরিয়। 
আপিয়াছে, তাহাদের জিজ্ঞাসাবাদ করিয়া এই সিদ্ধান্ত পাঁওয়। গিয়াছে, 
তাহাদের মিথ্যা বলিবার কি হেতু থাকিতে পারে? এই সব সঙ্গীর 
মধ্যে নানার নাপিত অন্যতম । তাহাকে নানার মৃত্যু বিষয়ে প্রশ্ন 
করিলে এইরূপ উত্তর পাওয়া যাইত £ 

--তুমি নানাকে কামাতে ? 

--কাকে কামাতাম ? 

-নানাকে? 

_+£ সেই বাটপাড়কে ! হা বাটপাড়কে কামাতাম বটে ! 

--জপ্তাহে কবার ? 

-_স্প্তাহে ছবার। বাটপাড় ! 

--এখন আর নিশ্চয় তার কামাবার দরকার নেই। সেনিশ্চয় 
মরেছে, কি বলো ? 

-মরেছে বলে মরেছে, একশবার মরেছে । খুব ভালো হয়েছে। 
বাটপাঁড়ট। ! 

নানা মারা পড়িয়াছে কিন তবু সংশয়ের রাজ্যে থাকিয়া যায়, 
কিন্তু কৃতজ্ঞতা যে মারা পড়িয়াছে সে বিষয়ে কোন সংশয় থাকে না। 
মানুষ এমনি বটে ! 

আর এক দলের লোক বলে নানা মরুক আর বাঁচিয়াই থাকুক 
তাহাতে এখন আর আশঙ্কার কিছুই নাই, সে পলাতক আসামী, 
দেশে তাহার আর প্রভাব নাই। অতএব তাহাকে গ্রেপ্তার করিবার 
জন্য এত প্রচুর খরচ করিবার আর প্রয়োজন কি? 

তৃতীয় দলটিই সংখ্যায় ও প্রভাবে প্রবল । তাহাদের অধিকাংশই 
সরকারী কর্মচারী । এই উপলক্ষে তাহারা প্রচুর বেহিসাবী টাকা ও 
রাহা-খরচ পায়, তাহাদের বিশ্বাসের অস্থকূলে এ মস্ত একটা! যুক্তি । 
তার উপরে আবার বিলাত্ত হইতে একদল মোটা-বেতনের বিশেষজ্ঞ 


১১১ চাপাটি ও পদ্ধ 


আসিয়াছে, তাহাদের কেহ হাতের অক্ষরে বিশেষজ্ঞ, কেহ নাকের 
আকৃতিতে, কেহ চোখের দৃষ্টিতে, কেহ বৃদ্ধ'হুষ্ঠে, কেহ বা পদচিহ্ে 
বিশেষজ্ঞ । এখন সরকার ভাবে, “নানা মরিয়াছে' স্বীকার করিলে 
ইহাদের বিদায় করিয়। দিতে হয়, ষে প্রচুর পুলিশ ও গুপ্তচর ইতস্তত: 
ঘুরিয়া বেড়াইতেছে তাহাদের দল ভাঙিয়। দিতে হয়, সে এক হাঙ্গামা, 
হয় তো বা পালপামেন্টে প্রশ্নোত্তরে ভারত সরকারের অকর্মণাত। 
ঘোষিত হইবে; তাই সরকার নীরব, ভাবে 'অশুভস্য কাল হুরণং" নান 
মরুক আর বাচিয়া থাকুক তাহার! ন। মরিলেই যথেষ্ট। 

ভারতের নানা স্থানে নানাকে ধরিবার জন্য বিশেষ ঘখটী বসিয়াছে, 
কোন লোক ধর! পড়িবামাত্র সে কানপুরে আনীত হয় ; দেশময় যে 
শত শত নানাসাহেব ধূত হইতেছে তাহাদের আমল নকল বিচার করিয়! 
মুক্তি দানের ব| হাজতবাসের আজ্ঞা দ্রানের একটি ক্রিয়ারিং হাউসে 
পরিণত হইয়াছে কানপুর সহর। এত সহর থাকিতে কানপুর সহর 
নির্বাচিত হইবার বিশেষ কারণ আছে। কানপুরের কাছে বিঠুরে নান! 
দীর্ঘকাল হিল, এ অঞ্চলের বহু লোকের কাছে নানা পরিচিত, তাছাড়া 
কানপুর সহরটা বিদ্রোহ-প।ড়িত অঞ্চলের কেন্দ্রে অবস্থিত, সেটাও 
একট কারণ বটে । 

কানপুর সহরের প্রকাণ্ড জেলখানা যেমন নান। শ্রেণীর নানাসাহেবে 
ভরিয়া গিয়াছে তেমনি মামুদের হোটেল নামে সৌখীন হোটেলটিও 
বিশেষজ্ঞ, উচ্চ শ্রেণীর সরকারী কর্মচারী, কৌতৃহুলী ইংরাজ অতিথি- 
অভ্যাগতে পূর্ণ। হোটেলের মালিক মাধুদর আলি হাপিখুশি মুখ, 
গোলগাল সুপুরুষ, নানাকে বেশ চিনিত, কেননা বিদ্রোহের সময়ে নান! 
কয়েক মাম এই হোটেলেই আশ্রয় লইয়াছিল। 

কোন বিদেশী অতিথি যদি শুধাইত--নান1 কি ভোটেলের খানা 
খেত ? 

“বিসমিল্া” বলিয়। মামুদ আলি কপালে হাত ঠেকাইয়া বলিত,-- 
হোটেলের খানা ! সর্বনাশ ও-কথা মুখেও আনবেন না, কে কোথায় 
শুনতে পাবে। 


চাপাটি ও পক্স ১১২ 


তবে খেতো কি? 

এই ঘণ্টায় আস্থন। এখানে নানার জন্য চুল্লি প্রস্তুত হয়েছিল, 
তাতে হাড়ি চাপিয়ে হাড়ি মানে 7:2160612 0০0৮-১১,, 

ওঠ। তার প্রিয় খান্ক কি ছিল? 

ঘি, মানে 01211569 08৮০3 আর এই ঘরটায় একট। চার- 
পায়া পেতে নান। শুতো। | 

ঘরে আর কোন আসবাব ছিল? 

আসবাব? না। হা, তবে একটা বাছুর ঘরময় অবাধে দ্বুরে 
বেড়াতে, আর একটা চাকর সোনার বাটীতে ক'রে তার চোনা, 
মানে” 

মানে শুনিয়া সাছেবেরা বলিয়। উঠিত, 1১০৯ 10101019, তারপরে 
শুধাই ত, সেটা কি করতে। ? 

খেতো। । 

সাহেবগণ চমকিয়া উঠিত, ইংরাজী ভাষায় মনোভাব প্রকাশের 
যোগ্য শব না পাইয়া তাহারা অবিলম্বে গৃহত্যাগ বরিত। কেহ 
কেহ আবার মনে মনে যুক্তিজাল বুনিয়। স্থির করিত উক্ত বস্তু যখন 
খায় তখন উক্ত বস্তুর আধারটিকেও অবশ্য খাইত। কোন কোন 
দুঃসাহসী ভাবিত একবার গোপনে উক্ত বস্তুট। চাখিয়। দেখিতে হইবে। 
নানা কি খামোকা খাইত, তাহার তো। অভাব ছিল না, সে ভাবত 
দেশে ফিরিয়। এ বিষয়ে একখানা বই লিখিয়া ফেলিবে, প্রকাশকের 
অভাব হইবে না, এখন নানাসাহেবের বাজার-দর চড়া । 

নানার সম্বন্ধে সাহেবগণের মনোভাব যেমনি হোক, হোটেলের 
মালিক মামুদ সম্বন্ধে তাহাদের অন্ুুকম্পার অন্ত ছিল না। সে 
প্রত্যেকের রুচি অনুযায়ী খানা জোগাইত, মদ জোগাইত “অমুক 
জিনিষটা পাওয়। গেল না” এ কথ! কেহ তাহার মুখে শোনে নাহ, 
বিল আদায় করিতে, ফাইফরমাস খাটিতে সে সধদাই প্রস্তুত, আর 
তার সবচেয়ে বড় গুণ সে সময়মতো হাসিতে পারে । এ গণটি যার 
আয়ন, সংসারে সে সবজয়ী। সর্বজয়ী এই গুণটির বলেই বেতশসীবৃত্তি 


১১৩ চাঁপটি ও পদ্ম 


অবলম্বন করিয়া সে কোম্পানীর আমলে হোটেল চালাইয়াছে, নানার 
আমলে চালাইয়াছে এবং খাস মহারাণীর আমলে চালাইতেছে, কেহ 
কখনো তাহার সততায় সন্দেহ মাত্র প্রকাশ করে নাই। মামুদ 
হাসিয়। বলে, হোটেলওয়ালা, জল্লাদ ও টেবিল-খানসাম। বা 21617 
এর সম্বন্ধে বাছবিচার করলে চলে না। 


হোটেলের হেড ওয়েটারটি সম্বন্ধে মামুদ সাথক গর্ব অনুভব 
করিত, বলিত, এ যে বিঠুরের ইদারার মধ্যে নানাসাহেবের একরাশ 
সোনার তৈজসপত্র পাওয়া গিয়াছে, সেগুলোর বদলেও সে ইসাককে 
ছাঁড়িতে নারাজ। ইসাক তাহার প্রখ্যাত হেডওয়েটার। সেষে 
কোথা হইতে আসিল, কি তাহার পূর্ব্বেতিহাস কেহ জানিত ন। 
কেহ জিজ্ঞাসাও করিত না, যাহারা জিজ্ঞাসা করিবার মালিক তাহার 
সকলেই ইসাকের গুণে মুগ্ধ । মুখ খুলিবার আগেই সে মনের কথা 
বুঝিতে পারে, আবার এমন মনের কথা আছে কণ্ঠ পধ্যন্ত পৌদ্বিবার 
আগেই ইসাক তাহা তামিল করিয়া বসে। দিন এবং রাত্রির যাবতীয় 
পরিচর্যায় ইসাক এমনি পার্ঙ্গত যে, সাহেব-বিবি অতিথি-অভ্যাগত 
দেশী-বিদেশী সকলেরই মুখে এক কথা, ইসাক, ইসাক। খানসামা- 
স্থবলভ চাপকানে ইসাক সজ্জিত, মাথায় টুপি, পা খালি এবং মুখে 
হোটেলের মালকের মতোই সর্বজয়ী হানি । তবে মামুদের ও 
ইসাকের হাসিতে কিছু প্রভেদ ছিল। মামুদ সকলকে দেখিয়া সমান 
হাসি হাসিত, কিন্তু ইসাকের হাসিতে তারতম্য ছিল, লোকের পদ- 
মর্ধাদা বিচার করিয়া সে হাঁনত; কাহারে জন্য তাহার ওষ্ঠাধরে 
হাসির মোহর, কাহারেো। জন্য হাসির টাকা, কাহারে জন্য বা হাসির 
আধুলি বা সিকি ছুয়ানি, নিতান্ত হীনমর্ধাদার জন্য পয়সা বা পাই, 
কেহই একেবারে বঞ্চিত হইত ন1। 


মামুদের হাসি বলিত, তোমরা সকলেই আমার অতিথি, আমার 
চোখে তোমরা সবাই সমান, আর ইসাকের হাসি বলিত সকলকে 
সমান করিলে আমার চলে না, কে বেশি দামের খদ্দের কে কম 


চাপাটি ও পদ্ল ১১৪ 


দামের, কে জেনারেল, কে কর্ণেল, কে মেজর আমার জান চাই; 
বন্ততঃ মামুদের হাসি ও ইসাকের হাসি পরম্পর পরিপূরক । 


আরও একটি কারণে সরকারী মহলে ইসাকের খুব প্রতিপত্তি 
ছিল। সে নানাসাহেবকে ঘনিষ্ঠভাবে চিনিত, মে ছিল সরকারী 
সনাক্তকারী। এই যে নানাদেশ হইতে শত শত নানা আসিয়। 
জেলখানা ভরিয়া তূলিতেছে কে তাহাদের সনাক্ত করিবে? নানাকে 
যাহারা ঘনিষ্ঠভাবে জানিত তাহার! হয় মরিয়াছে, নয় পাঁলাইয়াছে, 
নয় অন্ত কারণে সনাক্তকার্য্যে অসন্মত। এই সঙ্কটে ইসাক একমাত্র 
রক্ষাকর্তা। সে দীর্ঘকাল বিঠুরে ছিল, কানপুর সহরেও সে কতবার 
নানাকে দেখিয়াছে কাজেই সে-ই যোগ্যতম ব্যক্তি । খানা ও মদ 
রুচি মতো যে ব্যক্তি জোগান দিতে সক্ষম, সে বিশ্বাসভাজন না হইয়। 
যায় না, আর বিশ্বাসভাজনের সব কথাই সমান বিশ্বাসযোগ্য। 
সপ্তাহে একদিন করিয়া ইসাকের ডাক পড়িত (জেলখানায় সনাক্ত- 
করণের প্যারেডে।! সে গিয়া দেখিত এমন হাজার ছুই নান! সারিবদ্ধ 
দণ্ডায়মান : বয়স বাইশ হইতে বিরাশি, মাথায় চার ফুট হইতে সাত 
ফুট, জাতিতে বাঙালী হইতে পাঠান-আর সবচেয়ে বেশি সাধু 
সন্গ্যাপী পীর ফকিরের সংখ্য।। যে গেরুয়া এবং যে আলখাল্লায় 
জীবনের অনেক ছুদ্কৃতি ঢাকা পড়ে, চিত্রগ্ুপ্তের চোখে ধুলি দেওয়। যায়, 
সেই পোষাকই তো আত্মগোপনের শ্রেষ্ঠ উপায়, তাই সম্ভবতঃই 
সাধ-সন্গ্যাসী আর গীর-ফকিরের সংখ্যাই কিছু অধিক। ইসাক 
সারিবদ্ধ নানাদের সন্মুখ দির সবেগে চলিয়া যাইত, তারপরে অদূরে 
দণ্ডায়মান জেনারেল সাহেবের নিকটে আসিয়া সেলাম করিয়া! বলিত, 
হুজুর, তামাঁম বুট] । 


সাহেব জেলারের প্রতি ইঙ্গিত করিত, বলিত, খালাস দে! । 


নানার দল ছুটি পাইত।. কিন্তু জেলখানা কখনো খালি হইত 
না, কারণ বাল্যকালে যাহার চৌবাচ্চার অঙ্ক কষিয়াছে তাহারা জানে 
এক নলে জল বাহির হইতেছে, আর এক নলে জল ঢুকিতেছে, ফলে 


১১৫ চাপাটি ও পদ 


চৌবাচ্চা যেমন পূর্ণ তেমনি পূর্ণই থাকিত। আর একদল নৃতন 
নানা আসিয়। জেলখান৷ ভরিয়! তুলিত। 


আর এক কারণে সাহেব-মহলে ইসাকের ডাক পড়িত। বিদেশী 
আসিয় নানার কাহিনী শুনিতে চাহিলে ইসাক ছাড়া আর কে 
শুনাইবে ? একদিনের কথ বলি। সেদিন ছুইজন বিদেশী অতিথি 
আদিল, একজনের নাম মশিয়ে লুবলিন, সে ফরাসী; আর একজনের 
নাম মিটার জর্জ, সে ইংরাজ। ছু'জনেই দেশে থাকিতে পুস্তকে ও 
পত্রিকাঁয় নানার কাহিনী পড়িয়াছে! 

ড্রয়িংরুমে বলিয়া লুবলিন ও জর্জে নানার বিষয়ে আলোচন৷ 
হইতেছিল, অদূরে বিনীতভাবে ইসাক দণ্ডাযমান। সে একবার 
মশিয়ের দিকে তাকাইয়। হাসে, আর একবার মিষ্টারের দিকে তাকাইয়। 
হাসে, মিষ্টারের প্রতি প্রযুক্ত হাসিটি প্রশস্ততর, কারণ যদিচ হোটেলের 
অতিথি হিসাবে ছুজনেই সমান আদরণীয়, তবু মিষ্টার যে রাজবংশীয়, 
তাহার রাজপ্রাপ্য তো মশিয়ের সমান হইতে পারে না ! 

মশিয়ে বলিতেছে, মিষ্টার, নান। সন্বন্ধে আমার ধারণ! কি জানেন ? 
কাশ্মীরী টিলা পোষাক গায়ে, পাশিয়ান চটি পাঁয়ে গদির উপরে 
গড়াচ্ছে, পাশে দাড়িয়ে ছ'জন খাপ-ন্ুরৎ মেয়ে ময়ুরপুচ্ছের 
পাখা ছুলিয়ে বাতাস করছে, আর বালজাকের 19911 
56010193 পড়বার ফাকে ফাঁকে পায়ের কাছে অধশায়িত অধনগ্ন 
ইরাণী মেয়ে ছুটোকে মাঝে মাঝে সে চিমটি কাটছে।. এমন পনয়ে 
একজন সিপাহী সডীনের ডগায় বিঁধিয়ে নিয়ে এলে। একট! ইংরাজ 
শিশুকে, সেটাকে দেখবার জন্যে উঠে দাঁড়াতেই তার কোলের মধো 
থেকে একট! মিশরীয় বেড়াল লাফিয়ে পড়ল, ছেলেটাকে ভালো করে 
দেখবার জন্তে দে নাক-টেপা চশমাটা পরে নিল, তাড়াতাড়ি উঠবার 
সময়ে সেট! খুলে পড়ে গিয়েছিল। 

মশিয়ে ইসাকের দিকে তাকালো, ইসাক মাথ। ঈষং নত করে 
একবার হাসলো। 


চাপাটি ও পদ্ল ১১৬ 


কিন্তু জর্জের সে রকম মনোভাব নয়। সে বলল, মশিয়ে, নরকের 
সেই কীট-ট সম্বন্ধে আমার ধারণ অন্থরকম। কি রকম বলবো !-- 
(0৮79৬710615 209গতৈ (৫৮ 79৮7০5-এর যে মৃতিটা আমরা 
আমরা দাহ করে থাকি অনেকট। তারই মতো [৪১৪-র (মিষ্টার 
কৃত উচ্চার্ণ ন্যান্তা ) চেহারা, তবে আরও ভীষণ কেননা) প্রাচ্যদেশের 
চেহারা স্বভাবতঃই কুৎসিত। তার মাথাট! প্রকাণ্ড একট! হাড়ির 
মতন, লেখাপড়া কিছুই জানে না, কোন অন্ুচরের উপরে রেগে গেলে 
তখনই পদাঘাতে তাকে নিকেশ করে ফেলে, আর তার প্রিয় খাস্ঠ 
শিশুদের লিভার। আর রোজ রাত্রিবেল।৷ সে কুমারী মেয়ের 
হৃংপিণ্ডের চাটনি খায় স্বাভাবিক শক্তি অর্জনের আশায় ! 0129৪ 
ড211691012 100179021: ! 

মিষ্টার ইসাকের দিকে তাকাইবামাত্র ইসাক মাথা আরও একটু 
নত করিয়। প্রশস্ততর একটি হাপি হাসিল। 

কিন্ত মিষ্টার মশিয়ে নয়, হাসির প্রকৃত মুগ্য না৷ দিয়াই সে বলিয়া 
উঠিল, ৪ 0০6 ! 

মিষ্টার নিজের বর্ণনার চাপে নিজেই ক্লান্ত হইয়া পড়িয়াছিল। 

ছুটি পেগ মিষ্টার ও মঁশিয়ের যথা স্থানে গমন করিলে মশিয়ে 
বলিল --ইসাক, তুমি তো! জানতে নানাকে, বল তো সে কেমন ছিল! 

ইশাক ছুজনের দিকে তাকাইরা হবার হাসিয়া লইয়া আরম্ভ করিল, 
সাহেব, আপনাদের কল্পনার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাস্তব পারবে কেন? 
যে সব গুণের আপনারা উল্লেখ করলেন হতভাগ্য নানার সে-পব কিছুই 
ছিল না। সে নিতান্ত সাদামঠা লোক, বেঁচে থাকলে বয়ম এতদিন 
চল্লিশ থেকে পঞ্চাশের মাঝে হত, রঙ কালো, কারণ যে সব লোক 
ইউরোপের বাইরে জন্মেছে আপনাদের চোখে তারা সবাই কালো, 
মোটাসোটা? দোহারা চেহারা । খেতো৷ চাপাটি আর ডাল, তা-ও 
আবার অনেক সময় স্বহস্তে তৈরী করে। তার হারেমে অবশ্য অনেক 
স্ত্রীলোক ছিল, কিন্তু সেটা তাদের অন্যত্র যাবার ইচ্ছার অভাবে! 
ফরাসী ভাষা দূরে থাক, ইংরাজি ভাষাও জানতো না বললেই হয়। 


১১৭ চাপাঁটি ও পদ 


আর নাকটেপা চশম1! তার এজেন্ট আলিমুল্লা খার একজোড়া কানে 
পরানো চশম1 ছিল বটে ! 

এই বলিয়! সে মিষ্টার ও ঈশিয়ের দিকে তাকাইয়। হাসিল, ভাবটা 
এমন যে, আপনাদের বর্ণনাই ঠিক। 

মশিয়ে বলিল, হাউ ট্রথফুল অর্থাৎ, তোমার বর্ণনা শুনে মনে হয়, 
সে ছিল তোমার মতোই দেখতে । 

মিষ্টার বলিল, £১]] 01010100815 216 11875 অর্থাৎ নিশ্চয় সত্য 
গোপন করবার চেষ্টা করছ । 

ইসাক দুজনর কথাতেই এমনভাবে হাসিল, যেন বলিল, আপনার 
ছুজনেই সমান সত্য কথা বলিয়াছেন । 

এমন অপরিসীম ধৈর্য্য, কৌশল, মানব-চরিত্রজ্ঞান ও বুদ্ধি ইসাকের 
মামুদের কথাই ঠিক, তুচ্চ সোনার দামে ইসাঁকের দাম! সত্যই 
ইসাকের তুলন! হয় না। 


বৃ 


১৮৬৮ সালে উত্তর ভারতে ভয়াবহ তুভিক্ষ দেখা দিল। তাহার 
একটি বাস্তব ফল হইল যে, নানাসাহেবের সংখ্য। অনেক গুণ বাড়িয়া 
গেল। আগে আসামী খুঁজিয়া বেড়াইতে হইত, এখন আসামী 
সরকারী লোক খু'জিয়া বাহির করিয়৷ ধর! দেয় । আগে সাধু ফকিরের 
সংখ্যাই বেশী ছিল, এখন গৃহীর সংখ্যাও বাড়িয়া উঠিল। গুহীর 
খাস্াভাব, সাধু ফকিরের ভিক্ষার অভাব। সকলেই জানে যে হাজতে 
রাখিলে খাইতে দেয়, আরও শুনিয়াছে যে, একবার আসামী বলিয়। 
সনাক্ত হইতে পাঁরিলে পুলিপোলাও চালান হইবে তখন আর খাওয়া 
পরার চিন্তা করিতে হইবে না। সকলেই ভাবে, আহা এমন সৌভাগ্য 
কি হইবে, যে পোড়া কপাল ! 

একদিন সকালে সীতাপুর থানায় জনকয়েক নানা আিয়। উপস্থিত 


চাঁপাটি ও পদ্ম . ১১৮ 


হইল, হাকিল, কইগে দারোগা সাহেব, আমাকে গ্রেপ্তার করো, আমি 
নানা সাহেব । দারোগ। আসিয়া দেখিল অনেকগুলি উমেদার। সে 
বলিল, এক সঙ্গে এতজন তে! নান। হতে পারে না। 


নইলে নান। বলেছে কেন? একজন হ'লে তে! একখানা বলিত। 

দারোগা খোজ করিয়া জানিল যে, লোৌকটি পাঠশালার পণ্ডিত। 
বলিল, নইলে আর অমন বুদ্ধি হয় ! 

তোমার অত বিচারের কাজ কি! তুমি সকলকে চালান দাও, 
যার ভাগ্যে আছে নান। সাহেব হবে। 

দারোগ। বিরক্ত হইয়া বলিল, গ্রেপ্তার করতে নিষেধ আছে। 

পাঠশালার পণ্ডিত বলিল, ও বুঝেছি, কেউ বুঝি ছু'পয়সা 
খাইয়েছে। 

দেখে। ও-সব কথ! বললে আইনে পড়বে । 

আরে সেই ভরসাতেই তো বলছি। যে কোন একটা ধারায় 
গ্রেপ্তার করে! । 


দারোগ। কি করিবে ভাবিতেছে এমন অ্ময়ে এক দীর্ঘকায় বলিষ্ঠ 
সন্গ্যাপী আসিয়। উপস্থিত হইল এবং বিশুদ্ধ দেবভাষাঁয় বলিল, অয়ম 
অহম্‌ ভো--অর্থাৎ আমি নানাসাহেব, গ্রেপ্তার করো । 

দারোগা বলিল, তুমি তো সন্গ্যাসী ৷ 

বটে? সন্াসীর কি এমন হাতের গুলি হয়? 

এই বলিয়। বাহুর গুলি পাকাইয়া দারোগার দিকে অগ্রসর হইয়া 
গেল, বলিল, টিপিয়! দেখে, হাতের গুলি, না লোহার গুলি । 

দারোগা বলিল-মামি কি করবো ঠাকুর এরাও যে উমেদার, 
এই বলিয়। গৃহীদের দেখাইয়া দিল । 

তখন "তবে রে শালে বুরবক” বলিয়া! সেই বলিষ্ঠ সন্গ্যাসী লাঠি 
তুলিয়। গৃহীদের তাড়া করিল, তাহার! সামান্য গৃহী মাত্র, প্রাণের দায়ে 
নানাসাহেব পদের উমেদার হইলেও প্রাণের মায়া এখনো সম্পূর্ণ ত্যাগ 
কর্ধিতে পারে নাই । তাহার। পলাইল। 


১১৯ চাঁপাটি ও পঙ্সু 


তখন সন্ন্যাসীর অনুকূলে নানাসাহেবের পদ সাব্যস্ত হইয়া গেল। 
থানার বারান্দায় সে দিব্য জমাইয়া বসিয়া গম্ভীরভাবে দারোগাকে 
আদেশ করিল, এ বেট। আভি নানাসাহেবকো। খিলাও। 


উত্তর ভারতের প্রায় প্রত্যেক পুলিশথানাতেই প্রত্যহ এমন 
দৃশ্টের অভিনয় হইত। আর এই সব নানার ধার! যে মহাসমুদ্রে 
গিয়া মিলিত হইত সেই কানপুর সহরের দৃশ্য উপভোগ করা সহজ 
হইলেও বর্ণনা করা সহজ নয়। জেলখানার নিকটবত্তাঁ পাঁচ সাতটি 
বড় বড় বাড়ী ভি হইয়া গিয়া এখন খোলা মাঠে তারের বেড়া 
খাটাইবার ব্যবস্থা হইয়াছে । তাহ! দেখিয়া নানার দল জেনারেল 
সাহেবকে বলিয়! পাঠাইয়াছে-ও খরচাটা! নাই করিলেন, আমরা 
পলাইবার জন্ত আসি নাই। তাহারা আরও বলিয়া পাঠাইয়াছে যে 
তাহারা মহারষ্ট্রি রাজ্যের পেশব1, কাজেই আহারাদির সেই অনুপাতে 
ব্যবস্থা কর! বৃূটীশ রাজ্যের পক্ষে উচিত হইবে, পেশবা এখন গদিচ্যুত 
হইলেও এক সময়ে রাজা তে। ছিল বটে। 


জেনারেল সাহেব জেলারকে ডাকিয়া শুধাইল, হঠাৎ নানার সংখা 
বেড়ে উঠবার হেতু কি? 

জেলার বলিল, এতদিনে সরকারী মেশিন বেশ চালু হয়েছে 
কিনা? 

জেনারেল সাহেব বলিল,_-হুম্‌! জেলারের খাস মুন্সী মুখুজ্জে 
বলিল, সাহেব, খাঁন? বন্ধ করে দিন, নানার দল পালাবে। 

জেলার বলিল, তা৷ কেমন করে হয়? সনাক্তকরণ না হলে কাউকে 
ছাড়তে পারি নে। 

পরিবত্িত অবস্থায় এখন সপ্তাহে তিনর্দিন সনাক্তকরণ হয়ঃ 
ইসাকের কাজ খুব বাড়িয়া গিয়াছে । 

সেদিন ভোরবেলা সনাক্তকরণ আরস্ত হইয়াছে । জেনারেল 
দিভিল সার্জেন্ট, ম্যাজিষ্ট্রেট পুলিশ সুপার ও বিশেষজ্ঞগণ হাজির 
আছে । জেলার ও ইসাক সনাক্তকরণে অগ্রসর হুইয়াছে। 


চাপাটি ও পদ্প ৃ ১২০ 


ইসাক একটা লোকের কাছে একটু থামিতেই তাহার মুখ আশায় 
উজ্জ্বল হইয়! উঠিল। সে বলিল, আমিই, মিঞা সাহেব, আমি | 

তুমি কি বিবিদের হত্যা করেছিলে ? 

নিশ্চয়ই? এখন চালান না দিলে অতঃপর বাবাদেরও সাবাড় 
করবে । 

না! তুমি নও। 

তাহার দাবী অগ্রাহা হইল জানিবাঁমাত্র লোকটি বুক চাপডাইয়! 
উচ্চৈঃম্বরে কীদিয়া উঠিল-_মহারাণীর দোহাই লাগে জেলার সাহেব 
আমি সেই বাংলা যুলুক থেকে আসছি । মামলায় আর বন্যায় আমি 
সর্বস্বান্ত হয়েছি । রেলগাড়ীতে টিকিট কিনবার পয়সা অবধি ছিল 
না, নানা বলতেই চেকারবাবু ছেড়ে দ্িলে। বড় ভরসা করে এসেছি 
সাহেব, এখন তোমরা ঠেললে দাড়াই কোথায়? 

পাশেই জনকতক বরখাস্ত বাঙালী উমেদার ছিল। তাহার! 
বলিল, কান্নাকাটির যুগ নয় ভাই, সঙ্গে সঙ্গে গণবিক্ষোভ করি,অমনি 
ঢোলের সঙ্গে কাসীর মঙে। ছ্ব' চারজনের প্রায়োপবেশন করাও 
সঙ্গত হবে। 

একজন বলিল, আহা, আর কাসীর সঙ্গে শানাইয়ের মতো একখান! 
সংবাদপত্র থাকলে আজ কি ছশো। মজাই না হতো । 

অপর একজন বলিল, দেখতাম কেমন ওর! বাংলাদেশের দাঁবী 
অগ্রীহ্া করে। তখন তাহারা সকলে মিলিয়। 'বাংলার দাবী মানতে 
হবে, অবাঙালী নানা চলবে না” প্রভৃতি আওয়াজ করিতে করিতে 
প্রস্থান করিল। ইতিমধ্যে সনাক্তকরণ অনেকদূর অগ্রসর হইয়াছে, 
যাহাদের দাবী অগ্রাহ্য হইতেছে তাহার নীরবে বিষপ্নভাবে চলিয়। 
যাইতেছে, বাঙালী নয় বলিয়া! গণবিক্ষোভ বাধাইতেছে না। 

এমন সময়ে এক জায়গায় গোলমাল বাধিয়া উঠিয়াছে দেখিয়। 
ইসাঁক অগ্রসর হইয়! দেখিল যে, একজন মুসলমান ফকির ও একজন 
হিন্দু সন্গ্যাসীতে দাঙ্গ। বাধিয়া গিয়াছে । ফকির বলিতেছে যে, সে 
নানাসাহেব আর হিন্দু বলিতেছে যে, সে নানাসাহেব। আর উভয়পক্ষে 


১২১ | চাপাটি ও পদ্ম 


কিল, ঘুষি চলিতেছে । ভাগ্যে তখন সমাজচৈতন্ত এখনকার মতো 
প্রবল হইয়া ওঠে নাই নতুবা একটা! সাম্প্রদায়িক দাক্কা বাধিয়া যাইত । 

ইসাক বলিল, বাপু তোমরা কেহই তো নানাসাহেব নও । 

বলি চোখের মাথা কি খেয়েছ? দেখতে পাও না? 

আমি নানাসাহেব নই বলে কি তোমার বাপ নানাসাহেব ? 

ইসাক বিরক্ত হইয়া বলিল, স্বীকার করছি বাপু আমিই নানা- 
সাহেব । এবার হ'ল তো? 

টাদ আরকি! নাঁনাসাহেব; তো হয়ে এসেছ সনাক্ত করতে। 

সে বিষয়ে নানাসাহেবই তো সবচেয়ে যোগ্য ব্যক্তি । 

জেলার সাহেব কাছেই ছিল। সে “ডেশী বাষা উট্টমরূপে শিক্সা” 
করিয়াছে ;: ইসাকের ৬/1 দেখিয়া তাহার পিঠ চাপড়াইয়া বলিল, 
বনু আচ্ছা । 

তবে রে বেটা অলপ্পেয়ে। দাবীদার ছুইজনেও ইসাকের পিঠ 
চাঁপড়াইতে অগ্রসর হইল, তবে তাহার রকমটা ভিন্ন । 

তাহার! ছুইজনে একসঙ্গে ইসাককে আক্রমণ করিল। 

বল্‌ আমি নানাসাহেব। দেশে ভাত ভিক্ষে মেলে ন৷ আবার বলে 
কিনা নানাসাহেব নই । অপরে বলিল, আমার চোব্দপুরুষ নানাঁসাহেব। 

ইসাক প্রহ্ৃত হইয়! পলায়ন করিল। সেদিনের মতো সনাক্তকরণ 
প্যারেড শেষ হইয়! গেল । 

সন্ধ্যাবেলায় ইসাক জেনারেল সাহেবকে বলিলঃ হুজুর আমাকে 
এবার ছুটি দিন | এমন করে মার খেতে আর পারি নে। 

বলো কি ইসাক ! তুমি না থাকলে নানাকে ধরবে। কি করে? 
দেখহ তো সরকার কত খরচ করছে । না, না, তোমাকে কিছুতেই 
ছুটি দেওয়! চলবে না, তারচেয়ে তোমার সঙ্গে হু'জন পাঠান বডিগার্ড 
দেবো । 

এই ঘটনার কয়েক দিন পরে একদিন সন্ধার সময়ে একজন 
ভদ্রলোক ও একজন স্ত্রীলোক মামুদের হোটেলে ঢুকিয়৷ ডাইনিং কক্ষে 
গিয়া বসিল। ভদ্রলোকটির পরনে সাহেবী পোষাক, আর স্্রীলোকটির 


চাঁপাটি ও পদ্ম ১২২ 


পরনে মেম সাহেবের পোষাক। গায়ের রঙ দেখিলে তাহাদের পুরা 
ইংরাজ মনে হয় না, হয়তো বা ইউরোপীয়ান হইবে । 

ভদ্রলোক বলিল, তোমার পরামর্শে এলাম, এখন বিপদে না পড়ি। 
স্্রীলোকটি বলিল, ইসাকের চোঁখে পরীক্ষ। না হলে বুঝবে! কেমন 
করে? এ বিষয়ে এ লোকটাই তো বিশেষজ্ঞ। দেখো না৷ সরকার 
ওকে কত যত্ব করে পুষছে। 

যদি ধরে ফেলে? 

পাগল নাকি । আমি বলছি ধরতে পারবে না। মেয়েদের 
অশিক্ষিতপটুত্বের খ্যাতি শোন নি কি? তাছাড়া বিপদের ভয় তো? 
আমারও আছে। 

আচ্ছ! তাহলে ওকে ডাকি । 

পুরুষটির আহ্বানে ইসাঁক আঁদিলে দুজনের মতো খাবার আনিতে 
হুকুম করা হইল । 

ইসাক সেলাম করিয়া! খাবার আনিতে গেল। 

দেখলে তো ধরতে পারে নি। 

তাইতো মনে হচ্ছে। 

ইসাক খাবার আনিল। ছৃ'জনে হ্ৃষ্ট মনে খাইল। তারপরে দাম 
চুকাইয়। দিয়। ইসাককে কিছু বখশিশ দিল পুরুষটি । 

ইসাক সেলাম করিয়া বলিল, সেলাম আলিমুল্লা খা । 

বলে কি! শুনিবামাত্র পুরুষ ও স্ত্রীলোকটির মুখ শুকাইয়া গেল। 

পুরুষটি কিংকর্তব্যবিমূঢ় হইলেও স্ত্রীলোকটি প্রত্যুৎ্পন্নমতিত্বে 
বলিল, যাও ছৃ'পেগ মদ নিয়ে এসো । 

সে চলিয়। যাইবামাত্র পুরুষটি বলিল, বলেছিলাম ধরে ফেলবে। 
চলে। এখুনি পালাই । 

স্্রীলোকটি বলিল, লোকট। সারাদিন এসব নাম ভাবছে, তাই ভুলে 
বলে ফেলেছে । দেখব এর পরে হয়তো নানানাহেব বলেই মেলাম 
করে ফেলবে । তাছাড়া পালাবেই বা কোথায়? হোটেলের বাইরেও 
তো ইংরাজের রাজত্ব। 


১২৩ চাঁপাটি ও পদ্ম 


এমন সময়ে ইসাক ছু'পেগ মদ লইয়া! আমিল। 

দু'জনে পান করিল। এবারে মেয়েটি দাম চুকাইয়া দিয়! বখশিশ 
দিল। 

ইসাক সেলাম করিয়। বলিল, স্লোম জুবেদি বিবি। 

নাঃ, আর সন্দেহের এতটুকু অবকাঁশ নাই। ইসাক দু'জনকেই 
চিনিয়া ফেলিয়াছে। ভয়ে তাহাদের মুখ পাংশু ও জিহবা! শুষ্ক হইয়! 
গেল, তাহারা একটি কথাও বলিতে পারিল না । 

তাঁহাদের অবস্থা দেখিয়া ইসাক মুখে সেই সর্বজয়ী হালি টানিয়! 
আপিয়া বলিল--আজিমুল্ল খা, জুবেদি বিবি, আপনার! ভয় পাবেন 
না। সব চেয়ে নিরাপদ স্থানে এসেছেন, এখানে নির্ভয়ে থাকুন, কেউ 
আপনাদের চিনতে পারবে না । 

মেয়েটি বলিল, তুমি চিনলে কি করে? 

ইাক বলিল, আমার চোখে ধুলো দেওয়া কি আপনার কাজ ? 
আমি যে নানাসাহেবের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে পরিচিত। 

পুরুষ ও রমণী যুগপৎ শুধাইল, কিন্তু তুমি কে? 

এবারে ইসাক তাহাদের কাছে আসিয়া, কণ্ঠের স্বর অনেকখানি 
নামাইয়া আনিয়া একবার এদিকে ওদিকে তাকাইয়।৷ লইয়া *ছুস্বরে 
বলিল-আমিই নানাসাহেব। 


প্রায়শ্চিত্ত 


নেপালের দক্ষিণাঞ্চলে ভারত সীমান্তের কাছে প্রাচীন শাল ও 
সেগুন গাছের ছায়ায় ধানগড় একখানি মাঝারি গোছের গ্রাম | 
আগে গ্রামটি হতদরিদ্র লোকের বাসতৃমি ছিল, কিন্তু কয়েক বছর 
হইল “রাণীমা” আসিয়! এখানে বাস করিতেছেন, তাহার ব্দান্যতায় 
গ্রামটি এখন বদ্ধিষু। ধানগড় গ্রামের পৃবদিকে ছোট একটি নদী, 
এ দেশের সব নদীই গঙ্গা, নদীটির নাম ছুধগঞ্জা।। নদীর ধারে 
গ্রামের দিকে একটি প্রাচীন শিবমন্দির। লোকে বলে অর্জন 
এখানে মন্দিরটি নিম্মীণ করিয়া শিবের আরাধন! করিয়াছিলেন। 
শিবরাত্রির সময়ে এখানে মেল! বসে, এখন বসিয়াছে। যাহার! 
পশুপতিনাথের মেলা পর্য্যন্ত যাইতে পারে না এখানে দর্শন ও পুজ। 
করিতে আমে; এখন আসিয়াছে । শিবমন্দির হইতে এক সারি 
সোপান নদীর মধ্যে অনেক দূর পর্যন্ত নামিয়া আসিয়াছে, জল 
পর্য্যন্ত পৌছায় নাই, গ্রীন্বকাঁলে জল এখন অনেক নীচে, হাঁটিয়। পার 
হওয়৷ যাঁয়। 

নদীর পরপারে শালগাছের ছায়ায় বড় একখানি পাথরের উপরে 
একজন লোক আসীন | তাহার গৈরিক বসন, মাথার জটাভার, 
কমগুলু ও স্মদীর্ঘ লৌহ-ত্রিশূল প্রমাণ করে যে লোকটি মন্ন্যাসী এবং 
সম্প্রদায়ে শৈব। সন্ন্যাসী সুপুরুষ নয় কিন্তু তাহার মুখে চোখে 
ব্যবহারে এমন কিছু আছে যাহাতে লোকনায়ক বলিয়। মনে হয়। 

সন্ন্যাসী ওপারের শিবমন্দির, মন্দির-প্রাঙ্গণে মেলার ছাউনি 
প্রভৃতি দেখিতে ছিল সত্য কিন্তু তাহার চোখে এমন একট ওনুক্য ও 
প্রতীক্ষাপরতা ছিল যাহাতে সহজেই বুঝিতে পারা যায় যে সে 
কাহারো! অপেক্ষা করিতেছে, অনেকক্ষণ হইল অপেক্ষা করিতেছে মনে 


১২৫ চাপাটি ও পদ্ম 


হয়, কারণ তাহার মুখে আশাভঙ্গের ছায়। পড়িয়াছে। এখন সে 
অন্থমনস্কভাবে অভ্যাসবশে চাহিয়। আছে, মনোযোগের প্রধান ধারা 
অস্তমুখে বহিতেছে। সন্ন্যাসী প্রাচীন সংস্কৃতি রোমস্থন করিতেছিল। 

আপনাকে আমি আশ্রয় দিতে পারি এমন সাধ্য নেই, আমি 
কোম্পানীর সঙ্গে মৈত্রীতে বদ্ধ । 


আমি নিজের জন্য আশ্রয়প্রার্থী নই রানা সাহেব, কিন্তু আমার 
পতবী পিতামহী এঁদের নিয়ে কোথায় যাবো? 

সে কি কথা, এর! স্বচ্ছন্দে এখানে থাকুন না। এই গ্রামেই 
এ'র! বাস করবেন, আম মাসোহারা নিদিষ্ট ক'রে দেবে । 

অসংখ্য ধন্যবাদ | 

ধন্যবদ! পেশবাপত্বী আমার রাজ অতিথি, ধন্যবাদ তে। 
আমার দেওয়া উচিত। কিন্তু আপনি ? 

যার নাই অন্য গতি, তার আছে বারাণসী | 

কি সর্ধনাশ, আপনি কি কাশীতে যাবেন? 

না সে রকম ছুঃসাহসী আমি নই। ভক্তের হাদয়েই তো৷ বারাণসীঃ 
আমি সন্াস গ্রহণ করবো। 

তারপরে ? 

তারপরে পশুপতিনাথের রাজত্বে পাহাড় পর্বত গুহ অরণ্য তো 
অল্প নয়, সন্ন্যাসীর জায়গা হবে। তাতে বোধ করি আপনার আপত্তি 
নেই রান। সাহেব ! 

এই পর্বতের মধ্যে কে কোথায় ঘুরে বেড়াচ্ছে আমার সরকার 
তার কি সন্ধান রাখে নানাসাহেব। 

তা হলেই চলবে । 

ছয় বছর আগেকার প্রত্যেকটি বাক্য, প্রত্যেকটি দৃশ্ঠ, প্রত্যেকটি 
খুঁটিনাটি সন্ধ্যাসীর মনে পড়িল, এখানে আদিলে মনে পড়ে, মনে 
পড়িলে মন বিকল হইয়া যায়, মন বিকল হইলে অতীতের গৌরব, 
ভবিষ্যতের সঙ্ক্ সমস্ত মিথ্যা মনে হয়। তবে ভরসার মধ্যে এই ষে 


চাপাটি ও পদ ১২৬ 


বছরে একদিনের বেশী প্রাচীন কথা মনে পড়িবার পথ বন্ধ, বছরে 
একদিনমাত্র, শিবরাত্রির দিনটি সন্্যাসপী এখানে আসেন । রানা 
সাহেব সেই অন্ুমতিটুকু দিয়াছেন । রান! বলিয়াছেন কোম্পানীর 
চর চারিদিকে ঘুরিতেছে, ভারত সীমান্তের এত নিকটে ঘন ঘন আসা 
নিরাপদ নয় । তবে শিবরাত্রির সময়ে বিপদ কম | গ্রশ্বর্ষ্যের 
এরাবতে আসীন বিঠিরের নানাসাহেবকে হাজার হাজার সন্গ্যাসীর 
মধ্যে সন্ন্যাসীর বেশে সনাক্ত করা সহজ নয়। 

আজ ছয় বছরে ছয়বার মাত্র নানা- এখানে আসিয়াছে, ছয়বার 
মাত্র পত্বীকে দেখিয়াছে । সেদিন যাহার বয়ম ছিল চোদ্দ, আজ সে 
বিংশতিবর্ধীয়। । নানার দীর্ঘনিংশ্বাস পড়ে । 

রানা সাহেব এই হচ্ছে পেশবাদের প্রসিদ্ধ নৌলখা হার, 
আপনাকে বিক্রয় করতে চাই। থালার উপরে বিন্যস্ত নববর্ষাসমুৎফুল্ল 
শিখীর বিস্ফারিত কলাপের মতো চিত্রবর্ণ রত্বহার দেখিয়। রানার ক্ষুত্র 
চক্ষুছুটি লোভে ঈ্যায় বিস্ময়ে জলিয়া ওঠে । 

সত্যই অপুর্বব। কিন্তু এখন রাজকোষে অর্থাভাব, কোম্পানীর 
জন্য ফৌজ পাঠাতে অনেক খরচ হয়ে গিয়েছে । এক লাখের বেশী 
দেওয়ার উপায় নেই। 

নানা বুঝিল এতেই সন্ত থাক আবশ্যক, নতুবা কাঁড়িয়া৷ লইতে 
কতক্ষণঃ রাণার চোখে লোভের ঝলক সে দেখিয়াছে। 

এবারে নানাপত্বী কথা বলিল, রান। সাহেব, নগদ বেশি ন। দিতে 
পারেন, খান ছুই গ্রাম আমাকে ইজারা দিন। 

এ অতি উত্তম প্রস্তাব। এ গ্রামের নাম ধানগড়, পাশের গ্রাম 
রাহারিয়া আপনাকে জীবনসত্ব দিলাম, ছয় হাজার টাকা মুনাফ। হবে। 

নান। পত্বীর বিষয়বুদ্ধি দেখিয়! বিস্মিত হইল। এক মুহূর্ত আগে 
যাহা! জলে পড়িয়াছিল তাহার এমন নিপুণ উদ্ধার! তাহার গৌরব 
বোধ হইল যে কাশীবাঈ পেশবা' সিংহামনের যথার্থ সহধমিণী । কিন্তু 
তখনি আবার দীর্ঘনিশ্বান পড়িল--মহারাষ্ট্র সাম্রাজ্যের উত্তরা- 
ধিকাঁরিনী আজ বিদেশে হা'খানি গ্রামের ইজারাদার । 


১২৭ চাপাটি ও পক্ষ 


নানা আন্ধ্যাসী বেশে বিদায় হইয়া গেলে কাশীবাঈ ধানগড়ে স্থায়ী 
হুইয়। বমিলেন। তিনিই এখানকার রাণী মা। তিনিই সমারোহ 
করিয়া! শিবরাত্রির মেল! বসান। সার বছর তিনি অপেক্ষা করিয়া 
থাকেন কবে শিবরাত্রি আসিবে, কবে সেই সঙ্গে নান। আসিবেন। 


অতীত হইতে নানার মন বর্তমানে ফিরিয়া! আদিল, মনে পড়িল 
কখনো। তাহাকে এতক্ষণ অপেক্ষা করিতে হয় নাই। এবারে এত 
বিলম্ব কেন? কোন বিপদ ঘটে নাই তো? কাশীবাঈ সুস্থ আছে 
তে! ? ক্লান্ত মজ্জমান ব্যক্তি অনেক চেষ্টায় একবার ভানিয়া উঠিয়াই 
আবার যেমন তলাইয়া যায় নানার মন আবার অতীতে ডুূবিয়া গেল। 
নানা এখন অতীতজীবী। এবারে কতক্ষণ সম্বিংহীন ছিল জানি ন, 
হঠাৎ চমকিয়া উঠিয়া দেখিল পায়ের উপরে একটি ছায়। পড়িয়াছে। 

কাশীবাঈ--নান! ছুই বানু প্রসারিত করিয়া তাহার দিকে ছুটিয়৷ 
গেল। অন্ত বারের মতে! কাশীবাঈ আলিঙ্গনে ধরা দিল না, 
সরিয়। গেল। 

বিস্মিত নানা এক মুহূর্ত নিস্তব্ধ থাকিয়া তাহার দিকে আগাইয়! 
গেল, ডাকিল, কাকুবাঈ, মুখ মলিন কেন? 

কাকুবাঈ তাহার আদরের নাম। 

তবুও সে নীরব। 

কোন বিপদ ঘটেছে? 

এবারে সে কথা বলিল, বলিল, ন1 দুঃখ কিসের, সুখেই আছি। 

তবে- 

তবে এত স্ত্খ বুঝি আমার অদৃষ্টে নাই । 

আমার আগমনে 

তোমার আগমনেই বেশি ক'রে মনে পড়ছে এত সুখে আমার 
অধিকার নেই। নানা অভিমানে বলিল, তবে না হয় আমি আর 
আসবে না। 

তোমার জন্যই সারা বছর পথ চেয়ে 


চাপাটি ও পদ্ম ১২৮" 


পীর কথ! শেষ হইবার আগে নানা শুরু করিল--সারা বছর 
পাহাড়ে পর্ধতে বনে জঙ্গলে ঘুড়ে বেড়াই, মন তোমার কাছে পড়ে 
থাকে। ইচ্ছে হয় আরে ঘন ঘন আসি কিন্তু সাহস হয় না, 
কোম্পানী আমাকে গ্রেপ্তার করধার জন্য পঞ্চাশ হাজার টাঁকার 
পুরস্কার ঘোষণ। করেছে । 

কেন? 

বিস্মিত নান। বলিল, কেন, ত। কি জানো না? 

এতদিনে পরে জেনেছি । 

বিদ্বোহের অপরাধে । 

না। বিবিঘরে হত্যাকাণ্ডের অপরাধে । 

নানা চমকিয়া! উঠিল। সেই ব্যাপারটি সে সম্পূর্ণভাবে পত্বীর 
কাছে চাপিয়। গিয়াছিল, বলিল--তোমার কাছে এ সংবাদ এলে। কি 
করে? 

পাপের সংবাদ কাকের মুখে আসে, বাতাসে ভেসে আসে । 

পাপ? শক্রকে হত্যা কি পাপ? 

অসহায় বালকবালিক। আর স্ত্রীলোকেরা তোমার শক্র ! 

শত্রুর স্বজনগণও যে শক্রু। তাছাড়। কোম্পানী কি অসহায় 
নর-নারীকে হত্যা করে নি? 

এক পাপের দ্বার আর এক পাপের প্রতিকার হয় না। আর 
পাপ যদি না হবে তবে আমার কাছে চেপে গেল কেন? লড়াইয়ের 
সব কথাই তো! বলতে । 

খুন খারাবির সব কথ। কি সুন্দর বাঈকে বলবার যোগ্য ? 

সুন্দর বাঈ তাহার আর একটি আদরের নাম । 

তা নয়। তুমি জানতে যে এ কাণ্টা জঘন্তঠতম পাপ তাই আমার 
কাছে চেপে গিয়েছিলে। 

নানা হাড়ে হাড়ে জানিত যে তাহার কথা অতিশয় সত্য। 
বিবিঘরের হত্যাকাণ্ডের আগে সে প্রিয়তম পত্বীকে বিঠুর হইতে দূরে 
সরাইয়। দিয়াছিল। তাহার কানে এই সংবাদ গেলে সে হুঃখ পাইবে। 


১২৯ চীপবতি ও পন 


এই ছিল নানার ভয়। তার চেয়েও বেশি ভয় ছিল নানার বীভৎন 
সঙ্কল্প পূর্বাহ্ে জানিতে পাঁরিলে মে নানাকে নিবুত্ত হইতে অন্নুরোধ 
করিবে। তাহার অন্থুরোধ এড়ানো কঠিন-নানা সত্যই তাহাকে 
ভালোবাসিত, ভালোবাসা বলিতে মানুষে যাহা! বোঝে সেই ভাবটি 
নান! একমাত্র তাহার প্রতি অনুভব করিত। নানার কৌশলে এতদিন 
কথাটি পত্বীর কানে প্রবেশ করিতে পারে নাই, তাহার কাছে যে-সব 
পরিচর ছিল তাহারা সকলে নানার বিশ্বাসভাজন, সে বিশ্বাস 
তাহারা প্রাণপণে রক্ষা করিয়া আসিয়াছে । এতদিন পরে, এতদূর 
কে এই খবর দিল তাহার পত্বীকে ? নান! বিন্মিত হইল, বললিল-- 
এতদিন পরে সেজন্য অনুশোচনা! করে কি ফল? 

তোমার কাছে এতদিন পরে-_-মআমার কাছে আজ নৃতন। 

পুরাতন কথা ছেড়ে দাও । 

পাপ কি পুরাতন হয় ? 

হয়না? 

তবে পুরাতন হলে তার ভার আরও বাড়ে । 

সে পাপের ভার আমার। 

অধেক আমার নয়? কিন্তু তুমি যে বাকি অর্ধেকের ভারেই 
ডুববে? 

ডুবতে আর বাকি কি? 

সে তো। ঘটনাচক্রে । প্রায়শ্চিত্ত করতে হবে না? 

বেশ, আমি করবো । 

তোমার কথা তুমি জানো, আমার অর্ধেকের প্রায়শ্চিত্ব আমি 
ছাড়া আর কে করবে? 

রাজার পাপের দায়িত্ব তুমি কেন নেবে ? 

আমি রাণী নই? 

স্বভাবত চাপা, প্রেমে অচপল, ছূর্ভাগ্যে নীরব কাশীবাঈয়ের 
মুখরতায় নানা অদৃষ্টের হস্তক্ষেপ লক্ষ্য করিল, হতবুদ্ধি হইয়া সে 
একখানা পাথরের উপরে বলিয়া পড়িল । 


চাপাটি ও পদ ১৩০ 


কিছুক্ষণ পরে সে সতেজে খাড়া হইয়৷ ধাড়াইয়। উঠিল, সগর্বে 
আদেশের স্বরে বলিল, বলো কে তোমাকে এই সংবাদ দিয়েছে? 
কাকের মুখ, বকের মুখ, বাতাসে ভেসে আসা ও সবে বিশ্বাস করি নে। 

এবারে সন্ন্যাসীর বেশ ভেদ করিয়। তাহার রাজসিক ব্যক্তিত্ব বাহির 
হইয়া পড়িয়াছে। সে কেবলি পাথরে সুদীর্ঘ ত্রিশূলখানা ঠুঁকিতে 
লাগিল, বলো, কে বলেছে । 


কিছুমাত্র ভয় না পাইয়। কাশীবাঈ বলিল, খবর সত্য কিনা বলো» 
কে খবর দিয়েছে শুনে কি ফল? 

তবু শুনতে চাই। 

আমি বল্তে প্রস্তুত নই । 

এত সাহম ? 

ভয় কিসের? 

আমি কত নারী হত্য। করেছি শুনেছ তো। 

ন1 হয় আর একটা বেশী করবে। 

সংবাদদাতা তবে নারী ? 

বিচলিত কাশীবাঈ বলিল, আমি নিজের কথ। ভাবছি। 


এবারে নানার কণ্ম্বর আব্র“হইল, বলিল, তোমাকে হত্যা করবো 
কাকু? 
নইলে হয়তো যোগ্য প্রায়শ্চিত্ত হবে না । 


নানা আর দ্াড়াইয়। থাকিতে পারিল না, আবার বসিল, এবং ছুই: 
করতলে মুখ ঢাকিয়৷ বাম্পকরুণ কণ্ঠে মূঢ়ের মতো! বলিতে লাগিল, 
তোমাকে হত্যা করবো, তোমাকে হত্যা করবে। ! কাকুবাঈ, তুমি 
এমন নিদারুণ কথা ভাবতে পারলে ! 


স্বামীর বৈকল্য দর্শনে কাশীবাই-এর হৃদয় গলিল, কাছে আসিয়া 
গায়ে হাত রাখিয়া বলিল, চলো, ওপারে চলো, পরিশ্রাস্ত হয়েছ, 
বিশ্রাম করবে, এদিকে সন্ধ্যাও ঘনিয়ে এলো । 

না, এখন আমি কিছুক্ষণ এখনে বসে বিশ্রাম করবে । 


নিন চাপাটি ও পদ্ম 


তাই ভালো । তোমার ওপারে গিয়ে কাজ নেই । গায়ে ক'জন 
অপরিচিত লোক এসেছে, সবাই বলছিল কোম্পানীর চর হ'তে পারে। 
পূজো! হ'বা মাত্র আমি তোমার জন্য প্রপাদ নিয়ে আসবো । এখন 
চলাম। 

নানা আপত্তি করিল ন দেখিয়। কাশীবাঈ দ্রতপদে নদীপার হইয়। 
গৃহে চলিয়া গেল । | 


২ 

প্রাচীন বনম্পতি সমূহের তলদেশে সরীন্থপ গাত্রের মতো শীতল- 
স্পর্শ সেই ঘনায়মান অন্ধকারের মধ্যে একাকী বসিয়া নানার মন আর 
একবার অতীতে ফিরিয়া গেল। তাহার সন্্যাস জীবনে অতীতের 
কথা কখানো কখনো মনে পড়িত, কিন্তু সে যেন উপত্যকার ফাঁকে 
দূরের আকাশ চোখে পড়ার মতো ক্ষণিক এবং আংশিক, কিন্তু আজ সে 
যেন সশরীরে অতীতে ফিরিয়। গেল । বিঠুর, কানপুর, সিপাহি ফৌজ, 
কোম্পানীর সেনাপতি এড্িয়ান হোপ, হোপ গ্রাণ্ট, স্যার কলিন 
ক্যান্থেল, স্বপক্ষের তাতিয়া টোপি, আজিমুল্লা খাঁ, জুবেদি বিবি ! 

আজিমুল্লা খা ও জুবেদি বিবির নাম মনে প৬তেই.সে শিহরিয়া 
ওঠে_-এই দু'জনেই তাহার অধঃপতনের হেতু, নতুবা তাতিয়া টোপি 
বিবিঘরের হত্যাকাণ্ডের পক্ষে ছিল ন।। 

নানা কি কখনো স্বপ্নেও ভুবিয়াছে ষে বিদ্রোহীদের নেত। হইয়া 
কোম্পানীর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নামিবে। কোম্পানীর বিরুদ্ধে তাহার 
আনেক অভিযোগ ছিল সত্য, তবু মীরাটে বিদ্রোহ ঘটিবার পরেও 
তাহার সহানুভূতি ছিল কোম্পানীর দিকে। কিন্তু এমন সমগ্নে 
একদিন যখন হাজার হাজার দিপাহী তাহার পায়ের কাছে হাতিরার 
রাখিয়। তাহাকে হিন্দুস্থানের বাদশা বলিয়া অভিবাদন করিল, যখন 
বলিল, যে কোম্পানী-রাজ তাহারা বরবাদ করিয়া এখন পেশবা-রাজ 


চাপাটি ও পদ্প ১৩২ 


প্রতিষ্ঠায় আপিয়াছে তখনো নান। আগুনে ঝণপ দিতে রাজি হয় নাই । 
তারপরে নানাকে দোমনা দেখিয়া যখন তাহার জানাইল যে নানা 
যখন গদিতে চাপিতে রাজি নয়, তখন তাহার! দিল্লী যাত্রা করিতেছে, 
দিল্লীর বাদশাহকেই বাদশাহী ফিরাইয়। দিবে, যখন তাহারা জানাইল 
যে প্রয়োজন হইলে বাদশাহের পক্ষ হইয়। তাহারা কোম্পানীর গোলাম 
নানার বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ করিবে তখন মে আর নীরব থাকিতে পারিল 
না, একখান। তরবারী কুড়াইয়া লইয়? গজনন করিয়। উঠিল, কোম্পানী- 
রাজ মুরদাবাদ ! পর মুহুর্তে সহস্র পিপাহি-কণ্ঠ গজন করিয়া উঠিল, 
পেশবা-রাজ জিন্দাবাদ ! 

বাহাদুর শাহ ও তাহার নিজের কথ মনে পড়িবামাত্র এ হেন 
হুরবস্থার মধ্যেও নানা একপ্রকার কৌতুক অনুভব করিল! মোগল 
সআ্াট ও পেশবা সম্রাট ছুজনেরই আজ সমান অবস্থা ! 

নানার মনে পড়িল যে বিদ্রোহের নেতৃত্ব গ্রহণ করা সত্বেও তাহার 
মতিগতি সম্বন্ধে স্বপক্ষের প্রধানগণ নিশ্চিন্ত ছিল না। বিদ্রোহীদের 
যেভাবে শান্ত করিয়। রাখিয়াছিল, বন্দী ইংবাজদের প্রতি যে রকম 
সদ্যবহার করিত, তাহাদের ধারণ। প্রয়োজন হইলে এ সমস্তই কোম্পানী 
পক্ষে যোগদানের ভূমিকা । কোম্পানী পেশবার গায়ে হাত দিবে না, 
সিপাহিদেরও ভয়ের কারণ সামান্ত, বেগতিক দেখিলে হাতিয়ারগুল। 
গঙ্গাগর্ভে ফেলিয়া দিয়া ভালো মানুষটির মতো! নিজ গ্রামে গিয়। 
বসিবে। মরিতে মরিবে মাঝখানের ুষ্টিমেয় কয়েকজন নেতা | ষড়যন্ত্র 
বিস্তার করিয়া তাহার। নানার হাত ইংরাজের রক্তে রাঙাইয়। দিবার 
চেষ্টা করিল যাহাতে আর সে দলত্যাগ না করিতে পারে, বিবিঘরের 
রক্তম্োতে নানার হাত রঞ্জিত হইয়া গেল, দলত্যাগ করিবার পথ 
তাহার বন্ধ হইল। এসব স্মুক্স ক্রিয়া-প্রক্রিয়া তখন সে বোঝে নাই, 
পরে বুঝিয়াছে যখন ফিরিবারু আর পথ ছিল ন1। সেদিনকার অস্পষ্টত। 
আজ দিবালোকের মতো স্পষ্ট। এই ষ্ড়যন্ত্রের মূলে আজিমুল্লা খা, 
এই ষড়যন্ত্রের অস্ত্র জুবেদ্ি বিবি। তাহাদের নাম মনে পড়ায় সে 
আবার শিহরিয়! উঠিল, ভয়ে এবং ঘ্বণায়। 


ই চাঁপাটি ও পদ্ধ 


সে কেবল ভাবিতে লাগিল জুবেদি বিবি শয়তানী! নারী 
শয়তানীর মতো! কোন্‌ শয়তান। তাহার মনে পড়িল উর্বশী ইন্দ্রের 
আয়ুধ, আর জুবেদি আজিমুল্লার আয়ুধ। ইন্দ্রের দুই আযুধ--বজ্ব ও 
উর্বশী, আজিমুল্পা খাঁর ছুই ভায়ুধ তলোয়ার ও জুবেদি। মনোহর 
আয়ুধকে মাম্ুষ সাধ করিয়। বুক পাতিয়া নেয় । নানাও একদিন সাধ 
করিয়া জুবেদিকে কণে গ্রহণ করিয়াছিল । 

বিঠরেব প্রাসাদে একদিন আলিষুল্লা খা আবিভূতি হইল 1 

নানা পুধাইল, কি খাঁ সাহেব, অনেকদিন দেখি নি, কোথায় ছিলে? 
সময ক্রমে সঙ্কটের মুখে এগিয়ে চলছে, মি না থাকলে পেশবার 
রাষ্ট্রতরণী বানচাল হাতে কতক্ষণ ? 

আজিমুল্লা খ। নানার ভারি বিশ্বাসভাজন। নানার স্থার্থ সংক্রান্ত 
দরারে সে একবার বিলাত ঘুরিয়া আসিয়াছে । ইংরাজি বলিতে 
কহিতে, ঈংরাজ সমাজে মিশিতে, কুটনীতির সূক্ষ্ম সুত্র চালনা করিতে 
তাহার জুড়ি নাই। তাহাকে না হইলে নানার অচল । 

আজিমুল্লা খাঁ হাসিয়া বলিল--সম্প্রতি কাশ্মীর থেকে আলছি। 

কাশ্মীর! সে যেভূন্বর্গ! তা আমার জন্য কি আনলে? পারি- 
জাত কু'স্বম মিললো! কি? 

পারিজাত তো ছার ! খোদ উর্বশীকে এনেছি । 

কেয়াবাৎ, শুনে লোভ হচ্জে 1 

তা হ'লে দেখে চক্ষু সার্ক করুন। 

তখন আজিমুল্লার ইঙ্গিতে পদর্ণর অন্তরাল হইতে তরুণী জাবেদ 
নানার সম্মুখে আবিভূতি হইল । 

তাহার অপরূপ সৌন্দর্য দর্শনে নানা ভতবুদ্ধি হইয়া গেল। 
প্রথম বিস্ময়ের ধাক্কা কাটিলে নানা হাসিয়া বলিল-_-উর্বশী তাতে 
জন্দেহ নাই । 

এটি নানার জন্মদিনের উপহার । 

সে দিন নানার জন্মদিন ছিল। 


চাপাটি ও পদ্ন | রি 


কাশ্মীরের জাফরান কুঁড়ির মতো৷ অলৌকিক তাহার রূপ । রক্ত 
মাংসের ভার ন্যুনতম সীমায় নামিয়া, হাসি চাহনি ও লাবণ্য, হাবভাব 
ও কলাবিলাস উধ্ধতম সীমায় চড়িয়া একটি অপূর্ব মহিমার স্থটি 
করিয়াছে । বয়স? উর্বশীর আবার বয়স কি? 

নানার মুগ্ধ ভাব দর্শনে শীত আজিমুল্লা বলিল, এ বস্তু নানার 


হারেমের যোগ্য । 
কিন্ত নানার হারেম যে এবস্তর যোগ্য নয়, নৃতন হারেম আবশ্টাক। 


অচিরে নৃতন হাঁরেম নিমিত হইল আর নান সেখানে দিবা-রাত্রির 
অধিকাংশ সময় কাটাইতে লাগিল। তখন তাহার কনিষ্ঠ পত্রী 
কাশীবাঈ নিতান্ত বালিকা, থাকিত পিত্রালয়ে । 

নানা সদরে অন্দরে আলিমুল্লা খাঁর বশীভূত হইয়া পড়িল, সদরে 
সে স্বয়ং অন্দরে তাহার কুন্ুম' রুপ জুবেদি । 

আজ্িমুল্লার প্ররোচনায় নানা বিদ্রোহীপক্ষ অবলম্বন করিল 
তবু ঠিক ধর! ছে"য়ার মধ্যে আসিল না! আজিষুল্লার ইঙ্গিতে জুবেদি 
বিবি তাঁহার ছুই হাত বিবিঘরের রক্তে রাঙাইয়। দিল, জাফরানের রঙ 
ষে কিরূপ মারাত্বক লাল নানা তখন বুঝিল । 

একদিন নান! জুবেদি বিবির ঘরে আসিয়। দেখে যে জুবেদি নাই। 
নানা অপেক্ষা করিয়া রহিল । আগে কখনো তাহাকে অপেক্ষা করিয়া 
থাকিতে হয় নাই। কিছুক্ষণ পরে জুবেদি আমিলে নান? শুধাইল, 
আজ অধমের প্রতি বিবি এমন নিদ্য় কেন? 

ছু'এক মৃহুততনীরব থাকিয়। জুবেদি বলিল, আমি আর এখন বিবি 
নই, বাদী। 

এই বলিয়া সে কীদিয়া ফেলিল। সুন্দরী রমণীর চোখের জল 
রোধ করিতে পারে এমন বীরপুরুষ বিরল । 

নান। ব্যস্ত হইয়া বলিল--কি ব্যাপার বিবি, কে তোমাকে বাদী 
বলেছে, এমন সাহস কার ? 

যথোচিত সাধাসাধির পরে জুবেদি বলিল-আঁর কারা ? বিবিঘরের 
বিবির! । 


১৩৫ | ডাপাটি ও পদ্ধ 


সেখানে গিয়েছিলে কেন ? 

খাঁ সাহেবের অন্থুরোধে। তাদের কোন অনস্ুবিধা হচ্ছে কিন! 
দেখতে । 

একটা কথাও সত্য নয়, আজিমুল্লা খ। ও জুবেদি বিবি ছু'জনে 
মিলিয়। বানানো । 

তা তারা কি বল্লো! ? 

বল্ল তারাই বিবি, আমি বাঁদী। 

ওদের কথা ছেড়ে দাও, অনেকদিন বন্ধ আছে, কি বলতে কি 
বলেছে 

আমি হ্বাধীন আছি সেকি আমার দোষ ! আর স্বাধীনতাই বা 
কোথায় ? যেখানে বন্দীরা বিবিকে বাদি বলে এমন স্বাধীনতায় ধিক । 

মনের দৃঃখে ওসব কথা বলেছে । 

আমি বুঝি খুব আনন্দে এনব কথ! বলছি ! আর শুধু কি কথা! 
এই দেখুন-_বলিয়া পিঠের কাপড তুলিয়! দেখাইল নখচিহ্ন। 

কেমন ক'রে তল? 

রাক্ষসীরা আচড়ে কামডে দিয়েছে । 

সব মিথা।। আঁজিমুল্ল স্বহস্তে কিছু দাগ করিয়। দিয়াছে। 

কি সর্বনাশ । 

সবনাশ কেন? ওদের শিরোপ। পাঠিয়ে দিন! না জনাব, 
আমাকে অনুমতি দ্রিন আমি কাশ্মীরে ফিরে যাই। 

তোবা ! তোঁবা। তুমি কাশ্মীরে গেলে আমি হিন্দুস্থানে কি 
করবো! 

আপনিও বরঞ্চ চলুন। বিবিদের যে প্রতাপ দেখলাম, সাহেবদের 
প্রতাপ নাকি আরও কত বেশি । ওরাই এদেশে রাজত্ব করবে। 

ওসব কথ। যাক! তোমার কাশ্মীর যাওয়। হতে পারে ন1। 

তবে বিবিদের সাজার ব্যবস্থা করুন । 

স্্রীলোককে কি সাজ। দেব ? 

ভবে সে ভার স্ত্রীলোকের উপরে ছেড়ে দিন । 


চাপাটি ও পদ্ল 


8০৮ 
€্ে 
পে 


কোথায় তেমন স্ত্রীলোক ? 

কেন আমি আছি। 

কি সাজা দেবে? 

রাজন্্রোহীর যোগ্য সাজ । 

আচ্ছা অল্প সল্প তিরস্কার করে ছেড়ে দিও । 

সে দেখ যাবে! 

নানা ভাবিল ব্যাপারট। অল্লপেই মিটিয়া যাইবে । জুবেদি যাহা 
ভাবিল তাহার পরিচয় বিবিঘরের কাণ্ড। সে তখনি আলিমুল্লা খাঁর 
কাছে গেল। আলিমুল্লা বলিয়াছিল কোন রকমে আধখানা 'বা 
সিকিখানা হুকুম আনিতে পাঁরিলেই চলিবে । জুবেদি আস্ত একখানা 
হুকুম আনিল। নান! হত্যাকাণ্তের আগে এ সবের কিছুই জানিতে 
পারে নাই, পরে সমস্তই বিশদ জানিয়াছিল কিন্তু তখন সে পলাতক, 
বিচার ব৷ দগ্ডদানের ক্ষমতা তাহার আর নাই । 

কাশীবাঈ এসব ঘটনার কিছুই জাঁনিত না। বিদ্রোহের পূর্বে 
পিত্রালয় হইতে সে ঝিঠুরে আসিয়াছিল বটে কিন্তু বিদ্রোহ বাধিয়া 
উঠিবামাত্র প্রিয়তম! পত্বীকে কয়েকজন বিশ্বস্ত অনুচরের সঙ্গে নানা 
নেপাল সীমান্তে পাঠাইয়া দিয়াছিল। কোম্পানীর ফৌজ বিঠুর 
অধিকার করিয়া লইলে নানা পলাইয়া আসিয়া স্ত্রীর সঙ্গে মিলিত 
হইল এবং তারপরে নেপাল রাজ্যে প্রবেশ করিয়। রাণার কাছে 
আত্মসমর্পণ করিল--সে প্রসঙ্গ আগেই কথিত হইয়াছে । 

আজ নিজ্নে গভীর অন্ধকারে একাকী বসিয়া কত কথাই ন৷ 
তাহার মনে পড়িতেছিল, খুব সংলগ্ন আকারে নয়, ছে ডাছাড়াভাবে, 
তবু ভগ্ন সেতুর [চহু দেখিয়া পুর্ণ সেতুর আভাস পাইবার মতো নানার 
চিন্তাধারা মোটামুটি বুঝিতে পারা যায়। সে ভাবিতেছিল যাহা 
হইবার হইয়াছে,তাহার দণ্ডও সে পাইয়াছে। পেশবার সিংহাসনের 
অধিকারীর আজ ভিক্ষার অধিকার ছাড়া আর কিছু নাই। কিন্ত্ব এত 
হুঃখের মধ্যেও তাহার এক সাস্তবন' ছিল, একটিমাত্র সুখ, বিবিঘরের 
জঘন্যতম পাপের বাত? প্রিয়তমা পত্বীর কানে প্রবেশ করে নাই। 


১৩৭ চাঁপাটি ও পদ্ম 


আজ সে স্থখও গেল। নানা দীর্ঘনিশ্বাম ফেলিয়া ভাবিল, যাইবেই বা! 
না কেন, এতবড় পাপের কি প্রায়শ্চিত্ত হইবে না? 

কিন্তু সে কিছুতেই ভাবিয়া কুল পাল না! এ কথা কাশীবাঈয়ের 
কানে তুলিল কে? ছু'জনে পারে আজিমুল্লা ও জববেদি। আজিমুল্লার 
অন্দরে প্রবেশ নিষেধ । তবে পারে জুবেদি। কিন্তু সে-ই বা 
কোথায় ! বিশাল হিন্দৃস্থানের কোথায় সে আত্মগোপন করিয়াছে, 
হয়তো বাঁ মরিয়াই গিয়াছে, আজ পাঁচ ছ বছর তাহার সন্ধান নাই । 
তবে এ খবর আসিল কাহার মুখে? 


হাতের উপরে মাথা রাখিয়া সে চুপ করিয়। বসিয়া রহিল। তাহার 
মনে পড়িল কাশীবাঈ বলিয়াঁভিল, কাকের মুখে, বাতাসের মুখে ! 
হয়তো! বা সেই কথাই সত্য! সে ভাবিল পাপের গতি কুটিল আর 
অদৃষ্টের গতি গোপন। যে ছুটি কানকে সে লযত্বে রক্ষা করিয়! 
যাইতেছিল অনুষ্ট ঠিক আসিয়। সেই ছুটি কানেই বিষ ঢালিয়! দিয়াছে। 
সে কপালে কষাঘাত করিল, বুঝিল পত্ীর মনে তাহার জন্য যে শেষ 
আশ্রয়টকু ছিল আজ তাহা৷ ভাডিয়া পড়িল। পাপাচারীর জন্য যে 
তাহার মনে স্থান নাই, কাশীবাঈকে সে জানিত। 

হঠাৎ সে খজু হইয়া উঠিয়া বসিল, তাহার শিথিল শরীর দা 
অবলম্বন করিল, অন্ধকারে চোখ ।জবলিয়। উঠিল ! সংবাদদাতাকে পাহলে 
একবার সে দেখিয়া লইত। নিজের পাপের দণ্ড সে ভোগ করিতেছে 
কিন্ত এত বড় ছুষ্কৃতিকারীকে কখনোই সে অনাহত ছাড়িয়া দিত না ! 
সুদীর্ঘ ত্রিশুল দণ্ডটা সে দৃঢ় মুষ্টিতে চাপিয়া ধরিল। এমন সময়ে 
কাহার তীক্ষ কর্কশ হাসিতে তাহার চটক1 ভাঙিয়া গেল, সে চমকিয়া 
উঠিল, তাহার সবাঙ্গ কাটা দিয়া ঈঠিল। হাসে কে? এই নিজন 
অন্ধকারে তাহাঁকে ধিক্কার জানাইয়া হাসে কে? অবৃষ্ট ? 

একটু পরেই তাহার বাস্তবজ্ঞান ফিরিয়া আসিল, এবারে হাসিবার 
পাল। তাহার । ও হাসি নয়, নেপালী তরক্ষুর ডাক। 


৮০ 


রাণীমা, আমায় মাপ করো, এ এক কথা আর কতবার বলবো, 
বিশেষ এ বীভৎস বাাপারের কথা । 

অনেকবার শুনেও যে বিশ্বাস হচ্ছে না। 

কি করবে বলো ? ও সব লড়াইয়ের ব্যাপার । 

ওট| লড়াই হ'ল? একঘর ছেলেমেয়ে বুড়ো বুড়ীকে হত্যা'** 
লড়াই ? 

ও সব পুরুষালি কাণ্ডের আমরা কি বুঝি বলো ? 

পুরুষালি নয় জুবেদি, পৈশাচিক । 

তৃমি র'ণী বড মুখে ওসব বড কথা বলতে পারো, আমি পুরুষালি 
ছড়া আর কি বলবো? 

যাঁই হোক, তুমি না জানলে তো জানতে পারতাম না, আমার 
জান] প্রয়োজন ছিল । 

কেন? 

এ পাপের প্রায়শ্চিত্ত করতে হবে না? 

পেশবার পাপের প্রায়শ্চিত্ত তুমি করবে? 

করবো না। হিন্দু স্বামী-স্ত্রী এক অঙ্গ। ডান হাতে "আঘাত 
লাগলে বাঁ হাতে ব্যথা করে। 

অতশত জানি নে রাণীমা, দেশ ছেড়ে মক্কা শরিফে চলে যাচ্ছি, 
আর ফিরবে ইচ্ডে নেই, ভাবলাম তার আগে একবার রাণীমাকে 
দর্শন করে যাই । এখানে এসে কথায় কথায় সব নেরিয়ে পড়লো । 
আমার ধারণা ছিল পেশবা তোমাকে বলেছেন । 

তিনি সব বলেছেন এঁ কথাটি ছাড়া 

কেন এমন হ'ল ? 

তিনি আমাকে বেশ জানেন, জানেন যে ও কথা শ্বনলে আমি 
প্রায়শ্চিত্ত শুরু করনে । 


ই চীপাটি ও পল্প 


কি তোমাদের প্রায়শ্চিত্তের বিধান? 

সকলের পক্ষে তো এক বিধান নয় ! 

আমার আবার ভয় ছিল পেশবার সম্মুখে প'ড়ে যাই ! তাহলে 
তিনি আর আস্ত রাখবেন না । 

হী কথাটা শুনে অবধি তিনি বারংবার জিজ্ঞাসা করছিলেন কে 
বল্লো, তাকে তিনি দণ্ড দেবেন | 

তা মা, আমার নাম তো বল নি? 

পাগল নাকি। তা ছাড় তিনি আর আজ এখানে আসছেন ন! | 

কেন? 

কোম্পানীর চর সর্ধদা তার সন্ধানে ঘুরে বেড়াচ্ছে । আজ মেলায় 
কজন লোকের সন্দেহজনক গতিবিধি দেখে বলবস্ত রাঁও আমাকে 
বললো, মা আজ পেশবাকে গ্রামে টুকনে নিষেধ করো । আমিও 
পেশবাকে সেই কথা বললাম । তিনি ওপারে একটা গুহায় রাত্রিষাপন 
করবেন, ভোর হবার আগেই বওনা হয়ে যাবেন। পুজো হলেই আমি 
তার জন্য প্রসাদ নিয়ে ওপারে চলে যাবো । 

তবে মা, আমি একটু নিশ্চিন্তে বসতে পারি । 

ই, তিনি আসবেন না তোমার কোন ভয় নেই । 

জুবেদি পেশবার আগমন সম্ভাবনায় সত্যই ভীত হইয়াছিল, 
এবারে নিশ্চিন্ত হইয়া চাপিয়া বলিয়া পড়িল। 

বলা বাহুল[ জুবেদির দেশত্যাগ ও মন্কাযাত্রার কথ! সর্বৈব মিথা। ' 
হত্যাকাণ্ডের সংবাদটি কাশীবাঈকে দিবার জন্যই অশেষ কঈ স্বীকার 
করিয়া এখানে আমিয়াছিল। 

এ রহান্তের মূল বোধ করি মানব স্বভাবে নিহিত। কাজেই ই? 
যত অসম্ভব বোধ হোক, আন্বাভাবিক নয় । 

জুবেদি বিবি এখন নির্বাপিত জ্যোতি । 'আলো নাই কিন্তু তাপ 
আছে। সেই তাপে নিরন্তর সে দগ্ধ হইতেছে, সেই তাপে তাহার 
অপূর্ব রূপ পুড়িয়া ছাই হইয়া গিয়াছে। ছাই হইয়াছে তবু তাপ 
যায় নাই। আগের মতো আগুন থাকিলে দাবানল কাণ্ড বাধাইয়া 


চাপাটি ও পদ্ল ১৪০ 


দিত। এখন আছে শুধু তাপ, সেই তাপে কাশীবাঈয়ের হৃদয় তপ্ত 
করিয়! তুলিবার উদ্দেশ্টেই তাহার এখানে আগমন। নানার উপরে 
প্রতিশোধ গ্রহণের তাহার হাতে এখন ইহাই একমাত্র অস্ত্র 

সিপাহী বিদ্রেহের দাবানলকে জুবেদী বিবি একটি ব্বর্ণময় স্বপ্ন 
বলিয়া মনে করিয়াছিল। সে ভাবিয়া লইয়াছিল যে নানাসাহেব 
হিন্দুস্থানের বাদশ। হইলে সে দ্বিতীয় রৌশেনারা বা জেবুন্িসা হইয়া 
সিংহাসনের পাদপীঠে বসিয়! বাদশাহুকে চালনা করিবে । আবার 
কখনো কখনে। অমিত-স্বপ্গ্রবণ তাহার মন বলিত দ্বিতীয় নুরজাহান 
হইতেই ব। বাধা কি? সিংহাসনের পাদগীঠে কেন, অধেক নিংহাসনে 
নয কেন। উচ্চাকাজ্ষার শিখা আর একটু উজ্জ্বল হইয়া উঠিলে 
রাজিয়া সুলতানার কথা তাহার মনে পড়িত, হিন্দুস্থানের স্বর্ণচুড 
সিংহামনের নিঃসপত্ু অধিকারিণীরূপে সে নিজেকে দেখিতে পাইত । 

এসব কথা কত সে নিজে ভাবিয়া আবিষ্কার করিয়াছিল আর 
কতটা কুট চতুর আজিমুল্লা খা তাহার মনে ঢুকাইয়। দিয়াছিল তাহা! 
জানি না। তবে ইহা সত্য যে জুবেদির উচ্চাকাজ্ষার আগুনে সে 
ইন্ধন জোগাইত, সিংহাসন-লাভের চন্দন কাষ্ঠের ইন্ধন। তাহার 
মোহকর সৌগন্ধ্যে মুগ্ধ বিভ্রান্ত জুবেদি কত কি স্বপ্ন দেখিত। 
আজিমুল্ল! খা তাহাকে বুঝাইয়া দিয়াছিল ষে নানাকে হত্যাকাণ্ডে লিপ্ত 
না করিতে পারিলে সঙ্কটকালে সে কোম্পানী পক্ষে ফিরিয়া বাইতে 
পারে- আর কোম্পানী পঙক্ষে ফিরিয়া গেলে জুবেদির ব্বর্ণ- সিংহাসন 
স্বর্ণ মেঘের মতে। অন্ধকারে বিলীন হইয়া যাইবে। 


তারপরে যখন মিপাহী-বিদ্রোহের দাবানল নিভিয়া গেল, জুবেদি 
আগ্ফার করিল ষে স্বর্ণ সিংহাসনের পরিবতে” সে ভন্মস্ুপের উপরে 
সমাসীন। সে দেখিল যে তাভার এশ্র্ধ, প্রতাপ, প্রতিপত্তি 
সমস্তই লোপ পাইয়াছে । শুধু তাঁই নয়, সে এখন কোম্পানীর 
হুলিয়াকৃত আসামী । গ্রাম হইতে গ্রামাস্তরে,। দেশ হইতে 
দেশাস্তরে শরবিদ্ধ মুগের মতো ছুটিয়! বেড়ানোই এখন তাহার জীবন। 
তখন তাহার নিবুদদ্ধি-মনের প্রচণ্ড ক্রোধ পড়িল নানার উপর । 


১৪১ চাপাটি ও পদ্ম 


তাহার ধারণা হইল বতগ্মান হুদ্দশার ও ভাবী সিংহাসন-লোপের 
একমাত্র কারণ নানী । যে-রাগ বস্তুতঃ পড়া উচিত ছিল আজিমুল্প' 
খার উপরে, কুটকৌশলী আলিমুল্লা খা তাহ। সম্পূর্ণরূপে নানার 
উপর লইয়া ফেলিল। তখন হইতে জুবেদি নানার উপরে প্রতিশোধ 
গ্রহণের উপায় ভাবিতে লাগিল । এরূপ ক্ষেত্রে পুরুষ হইলে নানাকে 
ধরাইয়।৷ দিবার স্থূল প্রচেষ্টায় আত্মনিয়োগ করিত। কিন্তু জুবেদি 
নারী, শুধু নারী নয়, চিরন্তনী নারী। সে চিন্তা করিয়া দেখিল 
নানার ফাসি হইলে তাহার নিজের কি লাভ? লাভ তো নানার । 
মৃত্যুতে তাহার সব ছুঃখ ও গ্রানির অবসান ঘটিবে। সে ভাবিল 
বাচিয়া থাকিয়া নান! যাহাতে তীব্রতর ছুঃখ পায়, সে নিজে যেমন 
পাইতেছে, তাহাই করিতে হইবে । সে জানিত ছুস্তর সমুদ্রে নানার 
একমাত্র আহ য় কাশীবাঈয়ের হৃদয় । জুবেদি সতী রমণী নয়, কিন্তু 
সতী রমণীর হৃদয়ের মহিমা ও প্রেম সম্বন্ধে সে সম্পূর্ণ সচেতন ছিল। 
সে সঙ্কল্প করিল নানার সেই শেষ আশ্রয় নষ্ট করিয়া দিতে হইবে। 
ধর্মপ্রাণ কোমলহদয়! কাশীবাঈ পতির নৃশংসতায় নিদারুণ ম্সপীড়া। 
পাইবে, সেই পীড়ায় স্বামীন্ত্রীর সম্বন্ধও পীড়িত হইতে থাকিবে সে 
বিষয়ে তাহার অণুমাত্র সন্দেহ ছিল না। নারী ছাড়া নারী-হৃদয়ের 
রহস্ত কে বুবিবে? নারী ছাড়া এমন নিষ্ঠুরই বা হইবে কে? 
শয়তান বোধ করি ছদ্মবেশী নারী। 


শু 


নানা উঠিয়া পড়িল। কি ভাবিয়া উঠিল সে নিজেও জানে 
না। বোধ করি চাপা অন্ধকার অসহ হইয়া উঠিয়াছিলঃ বোধ করি 
রাত্রির শ্রীতল স্পর্শে ছুলভ গৃহাশ্রয়ের জন্য ব্যাকুলতা অন্ুভব করিয়। 
থাকিবে। কোন সন্যাসীই ষোল আনা সন্গ্যাসী নয়, মনের মধ্যে 
কোথায় একটুখানি গৃহী লুকাইয়া থাকে । গ্রামে গুপ্তসরের উপস্থিতির 


চাপাটি ও প্স ১৪২ 


সম্ভাবনাকে সে তেমন আমল দিল না, একে রাত্রি অন্ধকার, তাহাতে 
আবার সন্ন্যাপীর বেশ। নানা ধীরে ধীরে নদীগর্ভে নামিল, সন্তর্পণে 
নদী পার হইয়। গ্রামের তীরে উঠিল। মেলায় লোকজন তখনো 
জাগ্রত ছিল, মেলার দিকটা এড়াইয় ঘুরপথে কাশীবাঈয়ের গৃহের 
দিকে চলিল। 

নানা জানিত অনেক বোঝা তাহার মাথায় চাপিয়াছে। সে 
জানিত হয় কোম্পানীর হাতে নয় বিধাতার হাতে তাহার দণ্ড পাইতে 
হইবে, কিস্তু অতকিতভাবে কাশীবাঈয়ের তৃতীয় হস্ত যে বিচারক্ষেত্রে 
প্রসারিত হইবে নান। তাহ ন্বপ্পেও ভাবে নাই। পত্বীর বিরূপতায় 
তাহার সমস্ত মন বিকল ও বিবাক্ত হইয়। গিয়াছিল। তাহার প্র5গ্ 
ব্যক্তিত্বের সমস্ত ক্রোধ ও হিংসা অজ্ঞাত সংবাদদাতার উপরে 
পড়িয়াছিল। কিন্তু কে সে? কোথায় সে? কাশীবাঈ তাহার 
নাম করিবে না নানা নিশ্য় জানিত। আর করিলেই বা কি? 
পলাতক আসামী নানা, তাহার দণ্ড দানের ক্ষমতা কই? এইরূপ 
নানা চিন্তা করিতে করিতে নে পথ চলিতে লাগিল এবং কিছুক্ষণ পরে 
নিরাপদে কাশীবাঈয়ের গৃহপার্থখ্ে আসিয়। দাড়াইল; মে দেখিতে 
পাইল ঘরে আলো জ্বলিতেছে, আর একটু অগ্রসর হইলে শুনিতে 
পাইল ঘরের মধ্যে ছু'জনের কণ্ঠস্বর। কৌতুহলী নানা নীরবে 
আগাইয়। গিয়া মুক্ত দ্বার-পথে ভিতরে তাকাইয়া স্তম্তিত হইয়া গেল । 
পিশাচী, তোমারই কীতি ! নানা দেশ কাল পাত্র. ভুলিয়া, সমস্ত 
স্থৈর্য ও ধৈর্য শুভাশুভ ভুলিয়া সগজণনে ঘরের মধ্যে প্রবেশ করিল, 
ওহে। শয়তানী তোমারই কীতি ! 

কাণীবাঈ ও জুবেদি কেহই নানাকে প্রত্যাশী করে নাই, তাহার 
অতঞ্িত আগমনে ছুজনেই কিংকতব্যবিমূঢ় হুইয়া গেল, জুবেদি 
পালাইবাপর প্রচেষ্টা করিতেও ভুলিয়া গেল । 

জুবেদি প্রথমে সম্থিৎ ফিরিয়া পাইল এবং আত্মগোপনের উদ্দেশ্যে 
উঠিবার চেষ্টা করিল, কিন্তু তার আগেই--শয়তানী, এই নাও বলিয়া 
সবলে সবেগে তাহাকে লক্ষ্য করিয়া ত্রিশূল দণ্ড চালনা করিল। ঠিক 


১৪৩ চাপাটি ও পদ্ম 


সেই মুহুতে” কাশীবাঈ সম্বিং ফিরিয়া পাইল এবং কি করো, কি করো 
বলিয়া অগ্রসর হইয়া গেল। নানার লক্ষ্যত্রষ্ট ত্রিশুল কাশীবাঈয়ের 
বক্ষ বিদ্ধ করিল। এসব ব্যাপার বর্ণনায় কিছু সময় লাগিল, 
ঘটনায় এক মুষুর্তে ঘটিয়৷ গেল । 

হতবুদ্ধি নান! ত্রিশুলবিদ্ধ পত্বীর বুকের উপরে পড়িয়া চীংকা'র 
করিয়া উঠিল--কাকুবাঈ, কাকুবাঈ । 


কাশাবাঈ অস্তিম কণ্ে বলিল--এই প্রায়শ্চিত্তের আমার প্রয়োজন 
ছিল। ভালই হল যে তোমার হাতে হয়েছে । 
তারপর সে আর কথা বলিতে পারিল না। 


অসহায় বিমুঢ় নান। শিশুর মতো! তাহার পায়ের কাছে মাথা 
ঠুকিতে লাগিল, বলিতে লাগিল, প্রায়শ্চিত্ত, তোমার নয় আমার । 

এই অবসরে জুবেদি ঘরের বাহিরে চলিয়৷ গিয়াছিল, পালাইবার 
জন্য উদ্যত হইয়াছিল। কিন্তু নানার খেদ শুনিয়া উত্তর দিবার 
প্রলোভন সম্বরণ করিতে পারিল না, বলিল-_নানা, তোমার প্রায়শ্চিন্তের 
বিলম্ব আছে, আর সে প্রারশ্চিত্ত এ ভাবেও হবে না। মারাঠ। 
সাম্রাজ্যের অধীশ্বরকেঃ 1'সপাহি বিদ্রোহের নেতাকে পকলে আমূল ভুলে 
যাবে সে-ই হবে তোমার প্রায়শ্চিত্ত । তুমি ধরা দেবার জন্য হিন্দু- 
স্থানের মাঠে ঘাটে হেঁকে হেঁকে বেড়াবে, আমি নান, আমাকে 
গ্রেপ্তার করো» কোম্পানীর চৌকিদারটাও ফিরে তাকাবে না, সেই 
হবে তোমার গ্রায়শ্চিত্ত । তুমি বিদ্যুত হবে, উপেক্ষিত হবে, অবজ্ঞাত 
হবে, নিজের ছায়ায় চেয়ে তুমি মিথ্য। হয়ে যাবে, সেহ হবে তোমার 
প্রায়শ্চিত্ত | 

তারপরে সে ছুই পা আগাইয়! আসিয়া কণ্ধন্বরে মড়্ার উপর 
খাড়ার ঘা মিশাইয়া বলিল-_কুনিশ পেশবা সাহেব, বাদীকো। বিদায় 
দিজিয়ে। 

এই বলিয়। সে খল্খল্‌ করিয়। হাসিয়া উঠিল এবং অন্ধকারের নধ্যে 
মলাইয়া গেল। 


চাঁপাটি ও পদ্ম ১৪৪ 


তাহাকে আয়ন্তের মধ্যে পাইয়াও ধরিবার কোন চেষ্টা নানা করিল 
না, মৃত পত্বীর পদপ্রান্তে সে পড়িয়া রহিল। 
পরদিন পরিজনেরা মুতদেহটি বা নানা কাহাকেও দেখিতে পাইল 


না। ্ 


রক্কের ৫জর 


আমি ঈতিহাসিক নই, ইতিহাস লিখিবার মতো বিষ্াবৃদ্ধি বা 
অভিপ্রায় আমার নাই। তবে একথা সত্য যে আমি ই'তহাসের 
একজন অনুরাগী পাঠক। ইতিহাস পড়িয়া আমার ধারণ! জম্মিয়াছে 
যে, ইতিহাস গ্রন্থের পাতায় যেসব তথ্য সমষ্টাকৃত হয়, অনেক সমড়েই 
সেসব সত্যের ছিবডে, প্রকৃত তথ্য গ্রন্থের পৃষ্ঠা পর্যান্ত পৌছায় না। 
পৃষ্ঠার চেয়ে পাদ্টীকার মূল্য অনেক সময়েই অধিক, আর লোকের 
মুখে মুখে ও জনশ্রুতিতে যেসব কথা বাতাসের বেগে ধূলোর মতো! 
ভামিয়৷ বেড়ায় তাহাতেই সত্যের উজ্জ্রলতম প্রকাশ । 

পিপাহী বিদ্রোহের প্রকৃত তথ্য জানিবার আশায় উত্তর ভারতের 
শহরে গ্রামে বাজারে বাজারে আমি অনেক বেড়াইয়াছি, এখনো 
বেড়াউভেছি। এই রকম ভ্রমণের মুখে একদিন সন্ধ্যাবেলায় বান্দী 
শহরে উপস্থিত হইয়। ডাক বাংলোয় আশ্রয় লইলাম | ঝান্পী শহর 
সিপাহী বিদ্রোহের একটি প্রধান কেন্দ্র ছিল। যদ্চি সে অনেক 
দিনের কথা) তবু এখনো এখানে এমন লোক নিশ্চয় আছে, যাহারা 
সিপাহী বিদ্রোহের সময়ে জীবিত ছিল, আমি নিজেও তো সেই রকম 
একজন লোক ; এমন লোক নিশ্চয় অনেক আছে, যাহারা সে 
সময়ে কোন না কোন পক্ষের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিল, আমি নিজেও তো 
সেই রকম একজন লোক । আমি তাহাদেরই সন্ধান করিয়। 
বেড়াইতেছি। কিন্তু বিপদ এই যে, যাহারা সে সময়ের কথ! হাতে 
নাতে জানে, তাহার! মুখ খুলিতে চায় না। নিজেদের মধ্যে খুব 
সম্ভব সেসব কাহিনীর আলোচনা করিয়া থাকে, কিন্তু ₹'পপিচিতের 
কাছে একেবারেই মৃূক। আমি মুককে বাগাল কদ্দিবার অসাধ্য 
সাধনে বাহির হুইয়াছি। আর পঙ্গুর গিরিলজ্ঘন? তাহার দৃষ্টান্ত 
তো। আমি স্বয়ং সিপাহীর গুলীতে আমার একটি পা বিকল। 

ডাক বাংলো প্রায় খালি, কেবল আভাসে বুঝিলাম যে, একটি 

১৩ 


চাপাটি ও পদ্লু ১৪৬ 


ঘরে আর একজন লোক আছে। কিছুক্ষণ পরে সেই লোকটি 
বাহিরে আসিলে দেখিলাম যে, তাহার বয়স আমার চেয়ে কম তে। 
নয়ই, বরঞ্চ বেশি হইবে বলিয়াই মনে হয়, কিন্তু নিশ্চয় করিয়া কিছু 
বলিবার উপায় নাই, কেননা, লোকটি একেবারে শুকাইয়। বাঁকিয়। 
গিয়াছে» বয়স চল্লিশ হইতে আশির মধ্যে যে-কোন অঙ্কে স্থাপন কর! 
যাইতে পারে। চৌকিদার তাহাকে মুন্সীজী বলিয়া সম্বোধন করিল, 
আমিও তাহাই করিব; অনেকবার তাহার উল্লেখ করিতে হইবে ; 
তাহার মুখে অপ্রত্যাশিতভাবে যে কাহিনীটি শুনিলাম তাহাই এখন 
বলিব। 

আমি বারান্দায় যেখানে বসিয়াছিলাম, তাহার নিকটে মুন্দীজী 
আর একখানি চেয়ারে বসিলেন। এখন ছুঙ্জন প্রায় সমবয়স্ক লোক 
নির্জন এক গৃহে অবস্থান করিলে আলাপ পরিচয় হইবে না, এমন 
প্রায়শ হয় না, ত৷ তাহাদের মধ্যে জাতিগোত্রের যতই ভেদ থাকুক 
না কেন? 

বিশেষ আমার কেমন যেন ধারণা হইল যে, এই রকম জীর্ণ 
ভাণ্ডারেই আমার আকাজিক্ষত সত্য থাকিবার সম্ভাবনা, সীসার বাক্সেই 
তো পোশিয়ার চিত্রপট রক্ষিত ছিল। 

তাহাকে অভিবাদন করিয়। সবিনয়ে শুধাইলাম, আপনি কোথায় 
যাবেন ? 

কানপুরে। 

কানপুরে? আমি তো সেখান থেকেই আসছি । 

সেখানে আপনার কি কাজ ছিল? 

ঘুরে বেড়ানোই এখন কাজ । 

সরকারী চাকুরীতে আছেন ? 

এক সময় ছিলাম, এখন পেন্সন পাই। 

আপনি? 

আমিও সরকারের পেন্দনভোগী । 

কি কাজ করতেন? 


১৪৭ চাপাটি ও পল্স 


মাস্টারী করতাম লোকে তাই যুন্সীজী বলে। 

কোথায় মাস্টারী করতেন ? 

উনাও শহরে । 

(সিপাহী বিদ্রোহের সময়ে তাহলে উনাও শহরে ছিলেন ? 

তখন কি ইস্কুল কলেজ খোল। ছিল? তাছাড়া বিজ্রোহের পরে 
আমি মাস্টারীতে ঢুকি । 

তখন কি করতেন ? 

এমন কিছু নয়। 

বুঝিলাম রহস্তদ্বার এবারে বন্ধ হইল। আরও কৌশল চাই, 
আরও ধৈর্য চাই। 

আপনি কি করতেন? 

৯৩ নম্বর সাদারল্যাণ্ড হাইল্যাণ্ডার রেজিমেণ্টের সাজজেন্ট ছিলাম । 

বটে, দিন হাত দিন, আমি কিছুদিন এ রেজিমেন্টের নেটিভ 
হিসাবরক্ষক ছিলাম । 

তখন বোধ হয় আমি সামরিক পদ থেকে বিদায় নিয়েছি । 

তা হবে, আপনাকে দেখেছি বলে তো মনে হয় না। তা হোক, 
তবু তো এক রেজিমেন্টের লোক। 


এবারে রহস্তদ্বার আবার খুলিল। 

মুন্সীজী, পুরানো দিনের খাতিরে ছু'একটা পেগ খেতে আপি 
কিঃ 

আপত্তি! বিলক্ষণ। যুন্সী হবার পরে ওসব ছেড়ে দিয়েছিলাম, 
কিন্ত এখন তো মুন্সীগিরির পুর্বজীবনে ফিরে গিয়েছি । তা ছাড়! 
রাতের বেলায় দেখছেই বা কে? 

আর দেখলেই বা দোষ কি? 

দোষ কি জানেন, লোকে ইস্কুল মাস্টারদের সাধারণ ক্ষুধা তৃষ। 
লোভ কামনার উধ্বে বলে জানে । তারা একজন সামান্য কেরাণীকে 
মদ খেতে দেখলে বলবে, বাঁহাছুর ছেলে বটে। কিন্তু একজন স্কুল 


রঃ 


চাঁপাটি ও পল্স ১৪৮ 


মাস্টারকে যদি একটা মাতালের সঙ্গেও দেখতে পায়, অমনি বলবে 
এই রে দেশট। জাহান্নমে গেল ! 

তাই নাকি? আমাদের দেশে তো৷ এমন নয়। 

সেই জন্যই তো। আমাদের দেশে ইস্কুল মাস্টারের বেতন এত 
সামান্য, যাতে তারা শাক-ভাতের বেশি কিছু খেতে না পারে। 

এই বলিয়া সে হাসিয়া উঠিল, মুখের গহ্বরে দন্তের আত্যন্তিক 
অভাব; হাসির তালে তালে গালের রেখাগুলি সম্কুচিত বিস্ফারিত 
হইতে লাগিল। বলা বাহুল্য আমিও সঙ্গে সঙ্গে হাসিলাম, কতকটা 
তাহাকে খুশী করিবার উদ্দেন্তে । 

তা আপনি এমন ঘুরে বেড়াচ্ছেন কেন? পেন্সন পান, কোন 
স্বাস্থ্যকর স্থানে বসবান করুন। 

তাই তো করা উচিত, কিন্তু মাথায় এক ভূত চেপেছে, তাই ঘুরে 
মরছি। আমি সিপাহী বিদ্রোহের ইতিহাস সংগ্রহ করে বেড়াচ্ছি। 

সরকারের তরফ থেকে ? 

না,ন। সরকারের সঙ্গে কোন সম্বন্ধ নেই। তাছাড়া যে-ঘটন। 
অনেক কাল চকে বুকে গেছে, তার তথ্য সংগ্রহ করবার জন্যে সরকার 
কেন টাকা খরচ করতে যাবে। 

আপনি যখন সরকার পক্ষের কেউ নন, আর আমরা যখন এক 
রেজিমেন্টের লোক, তখন আপনাকে গোপনে বলি, 795০1) 
080:56155 বুঝলেন কিনা, কিছুই চুকে যায় নি। 

আবার বিদ্রোহ হবে নাকি? 

তাঁর কিছুমাত্র আশঙ্কা নাই। আমি বলছি পুরাতন বিদ্রোহের 
জের আজও চলছে। 

আজও চলছে ? সে আবার কি রকম ? 

কিছু দিন আগে জব্বলপুরের কাছে মেজর নীল তার বডিগার্ড 
মজর আলির হাতে নিহত হয়েছিল মনে আছে? 

আছে বই কি! বোঁধ করি মার্চ মাসে হবে-_-১৪ই মার্চ । 


১৪৯ চাপাটি ও পদ্প 


মনে থাকবার কারণ হচ্ছে ষে মজর আলি মেজর নীলের পেয়ারের 
লোক, আরও কারণ আছে হত্যার কোন অভিপ্রায় খুঁজে পাওয়। 
যায় নি। 

কিন্তু কাগজে কি পড়েন নি যে, মজর আলির জেনানার সঙ্গে মেজর 
নীলের যোগাযোগ ঘটেছিল, দু'জনেরই অল্প বয়স। 


এসব কথা বেরিয়ে থাকবে হত্যার পার, সব কাগজ পড়ি নি, 
বিশেষ তখন আমি পথে পথে ঘ্বুরছি, সব কথা জানি নে। 

সব কথা কেউ-ই জানে না। 

াপনি জানেন কি? 

জানি বই কি? সে এক দীর্ঘ ইতিহাস। শুনবার কৌতুহল 
থাকে বলবো । তার আগে একটা তথ্য শুনুন_-সেই একটা তথ্যের 
আলোতে অনেকটা অন্ধকার পরিষ্কার হয়ে আসবে । মেজর নীল 
সিপাহী বিদ্রোহ দমনে বিখ্যাত জেনারেল নীলের পুত্র । 

জেনারেল নীলের পুত্র! আমি চমকিয়া উঠিলাম। মুন্সী্জীর 
কথাই সত্য, এই একটিমাত্র তথো মেজর নীলের হত্যার সঙ্গে 
সিপাহী বিদ্রোহের একট যোগাযোগ স্থাপিত হইয়া গেল বটে। 

কি বিশ্বাস হচ্ছে না? চুপষে! 

বিশ্বাস হয়েছে বলেই চুপ ক'রে আছি। কিন্তু মজর আলির 
পরিচয় কি? 


মজর আলি হচ্ছে সফর আলির পুত্র । 

সফর আলি কে? 

সব বলছি । আর ছুটে? পেগ 'আনতে হুকুম দিন, গলাটা ভিজিরে 
নিই, অনেকক্ষণ থেকে বকছি। 

আমার চাপরাদি পেগ আনিল, ছুইজনে পান করিলাম, মুন্সীজী 
রুমালে বেশ করিয়া মুখ মুছিয়া লইয়।৷ আবার আরম্ত করিলেন--সফর 
আলি জেনারেল নীলের আদেশে নিহত হয়েছিল । 

নিহত হয়েছিল? 


চাপাটি ও পদ্ম ১৫৩ 


জেনারেল নীলের অবশ্ঠ বিশ্বাম তিনি বিচার করে ফাসির হুকুম 
দিয়েছিলেন । 

তার অপরাধ! 

তখন ৯৩ নম্বর কি কানপুরে ছিল না? 

৯৩ নম্বর জেনারেল নীলের অনেক পরে কানপুরে এসে পৌছে- 
ছিল। আর কানপুরে উপস্থিত থাকলেই বা কি, তখন প্রত্যহ এত 
লোকের ফাসির হুকুম হ'ত যে কারো কথা বিশেষ করে মনে থাকবার 
নয়। কিন্ত আমি ভাবছি কি জানেন মুন্সীজী, সে ঘটনার ত্রিশ বছর 
পরে আজ কোন্‌ সূত্র জের টেনে চলছে এই ছুই ঘটনার মধ্যে ! 

রক্তের সূত্র, সাজেন্ট সাহেব, রক্তের স্ুত্র। রক্তের জের পুরুষ 
থেকে পুরুষাস্তরে চলে, জন্ম থেকে অন্ত প্রজন্মে চলে। পিতার রক্ত 
পুত্রে সংক্রামিত হয়ঃ সেই রক্তের সঙ্গে তার আশ! আকাজ্ষা, দোষ 
এবং গুণ, সমস্ত সংক্রামিত হয় পুত্রের দেহে, পুত্রের ব্যক্তিত্বে! যাক্‌ 
ব্যাখ্য। যাক, এখন ঘটনাট। বলি শুন্ুন। 

জেনারেল নীল আর জেনারেল হ্যাভেলক !কানপুরে পৌছবার 
আগেই বিবিঘরের হত্যাকাণ্ড অনুষ্ঠিত হয়ে গিয়েছে । তার বৃশংসতায় 
তাঁর বীভৎদতায় ইংরেজ সৈন্ আর সেনাপতিদের মন চড়া সুরে বাধ! । 
স্ুক্্মভাবে আসামী অনুসন্ধান করবার মতো ধের্য তাদের ছিল না, 
যার উপরে সন্দেহের একটুখানি ছায়া পাওয়া গেল তাঁকেই ফাসি 
দেওয়া হ'ল--বাছবিচাঁর নেই। সফর আলি ছিল কোম্পানীর কোন্‌ 
এক রেজিমেণ্টের দফাদার। নীল কোন্‌ সুত্রে জানতে পেলেন ষে 
সফর আলি জেনারেল হুইলারের হত্যার জন্য দায়ী । 

সে তো বিবিঘরের হত্যাকাণ্ডের আগের ঘটনা । 

অবশ্যই আগের। নানার সঙ্গে চুক্তির সর্তমতো৷ হুইলার পান্ধী চড়ে 
সতীচৌরা ঘাটের দিকে যাত্রা করেছেন, সেখানে নৌকো। আছে-_ 
হুইলার ও অন্যান্য গোর! লোক কল্কাতায় যাত্রা করবে। অন্য মকলে 
হেঁটে গিয়ে নৌকো চড়লো, কেবল হুইলার গেলেন পান্কীতে, তিনি 
অন্ুস্থ হ'য়ে পড়েছিলেন। তিনি সতীচৌর1 ঘাটের কাছে যেমনি 


১৫১ চাপাটি ও পদ্প 


পাক্ধী থেকে নামতে যাবেন, পিছন থেকে কে তাকে হত্যা করলো । 
নীলের বিশ্বাস হয়েছিল সফর আলিই সেই হত্যাকারী। 
প্রমাণ ছিল ? 


আসল প্রমাণ ছিল নীলের মনে, তাঁর চোখে প্রত্যেকটি সিপাহীই 
কোন না কোন দোষে দোষী। নীল হুকুম দিল সফর আলির ফাসির। 

সফর আলি কোরাণ ম্পর্শ ক'রে বলল সে নিদোষ। সে বলল, 
যে, সে বিদ্রোহী পক্ষে যোগ দিতে বাধ্য হয়েছিল, কিন্তু তার মতে সে 
দোষটাও কোম্পানীর কেনন। কোম্পানী বিদ্বোহের গীঙন থেকে তাকে 
রক্ষা করতে পারে নি। কিন্তু হুইলারের দূরে থাকুক, কোন হত্যা- 
কাণ্ডের সঙ্গে সে জড়িত নয়। কিন্তু কে কার কথ। শোনে ! 

তারপরে ? 


এখনি শেষ হয় নি আরও আছে শুনুন । সিপাহী পক্ষের নৃশংসতা 
গোরা লোকের মন কি রকম নৃশংস, কি রকম বীভৎস করে তুলেছিল 
শুন্ধুন। যাদের ফাসির হুকুম হ'ত ফাসির আগে তাদের কি করতে 
হ'ত মনে আছে? 

শুনেছি। 


টা 


আর একবার শুনুন। বিবিঘরের মেঝেতে জমাট বীধা রক্ত জিব 
দিয়ে চেটে পরিষ্কার করতে হ'ত তার পরে ফাসি। সফর আলিকে 
বিবিঘরে টেনে নিয়ে যাওয়া হ'ল। সে অস্বীকার করলো। 

তখন? 

তখনকার জন্ঠও ব্যবস্থা ছিল, নীল সাহেব বিচক্ষণ সেনাপতি । 
মেজর ব্র,সের মেথর বাহিনী চাবুক নিয়ে প্রস্তুত থাকতো । সফর 
আলির পিঠের চামড়া কেটে রক্ত পড়তে লাগলো । তাকে করতে 
হ'ল নির্দেশ মতো। কাজ । 

তখন তাকে নিয়ে যাল্য়া হ'ল ফাঁসিতলায়। অন্যান্য শহরে 
কাজটা যে-কোন গাছের ডালে সমাধা হত. কিন্তু কানপুর শহরে 
পাকা ব্যবস্থা করা হয়েছিল, নীল সাহেব বিচক্ষণ ব্যবস্থাপক । সফর 


চাপাটি ও পঞ্পর ১৫২ 


আলি নির্ভয়ে ফাসির মাচানে উঠে ঠাড়ালো । নীল সাহেবের আর 
একটা হুকুম ছিল এই যে, শহরের নেটিভদের সকলকে হাজির হয়ে 
ফাসি দেখতে হবে, যাতে তার ভবিষ্তঞতে সতর্ক হতে পারে। সফর 
আলি সেই স্থযোগটুকু গ্রহণ করলো । সমবেত জনতাকে সম্বোধন 
ক'রে সে বল্ল--- 

ভাই সব হিন্দু মুসলমান, তোমরা সবাই দেখো নীল সাহেব 
নিরপরাধ একজনকে হত্যা করছে । ভাই সব হিন্দু মুসলমান, তোমরা 
সবই ক্তেনে বাখে। হুইলার সাহেবের বা কোন লোকের হত্যাকাণ্ডের 


সঙ্গে আমার কোন সংশ্রুব নেই ! 
ভাই সব তোঁমর। দেখো, তোমরা! জানো, তোমরা বোঝ যে আমি 


নির্দোষ! যে-লোক নিতান্ত মিথ্যাবাদী, তারও মুখ থেকে মৃত্যুকালে 
মিথ্যা বের হয় না! আমি জীবনে কখনে। মিথ্যা বলিনি! 
তোমাদের সকলের কাছে নিরপরাধ মুমৃযূণ সফর আলির এই শেষ 
আরজি যে তোমরা কেউ বিষণগড়ে গিয়ে সফর আলির পুত্র মজর 
আলিকে তার বাপের হত্যাকাণ্ডের সংবাদ জানিয়ে বলো, সে যেন 
পিতৃহত্যার প্রতিশোধ নেয়। এখন মজর আলির বয়স ছুই বছর, 
কিন্ত সময় তো! বসে থাকে না, একদিন সে লায়েক হবে, জোয়ান 
হবে, আমি আশীর্বাদ করছি সোরাবের মতো! হবে, তখন যেন 
প্রতিশোধ নিতে ভুলে না যায়। ততদিনে শীল সাহেব যদি দোজকে 
গিয়ে থাকে তবে তার ছেলেকে যেন হত্যা বরে, সে বেটাও যদি 
দোজকে যায়, তবে যেন তার ছেলেকে হত্যা করে । তোমর! তাকে 
বুঝিয়ে বলো এই হচ্ছে গিয়ে তার বাঁপের শেষ আকাজ্ষা । তাকে 
বুঝিয়ে বন্সো পিতৃ-হত্যার প্রতিশোধ নিতে গিয়ে যদি তার কাল হয়, 
তবে তুমি হিন্দু ভাই তাকে বুঝিয়ে বলো সে স্বর্গে যাবে, তুমি মুললমান 
ভাই তাকে বুঝিয়ে বলো সে বেহেস্তে যাবে! তাকে বুঝিয়ে বলো 
রক্তের বদলে রক্ত না পাওয়া অবধি তার বাপজীর তৃপ্ত নাঈ, শাস্তি 
নাই, আল্লার কাছে গিয়েও তার নিবৃত্তি নাই। যাও ভাই সব উত্তরে 
যাও, দক্ষিণে যাও, পুবে যাও, পশ্চিমে যাও, যেখানে খুশী সেখানে 


১৫৩ চাপাটি ও পদ্ম 


যাও, কেবল বিষণগড়ে যেতে ভুলো না, ভূলে! না ষে সফর আলির 
পুত্রের নাম মজর আলি । আল্লা তোমাদের কৃপা করবেন । 

তারপরে সফর আলি নতজানু হ'য়ে উধ্ব'মুখে, আকাশের দিকে 
হাত ছুটি প্রসারিত ক'রে বল্তে লাগলো, আল্লা, রক্তের বদলে রক্ত 
না পাওয়া অবধি তোমার বেহেস্তেও যেন আমার শাস্তি না হয়, 
আমার তৃপ্তি না হয়! আল্লা মজর আলিকে আয়ু দাও, শক্তি দাও, 
বীরত্ব দাও, বাপের শেষ আকাতক্ষা না ভূলবার মতো স্মৃতি দাও, ধৈর্য 
দাও, বুদ্ধি দাও ! তারপর তাকে বাপের কাছে পৌছে দাও ! আল! 
পীর ফকিরের মুখে শুনেছি মৃত্যুকালে লোকে শত্রুকে ক্ষমা ক'রে 
মরে, কিন্তু মনে যদি ক্ষমার ভাব না৷ থাকে মুখে ক্ষমার কথা আসবে 
কিকরে! আল্লা, তোমার সফর আলির মুখে যে মিথ্যা কথা বের 
হয় নাসে তো তোমারই মঙ্জিতে! আমার এই মৃত্যু আকাঙ্ক্ষার 
জন্য যি তুমি আমাকে দোজকে প্রেরণ ক'রে থাকো সে-৪ ভালো, 
সে-ও ভালো, কিন্তু প্রতিশোধ বিনা বেহেস্ত-লাভ ! না, না, আল্লা, 
তেমন বেহেস্তে তোমার নফর সফর আলির কিছুমাত্র লোভ নেই ! 

এই রকম কত কথা বল্ল, আজ ত্রিশ বছর পরে সে সব আর 
মনে নেই । সে থামলে তার ফাসি হ'য়ে গেল। 

তারপরে ? 

জনতা নিঃশবে সরে গেল । 

তুমি কোথায় ছিলে ? 

সেকথা থাক্‌। 

সফর আলির শেষ আকাঙ্ক্ষা মর আলি কাছে পৌছেছিল ? 

নইলে মেজর নীলের মৃত্যু হ'ল কেন? 

এতকাল পরে? 

শয়তানের চাক শীত ঘোরে, ভগবানের চাকা ঘুরতে সময় নেয়। 

মজর আল্িরও তো শুনেছি যে. ফাঁসি হয়ে গিয়েছে । 

নঈলে সফর আলি তাকে আশীর্বাদ করবে কি উপায়ে ? 

তুমি এত কথা জানলে কি ক'রে? 


চাপাটি ও পদ্ম 


আরও অনেক জানি, শোন । 


আবার একটু গল! ভিজাইয়া লইয়া মুন্ীজী পুনরায় আর্ত 
করিল--ক্রমে মজর আলি বয়ঃপ্রাপ্ত হল। তার বাপ যেমন অভিপ্রায় 
প্রকাশ করেছিল তেমনি জোয়ান হয়ে উঠল, আর লাঠি, সড়কি, 
তলোয়ার ও বন্দুকে হ'য়ে উঠল ওস্তাদ । সেই সঙ্গে সামান্য লেখা- 
পড়াও শিখলে!। তার পরে চাকুরির সম্ধানে বেরিয়ে মেজর নীলের 
বডি গার্ডের চাকুরী পেলো। 

সেটা কি তাকে হত্যা! করধার অভিসন্ধি নিয়ে? 


না, পিতার আকাঙ্ক্ষা তখনো জানতে পায় নি। ওটুকু ভাগ্যের 


খেলা । তার পরে মেজর নীল জব্বলপুরে ব্দলি হলে মজর আলিও 
সঙ্গে গেল। 


১৫৪ 


খবর পেল কোথায়? 
ওখানে। 
কিভাবে? 


একজন ফকির একদিন এসে তাঁর হাতে একখানা ছাপা কাগজ 
দিয়ে চলে গেল। কাগজখান। পড়বার পরে সে যখন ফকিরের সন্ধান 
করলে। তখন কোথাও তাকে আর দেখতে পাওয়া গেল না। 

কে সেই ফকির? 

সে কথা থাক্‌। 

কি ছিল কাগজখানায় ? 

সফর আলির অন্তিম অভিপ্রায় । 

কে ছাপালো।? 

কেউ জানে না। এ কাগজের হাজার হাজার কপি সার! উত্তর 
ভারতের হাটে বাজারে গঞ্জে তখন প্রচারিত হচ্ছিল । খুব সম্ভব তারই 
একখানা ফকিরের হাতে এসে পড়েছিল আর সে ঘটনাক্রমে মজর 
আলিকে জানতো-_-তাই সে তার হাতে পৌছে দিয়েছিল । 

তৃমি সে কাগজ দেখেছেন ? 


১৫৫ চাপাঁটি ও পদ্প 


দেখেছি। খুব সম্ভব এখানে এক কপি কাছে আছে। ফ্লাড়াও 
দেখছি আছে কিন]। 
এই বলিয়। মুন্সীজী ঘরের মধ্যে চলিয়া গেল এবং কিছুক্ষণ পরে 
একখান ছোট আকারের জীর্ণ কাগজ হাতে ফিরিয়। আসিল। 
এই দেখ। 
দেখিলাম যে প্রথমে উদ্তে পরে ইংরাজীতে লেখা । পড়িলাম, 
সফর আলির অন্তিম অভিপ্রায় মজর আলির উদ্দেশে লিখিত । 
এই কাঁগজ পড়েই কি সে সব কথ! জানতে পারলো ? 
না, আগেও কানাঘুষায় কিছু শুনেছিল, কিন্তু মেজর নীলের 
নামটা জানতে পারে নি। 
মেজর নীল যে জেনারেল নীলের পুত্র ত৷ জানলো কি ক'রে? 
সেটা আগেই জানতে পেরেছিল, মেজর নীলের বসবার ঘরে 
জেনারেল নীলের একখান! ছবি ছিল । 
তখন সম্থল্প স্থির করে ফেল্লো? 
অত সহজে স্থির করতে পারে নি। একদিকে মেজর নীল তার প্রভূ, 
তাকে খুব ন্নেহ করেন, আর এক দিকে পিতার অস্তিম অভিপ্রায়__ 
কঠিন পরীক্ষা । তাছাড়া ইতিমধ্যে-: 
আবার কি হ'ল? 
আমিন! বলে? একটা মেয়েকে সে ভালোবেসেছে- বিবাহের দিনও 
প্রায় স্থির। ইতিমধ্যে ফকিরের হাতে এলো এই ফমান। মজর 
আলি মন£স্থির করতে না পেরে পাগলের মতো হয়ে গেল, কি করবে, 
কি তার কর্তব্য । কারে সঙ্গে পরামর্শ করতে পারলে বেঁচে যেতো, 
কিন্ত কার সঙ্গে পরামর্শ করবে-এ কথ! কি কাউকে বল। যায়? 
কেন এঁ আমিনাকে ? 
সে যে স্ত্রীলোক, মে কি কখনো সম্মতি দিয়ে ভাবী স্বামীকে শিশ্চিত 
মৃত্যুর মুখে পাঠিয়ে দিতে পারে ? 
মজর আলি একবার ভাবলো, দূর ছাই এসব শয়তানের কারসাজি ; 
যেমন চলছে চলুক। আর একবার ভাবলো চাকরী ছেড়ে দিয়ে 


চাপাটি ও পঞ্প ১৫৬ 


আমিনাকে বিয়ে ক'রে অন্যত্র চলে যায়। কিন্তু না তা হবার নয়, দিনে 
রাত্রে পিতার অস্তিম আকাজক্। তাকে প্ররোচিত করতে লাগলো । 

তার ভাবগতিক দেখে মেজর নীল শুধালো, মজর আলি তোমার 
হ'ল কি? 


মজর আলি প্রভুর মুখের দিকে তাকায়, তার পিতার অভিপ্রায়কে 
শয়তানের কারসাজি মনে হয়। সে ভাবে জেনারেল নীল যদি অপরাধ 
করেই থাকে তার জন্য মেজর নীলের অপরাধ কি? আবার ভাবে এত 
ভাববার অধিকার তার নেই, পিতার আকাজক্ষ। পূরণ করতে সে বাধ্য । 

আমিন! শুধায়ঃ তোমার কি হ'ল? মজর আলি কিছু বলে না। 


আমিন! বিয়ের তারিখ স্থির করতে বলে, মজর আলি টালবাহান। 
করে। এই রকম চলতে লাগলো । 


একদিন বিকালে মজর আলি জব্বলপুর টাউনে গিয়েছে, কেনাকাটা 
সেরে ফিরবার সময়ে দোকানে একখান ছবি দেখতে পেলে?-- একজন 
আসামী ফাসীর মাচানের উপরে দাড়িয়ে আছে, নীচে চারপাশে জনতা, 
লোকটি হাত নেড়ে কি যেন বলছে। ছবির পরিচয়লিপি অস্পষ্ট হয়ে 
যাওয়ায় সে পড়তে পারলে। না। তখন সে দোকানীকে শুধালো, 
মিঞা--এ কিসের ছবি ? 


দোকানী বল্ল, সিপাহী বিদ্রোহের সময়কার ছবি, কোম্পানী 
একটা লোকের ফাসীর হুকুম দিয়েছে, আর জনতাকে সে বলছে, সে 
নির্দোষ । 

আপামীর নাম কি? 

ত1কেজানে! 

সে সময়ে একরকম ছনি চারিদিকে দেখতে পাওয়া) যেতো, লক্ষমী- 
বাঈ যুদ্ধ করছে, নানাসাহেব পালাচ্ছে, জেনারেল উ্টাম সসৈন্যে 
লখনৌ চলেছে । মজর আলি সে-সব ছবি দেখেছে, কিন্তু এ ছবিট। 
তার কাছে নৃতন, তার মনে হল এ আসামী তার বাপ। 

তখন সে পকেট থেকে ফকিরের দেওয়। সেই কাগজখান। বের 


১৫৭ চাপাটি ও পদ্ম 


কারে দোকানীকে বল্ল--মিঞ্া আমি ইংরেজি পড়তে পারি না, 
তুমি বুঝিয়ে দাও তো। 

দোকানী কাগজখান! দেখে বল্ল-_নূতন ক'রে আরা ক পড়বো ? 
এ কাগজ অনেকবার দেখেছি । 

মজর আলি শুধালো, মজর আলির খোঁজ জানো? 

দোকানী বল্ল--সে বেইমানের খোজ কে জানতে চায়? 

বেইমান কেন ? 

কেন আবার? বাপের শেষ আকাজ্ষা যে পুর্ণ করতে পারে না, 
সে বেইমান ছাড়া আর কি? যাও, যাও, মে বেট। বেহইমানের কথা 
তুলো না। 

মজর আলি নীরবে চলে গেল। আর ফিরবার পথে একখান' 
শাড়ী, আর কয়েক গাছা কাচের )ডি কিনে নিয়ে সন্ধ্যার পরে 
আমিনার বাড়ীতে এসে উপস্থিত হ'ল। 

আমিনাকে বল্ল-কেমন হয়েছে দেখো তো? 

তুমি যা দাও তা কি খারাপ হতে পারে ? 

আমার বুঝি কিছুই খারাপ নয়? 

কেবল তোমার গম্ভীর ভাব ছাড়া । আচ্ছা ক'দিন থেকে তুমি 
এমন বিষ কেন? 

তুন্নিত কেবলই আমাকে বিষ দেখো । কই আর কেউ তে। 
বলে না। 

আর কেউ তোমাকে এমন করে জানেকি? আমি তোমার 
মনের ভিতর পরন্ত দেখতে পাই। 

কি দেখছ বলে। তো? 

দেখছি যে শীগ গীরই তুমি কাজে ইস্তফা দেবে। 

কেন? 

কানপুরে ফিরে যাবে। 

কেন, সেখানে ফিরবো কেন? 

সাদি করতে। 


চাপাটি ও পদ্প, ১৫৮ 


কাকে সাদি করবো ? 

থুব সুন্দর একট! মেয়েকে । 

তোমার চেয়ে সুন্দর আর কে? 

তবে আমাকেই । 

তখন ছুজনেই হেসে উঠল। তারপরে মজর আলি বলিল-- এই 
যদ আমার মনের কথা তবে আমি বিষণ্ন হ'তে গেলাম কেন? 

তা-ও জানি। 

বলো । 

মেজর সাহেব তোমাকে খুব ভালবাসে, তাকে ছেড়ে যেতে তোমার 
কষ্ট হচ্ছে। 

মোটেই নয়। দরকার হ'লে মেজর সাহেবকে আমি খুন করতে 
পারি। 

তবে আমাকেও খুন করতে পারো। 

ন। তা পারি না। 

তবেকি মেজর সাহেবের চেয়ে আমাকে বেশী ভালোবাসো ? 

তোমার কি মনে হয়? 

এখন বলবো না, খাওয়ার পরে যাওয়ার সময়ে বলবো । তোমাকে 
খেয়ে যেতে হবে। 

আচ্ছ!। তাই হবে। 

আজ যে বড় ভালো ছেলে। 

কোন্‌ দিন আমি খারাপ ? 

বিয়ের পরে ভালে। ছেলে থাকো, তবে তো বুঝবি । 

এই বলে আমিন হেসে উঠল, আর বলল, একটু অপেক্ষা করো 
তোমার খাওয়ার যোগাড় করিগে। 

আহারান্তে মজর আলি বিদায় নেবার সময় বলল, আমিন। এবার 
আমার প্রশ্মের উত্তর দাও। 

আমিনা এমন নিঃসংশয়ভাবে উত্তর দিল ষে, তাতে মজর আলির 
সুখ বন্ধ হ'য়ে গিয়ে তাকে সম্পূর্ণ নিরুত্তর ক'রে দিল । 


১৫৯ চাপাটি ও পঞ্ল 


মজর আলি বলল-- এমন উত্তর পেলে মৃত্যুকে আর ভীষণ মনে 
হয় না। 

মৃত্যুর কথা কেন বল্ছ ? 

মারতে গেলেই মরতে হয়, আমরা সৈন্য, লোক মারাই তো হচ্ছে 
আমাদের কাজ। 

অন্যের যাই হোক, তোমার কাজ লোক মারা নয়; তোমার 
কাজ মেজর সাহেবকে রক্ষা করা । 

তা বটে ! | 

আর ওসব অলুক্ষণে কথা এখন থাক। 

আচ্ছা থাক। 

এই বলে” সে বিদায় নিলো । 


পরদিন সকাল বেলায় প্যারেডের সময়ে মজর আলি মেজর নীলকে 
গুলি ক'রে হত্যা করলে । 


সবাই অবাক হ'য়ে গেল। এমন অকারণে হত্যা! অনেকেই 
ভাবলে। মজর আলি সাময়িকভাবে উন্মাদ হ'য়ে গিয়েছে। 

কয়েক দ্রিন পরে বড়লাট বাহাছুরের এজেন্ট স্যার লেপেলে গ্রিফি- 
নের বিচারের ফলে মজর আলির ফাসি হ'য়ে গেল। 

এতক্ষণ আমি নীরবে শুনছিলাম, এবারে বললাম, এখানেই 
তাহলে রক্তের জের টানা শেষ হ'ল। 

যুন্সীজী বলল,--কে জানে শেষ হ'ল কি ন1। 

কেন ? 

জেনারেল নীলের আর যদ্দি কোন পুত্র থাকে, তবে তারাও 
রক্ষা পাবে না। 

কেন? 

তাদের হত্য। করবার জন্যেও হাজার হাজার ছাপ বিজ্ঞপ্তি বিলি 
হচ্ছে 

তাদের অপরাধ কি? 


চাপাটি ও পদ্ম ১৬৯ 


মেজর নীলের অপরাধ কি ছিল? 

একজনের রক্তপাতেই কি একজনের হত্যার প্রতিশোধ নেওয়। 
হয়নি? 

একটি বীজ থেকে যে গাছ জন্মায় তাতে কি মাত্র একটি ফল ফলে ? 
সার্জেন্ট সাহেব প্রথম বিন্দু রক্তপাতের আগে চ্ন্তা করে দেখ। দরকার 
সে রক্তবিন্দু মাটিতে পড়লে তার যে কোথায় শেষ হবে, কি প্রকার 
ফসল যে ফলবে তা। কে বলতে পারে? রক্তের বদলে রক্ত এ কথ 
সবাই জানে, কিন্ত একবিন্দু রক্তপাতের পরিণামে কত ভয়াংহ রক্তবৃষ্টি 
হ'তে পারে তার হিসাব তো হয় নি। সার্জেন্ট সাহেব, রক্তপাতের 
উৎমটাকে মাত্র আমর। জানি, সে প্রবাহ ষে মহাসমু'দ্র গিয়ে অবসিত 
তার মানচিত্র কি অঙ্কিত হ'য়েছে? তবে? সফর আলির রক্তবিন্দু 
অজক্্ শাখাপ্রশাখায় বিস্তারিত হ'য়ে গিয়ে কোন্‌ সবনাশের বনস্পতি- 
কে স্থষ্টি করবে তা তুমিও জানে না, আমিও জানি না। তবে? 

জেনারেল নীলের অন্য পুত্রদের হত্যা করবার বিজ্ঞপ্তি তোমার 
আছে কাছে কি? 

খুব সম্ভব আছে। কিন্ত অনেক রাত হ'য়েছে এখন আর নয়। 
কাল সকালে খুজে দেখবো এখন। 

আর একট কথা, মঞ্জর আলির সম্বন্ধে এত কথ। তুমি জানলে কি 
করে? 

সে-কথাও কাল সকালে । 

এই বলিয়। সে দ্রুতপদে নিজ কক্ষে প্রস্থান করিল। 

আমিও ঘরে গিয়। শুইলাম বটে, তবে ঘুম আসিল না, কেবলি 
সফর আলি, মজর আলি, জেনারেল নীল, মেজর নীল নামগুলি 
মনের মধ্যে মাকুর মতো চলাচল করিয়। একখানি শ্বপ্নবসন বয়ন করিয়। 

তুলিতে লাগিল--:আর তার উপর মাঝে মাঝে কৌতুকময়ী আমিন 

তারার মতো, হীরকের মতো, দীর্ঘকাল অনাবৃষ্টির পরে ঘাসের ডগায় 
সঞ্চিত অশ্রুবিন্দুর মতো। ফুল কাটিয়। কাটিয়া দিতে লাগিল। 


১৬১ চাপাটি ও পদ্ল 


অনেক বেলায় ঘুম ভাঙিলে বেয়ার চা লইয়া আসিল, প্রথমেই 
শুধাইলাম, মুন্পীজী কোথায় ? 


লোকটা বলিল-_হুজুর, তিনি ঘণ্টা ছুই আগে চলে গিয়েছেন। 
কোথায়? 


তা তে জানি না । 

তিনি কোথাকার লোক ? 

ত। কেউ জানে না। 

তার আসল নাম কি? 

জানি না হুজুর । 

ডাক-বাংলোর রেঞ্জিস্টি বইয়ে নিশ্চয় আছে। 

ইংরাজিতে লেখা আছে, পড়তে জানি না। 

আচ্ছা বইখান। এখানে নিয়ে এসো । 

রেজিস্টি বই আনীত হইলে দেখিলাম । সে্িনকার পায় দুটি 
মাত্র নাম লিখিত আছে। একটি আমার, অপর নামটি ধুন্দুপন্থ, 


বন্ধনীর মধ্যে আছে নানা সাহেব, পেশ! মহারাষ্ট্র রাজোর পেশবা। 
নিবাস পুণা, হাল মোকাম ঝিঠুর | 


ঘরের মধ্যে বজ্ পড়িলেও বোধ হয় এমন চম্কাইয়া উঠিভাম না, 


হাত কাপিয়। খানিকট? চা পড়িয়া গেল। ভাগ্যে তখন বেয়ারাটা ছিল 
না । 


কিছুক্ষণ পরে প্রকৃতিস্থ হইলে ভাবিলাম 9091) ! সবটাই ধাপ্পা। 
ভাবিলাম ওর নাম নান। সাহেবও যেমন সত্য, ওর গল্প৪ তেমনি সত্য। 


ভাবিলাম মজর আলির হতাকাগ্ডকে অবলম্বন করিয়া একট। উপন্যাস 
বুনিয়৷ আমাকে বোকা বানাইয়া গেল। 7991) ! 


যতই ধাঞ্সা মনে করি না কেন, কিছুতেই ঘটনাটার স্মৃতি মন 
হইতে মুছিয়া ফেলিতে পারিলাম না । তারপরে অনেক বছর চলিয়া 
গিয়াছে ; আজও ঘটন।ট। ভুলিতে পারি নাই। তাই লিপিবদ্ধ 
করিলাম, একজনের অভিজ্ঞতা, দশ জনের হইয়! উঠিলে এবারে বোধ 


হয় ভুলিতে পারিব । 
১১ 


অভিশাপ 

সেই লোক তো বটে? 

নিঃসন্দেহ। 

এমন নিঃসন্দেহ হওয়ার কারণ ? 

গ্রথমতঃ লোকটার স্বীকারোক্তি, দ্বিতীয়ত; বয়মের হিসাব, 
তৃতীয়ত; পুলিম গেজেটে যে বর্ণনা আছে তার সঙ্গে মিল। 

তা মিলিয়ে দেখেছ নাকি? 

ন। দেখে একটা লোককে গ্রেপ্তার করি কিভাবে? বিশেষ যে সে 
লোক তো৷ নয়। 

কিন্ত তেমন লৌক তোমার গুজরাটের রাজকোট শহরে আসতে 
যাবে কেন? 

ও সন্দেহ তো যে কোন শহর সম্বন্ধেই উঠতে পারে। 

তা অবশ্য পারে কিন্তু হঠাং তোমার সন্দেহ জাগতে গেলো কেন? 

লোকট। এ অঞ্চলে অপরিচিত, ছুদিন ধরে শহরের মধ্যে বট 
গাছতলায় বসে ছিল--অনেকে বলে আট-দশ দিন। ব্যাপার কি 
তদন্ত করবার জন্য ইন্সপেক্টার দয়াভাইকে পাঠাই। দয়াভাই খুব 
চালাকচত্ুর, আগেকার আমলের পুলিস ইন্সপেক্টারের মত মূর্খ 
নয়, পড়াশোনা আছে। একালের ছোকরা, সে বেশ ভালে ক'রে 
তদন্ত করে এসে অনুকুল রিপোর্ট দিল। 

তুমি কি বলতে চাও যে, লোকটা নিজের পরিচয় প্রকাশ করলো? 


গ্রথমট। করে নি জেরায় পড়ে ক'রেছে। 
আশ্চর্য ৷ 


আশ্চর্য কি, পুলিসের জেরায় অনেক সাহেবই কাং হন তে 
নানামাহেব! 


তারপরে ? 
তারপরে আর কি, ভুলিয়ে ভালিয়ে নিয়ে এলাম থানায়। খু'টিয়ে 


নব জিজ্ঞাসা ক'রলাম। কবুল ক'রলে৷ সে নানাসাহেব। আমি 
শুধোলাম, তুমি যা বলছে! তার পরিণাম কি হ'তে পারে জানো? 


১৬৩ চাপাটি ও পদ্ল 


সে বললো, পরিণাম যাই হোক, এই হচ্ছে নির্জল। সত্য । 

কিন্তু হঠাৎ এতদিন পরে এ সত্য প্রকাশ করবার হেতু ? 

উত্তর তো আপনি নিজেই দিলেন। এতদিন পরে এ কথা প্রকাশ 
হওয়ায় আর দোষ কি? 


দণ্ডতযোগ্য অপরাধ কখনো তামাদি হয় না। কাজেই বুঝে স্ুঝে 
কথা বলো । 

কথায় কাজ কি, কাগজ কলম বের করুন লিখিত স্বীকারোক্তি 
দিচ্ছি । 


ভাবলাম উত্তম। লিখিত স্বীকারোক্তি থাকলে ভুল হ'লে 
আমাকে আর কেউ দায়ী করতে পারবে না । 

এতকাল পরে নানাসাহেবের আবির্ভাব! আমর তো। পড়েছি 
তার মৃত্যু হয়েছে। 

মৃত্যু যে হয় নি তা দেখতেই পাচ্ছ তো। 

যদি সেই লোক হয়। 


সন্দেহের অবকাশ আর কোথায়? চল না একবার লক আপে' 
দেখে আসবে। 
সে মন্দ নয়। কিন্ত না মরলে এতদিন ছিল কোথায়? 


সে বলে তিব্বতে ছিল। 

হঠাৎ আবির্ভাবের কারণ ? 

বুডে। হয়েছে, কবে মরে যাবে, তীর্থ ক'রতে এসেছে । 

ফাসির হুকুম মাছে জেনেও তীর্থ ক'রতে আসা ! বিঠলজি যদি 
সত্যি হয় এর মুলে ঘোর রহস্য আছে, হয়তো কোন বিদেশী রাস্ট্রর 
হয়ে ষড়যন্ত্র পাকাতে এসেছে। কেসটা কৌশলে হাগুল ক'রতে হ'বে। 

সেই সব পরামর্শের জন্তেই তো! তোমাকে ডাকা 

আমার তো৷ মনে হয় এখনি পলিটিক্যাল এজেণ্টকে সব জানান! 


আবশ্যক । 
আমারও সেই রকম ধারণা, অবশ্য ইগ্ডিয়া গভণমেন্টের সঙ্গে 


পরামর্শ না ক'রে তারও কিছু করবার সাধ্য নেই। 
ত। হলে তুমি বলছো যে, একট। বড় মাছ এবারে জালে পড়েছে? 


চাঁপাটি ও পদ্ম ১৬৪ 


মাছ! রাঘব বোয়াল। 


জাল ছিড়ে পালাতে পারবে না, জাল শুদ্ধ তোমাকে না টেনে 
নিয়ে জলে নামে। 
বল কি? 


বলি কি! নানাসাহেব দিপাহী বিদ্রোহের নেতা, পেশবার 
সিংহাসনের দাবিদার, হ'লে হতে পারতো হিন্দুস্থানের বাদশ] | 

কিন্তু চৈরাঁম, লোকটাকে দেখে তো মারাত্মক মনে হয় না। 

দেখে কি তোমাকে নিবোধ মনে হয় ? 

আমি কি নির্বোধ? 

না তাই বলছি, চল একবার 'লক্‌ আপে" লোকটাকে দেখে আসি । 

তখন বিঠলজি ও চৈত্রাম ছুজনেই পুলিশ সুপারিন্টেণ্ডেটে লক 
আপের উদ্দেশে রওনা হইল । 

কিছুক্ষণ পরে আসামী পরিদর্শন শেষ করিয়া হুইজনে বাহির 
হইয়া আসিল। 

বিঠলজি শুধাইল- কি আর সন্দেহ আছে? 

চৈরাম বলিল, একট্রও নয় কিন্তু আশ্চর্য লাগছে কি জান, জীবনে 
ছোট বড় কত আসামী ই তো দেখলাম, এরকম বশংব্দ আসামী আগে 
দেখি নি। 

আগে কি দেশবিখ্যাত নানাসাহেবকে দেখেছে ? 

নিজ মুখে সমস্ত কূটতর্কের অবসান ক'রে দেয়। আমি শুধোলাম, 
বয়স কত? 

আটষটি, ইতিহাসে পড় নি ১২৭ সালে নানানাহেবের জন্ম 
এখন ১৮৯৫ সাল, কত হ'ল? আটটি নয়? 

শুধোলাম, আর প্রমাণ আছে? 

তোমরা কি প্রমাণের খবর রাখ শুনি। মুখে বসন্তের দাগ, 
কপালে বর্শার ক্ষতচিহ্ন_বাল্যকালে 'খেলতে গিয়ে লেগেছিল, পিঠে 
অস্ত্রোপচারের দাগ, অস্ত্র ক'রেছিল কানপুরের ডাক্তার মেজর বিউস। 
এসব খবর রাখো 1 তবে কি ক'রে সনাক্ত করবে? যাও যাও 


১৬৯ চাঁপাটি ও পদ্ম 


তারপরে বলিল, আগে 'লক-আপের' বাইরে না গেলে আর দূরে 
যাওয়া কেমন ক'রে সম্ভব? তক্তপোশ থেকে নামলে তবে তে? 
গাড়ী চড়া, কি বলো ! চলে! বাইরেই যাওয়। যাক । 


সকলে বাহিরে আদিল। এবারে নানা বলিল--আমাঁকে নান! 
ব'লে বুঝেছে তে। ? 
না| 


তার মানে? 

সরকারের হুকুম তোমাকে অবিলম্বে যুক্তি দিতে হবে। 

মুক্তি? নানাকে? পিপাহী বিদ্রোহের নেতাকে? বিবিঘরের 
হত্যাকারীকে ? 

নানা নিজের বিরুদ্ধে নিজে অভিযোগ করিতে লাগল । 


তোমরা যে আমাকে বিস্মিত করলে ! 


বস্ততঃ পুলিশ স্ুপারদ্বয়ও কম বিস্মিত হয় নাই । তাহাদের 
নিজেদের ধারণা লোকটা সত্যই নানা, কিন্তু তাহার! হুকুমের চাকর। 
সরকারের হুকুম লোকটাকে অবিলম্বে ছাড়িয়। দাও, তাহাকে লইয়া 
যেন কোন আদিখ্যেতা ন। কর! হয়, তাই তাহার! হুকুম তামিল করিতে 
আপিয়াছে। 

পলিটিক্যাল এজেন্ট কলিকাতায় বড়লাটকে তার করিয়৷ নানার 
উপস্থিতি জানায় ও তাহার সম্বন্ধে আদেশ প্রার্থনা করে। বড়লাট 
স্থির করেন যে, লোকট। সত্যসতাই নানা হইলেও তাহাকে নান! 
বলিয়। স্বীকার না করাই বুদ্ধির কাজ । নান! বলিয়া একবার স্বীকার 
করিলেই দেশময় চাঞ্চল্য ও উদ্দীপন। দেখা দিবার আশঞ্চা । সরকার 
তাহার একনম্বর শত্রুকে হাতের মুঠায় পাইয়া কখনোই ছাড়িয়া দিতে 
পারে না ইহাই লোঁকে বিশ্বাস করিবে, কাজেই লোকট! প্রকৃত 
আসামী হইলেও লোকচক্ষে তাহার গুরুত্ব বা মূল্য থাকিবে না। 
সরকারের এ চাল যেমন স্ৃক্ম তেমনি সার্থক--এবং ইহার পরিণামে 
প্রত্যাশিত ফল ফলিল। সকলেরই বিশ্বাস হইল লোকটা! ভগ বা 


চাপাটি ও পদ ১৭০ 


পাগল, নানাসাহেব নয়। এমন কি ক্রমে ক্রমে পুলিশ সুপার ছুজনেও 
নিজেদের পূরতন বিশ্বীস পরিত্যাগ করিল। 

নান! আশাভঙ্গে গর্জন করিয়া উঠিল--তোমরা পাগল। 

“আরে তৃমি পাগল+ বলিয়া একজন পুলিশ ধাকা দিয়! বারান্দ। 
হইতে তাহাকে পথে ফেলিয়। দিল। 

ব্যর্থ বিক্রমে নানা লাফাইতে লাগিল আর বলিতে লাগিল-- 
তোমাদের এমন সাহস, তোমাদের এমন সাহস? 

আরে নানাসাহেব তো! দেবতা! সেকি তোমার মত বাটরা? 

ভণ্ড কোথাকার! নানাসাহেব মেজে সেলাম নিতে এসেছে ! 
যাও ভাগো! 

ভাগবো ? কেন ভাগবো ? হিন্দৃস্থান আমার রাজ্য নয়! 

তাহার উক্তিতে সকলে হাসিয়া উঠিল। 

ইতিমধ্যে বাজারে রটিয়া গিয়াছিল যে, একটা পাগল আসিয়৷ 
নিজেকে নানাসাহেব বলিয়া দাবী করিতেছে । মজা! দেখিবার জন্য 
থানার কাছে কতক লোক জুটিয়া গেল। 


সরকারের সাঁধা কি আমাকে গ্রেপ্তার করেঃ আমি হিন্দৃস্থানের 
বাদশা ! 

লোকে বিচিত্র মন্তব্য করিতে লাগিল, কেহ বলিল-_রসক্ষেপা, কেহ 
বলিল--পাগল নয়, মাথা খারাপ হয়ে গিয়েছে। 

কেহ বলিল, জোচ্চোর। 

ত্রেপ্তারের কিছুমাত্র আশ! নাই দেখিয়া নানা বাজারের দিকে 


রওনা হইল। আর বলিতে লাগিল-আমি ধুন্দুপন্থ পেশবা নানা- 
সাহেব, নিন্দুস্থানের বাদশা ! তোমরা সবাই শোন কোম্পানী চুরি 
করে আমার গদি কেড়ে নিয়েছে। 

সে বলিতে লাগিল--আমাঁর কথা যদ্দি মিথ্যা হয় তবে কোম্পানীর 
জোক আমাকে গ্রেফতার করে না কেন? 

বাজারের লোক কেহ শুনিল, কেহ শুনিল না। 


টাক ্ হী 


১৭১ চাপাটি ও পল্প 


যে শুনিল বলিল--আরে রাম, এ বুড়োটা নানাসাহেব ! নানা- 
সাহেব যে দেবতা । 

এই বলিয়। উদ্দেশে প্রণাম করিল। 

অপর একজন বলিল, আমার বাব। নানাসাহেব কে দেখেছেন, 
তার মুখে শুনেছি নানার গ! থেকে জ্যোতি বেরুতো। আর সেই সঙ্গে 
বেরুতো। চন্দনের গন্ধ, চারিদিক আমোদত হয়ে থাকতো | 


আর একজন বলিল, নাও ভাই নিজের কাজে মন দাও, পাগলের 
কথ। ছাড়--কিসে আর কিসে। 


নানার পিছনে একদল ছেলে জুটিয়া গেল, তাহার৷ ছড়া বাধিয়। 
গান ধরিল-_ 


নানাসাহেব খান। খায় 

থান। থেকে বেরিয়ে যায়, 
থানায় হিল বরকন্দাজ 
মাথায় তুলে দিল তাজ 
মাথায় তাজ আর খালি পায় 
নানাপাহেব খানা খায়! 


নানা ছেলের দলকে তাড়া করে, তাহারা সরিয়া যায় । নান। 
আবার চলতে থাকে । ছেলের দল আবার গান ধরে । গান ধরে 
আর নানার গায়ে ধুল। ছিটাহয়৷ (দিয় ঝালতে থাকে- 


হোলি হায় হোলি হ্যায় 
নানাপাহেব খানা খায়। 


নানা এবারে শহরের প্রান্তে আসিয়া পড়িয়াছে। কেহ তাহাকে 
গ্রেফতার করিল না, কেহ স্বাকার করিল না--এমন কি অধিকাংশ 
লোক একবার তাহার দিকে ফারয়াও চাহিল না। নিন্দাও একপ্রকার 
মদ, তাহাতেও মান্থষকে চেতাইয়৷ রাখে, নানার ভাগ্যে হৃঃখের দ্রাক্ষা 
চোঁলাই করা সে মদটুকুও জুটিল ন।। 


চাপাটি ও পদ্ম ১৭২ 


তাহার প। ভাঙ্গিয়া আদিতেছে, তবু তাহাকে চলিতে হইবে । 
সে ভাবিতেছে যদি পড়িয়া মরিতে হয় তাহ। এখানে, এ নিজন- 
প্রান্তরে, এখানে নয় । অবিশ্বাসীদের এই শহরে নয় । অসহায়, 
উপেক্ষিত, অবজ্ঞাত, বিস্মৃত নানাসাহেব মলিন বাম্পগুচ্ছের মতো 
দিগন্তের দিকে ভাপিয়া চলিল। ধীরে ধীরে একা একা । তাহার 
ভাগ্যে অবশেষে সেই পিশাচীর ভবিষ্যদ্বাণীই বুঝি সফল হইল। 
দেশব্যাপী বিস্মৃতি ও উপেক্ষাতে নানার পাপের প্রায়শ্চিত্ত হইল । 


ম্মাণ্ড